ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

বর্তমানে অনেকেই আধুনিক শিক্ষা ব্যাবস্থার কারনে হিন্দু ধর্মের এই দিকটিকে ইতিহাস থেকে পলায়ন প্রবনতা হিসাবে দেখে থাকেন। একক ব্যক্তি প্রদর্শিত ধর্ম বিশ্বাসীরাও ব্যাপারটা সেই ভাবেই দেখে থাকেন।

আসলে হিন্দু ধর্ম মোটেও ইতিহাস থেকে পলায়ন প্রবন নয়। যখন কোন ব্যক্তি সনাতন ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা গুলো বুঝতে পারবেন তখন তিনি শুধু চুপ করে যাবেন, একটি কথাও আর বলবেন না। খুব ভাল একটি উদাহরন হলেন রামানা মহর্ষি। উনার মতন ব্যক্তি ইতিহাস বা অতীতকে কখনই গুরুত্ব দেন না। সর্বদাই বর্তমানে বেঁচে থাকেন। কিন্তু সব কিছুরই একটা শুরু থাকা দরকার। আর সেকারনেই হিন্দু ধর্মের প্রচলিত বিশ্বাস গুলোরও কোন উৎস রয়েছে।

সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রথম সোপান হিসাবে রয়েছে অপরিচিত বা অদেখার প্রতি ভয় থেকে। গুহাবাসী মানুষের আঁকা প্রতিকৃতি এর বড় প্রমান। এই সকল ছবি নির্দেশ করে প্রকৃতির অপ্রত্যাশিত আচরনের কথা। এই সকল ঘটনা তাঁদেরকে অতিপ্রাকৃতিক শক্তিতে বিশ্বাসী করে তোলে।

আর সেকারনেই শিকার ও খাবারের পরে যখন প্রাচিন মানুষ বিশ্রামে যেত তখন প্রকৃতির অপ্রাতাসিত ঘটনা গুলো তার মনে নাড়া দিতে থাকত। আর এই উপলব্ধই পরবর্তীতে তাকে সেই প্রশ্নের সামনে দাড় করিয়ে দেয় যে, “আমি কে” ? আপনারা জেনে থাকবেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম পাথরের হাতিয়ার আজ থেকে প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগের।

পরবর্তীতে মানুষ আগুনের শক্তিকে চিনল এবং একে নিয়ন্ত্রন করতে জানল। আর এটাই পরবর্তীতে মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে থাকল। মানুষের একত্রে বসবাস পরবর্তীতে কৃষির জন্ম দেয়। যিশুর জন্মের ৭০০০ বছর আগের মেহেরাগ সভ্যতার কথাতো আমি আগেই বলে এসেছি।

হিন্দু ধর্মের পরবর্তী উপাদানের অস্তিত্ব পাওয়া যায় মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা সভ্যতায়। দেব দেবী, পূজা পার্বণের অনেক প্রমান এখানে পাওয়া যায়। যদিয় অনেক আধুনিক দার্শনিক হিন্দু ধর্মের উৎপত্তি কে আরও আগে মনে করে থাকেন। কিন্তু হিন্দু ধর্মের উৎপত্তি ইতিহাসের বেশিরভাগ নির্দেশনা ইন্দুস উপত্যকার সভ্যতা থেকেই আসে।

মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পাতে আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সমূহ অত্যন্ত উন্নত এক সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে নির্দেশ করে। উন্নত সড়ক ব্যাবস্থা ও বাসস্থানের নিদর্শন সেই সময়ে বসবাসকারী মানুষজন সম্পর্কে আমাদের ধারনা দেয়।এখানে প্রাপ্ত টেরাকোটার কাজ, সীলমোহর ও মাটির পাত্রের উপরে রঙের কাজ অনেক উন্নত মান নির্দেশ করে। তাঁরাই প্রথম কুকুরকে কৃষি কাজে ব্যাবহার করেছিল।

মহেঞ্জোদারোতে, একটি বিশাল পরিমাণ দেহাবশেষের সন্ধান পাওয়া গেছে সেখানকার কক্ষ ও স্থাপনাগুলোতে যেগুলো বেশিরভাগই নির্দেশ করে কোন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের। অনেক দেহাবশেষ হাঁটু ভেঙ্গে প্রার্থনারত অবস্থায় মাটি চাপায় সমাহিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। তাদের চোখ ছিল অর্ধ – বোজা এবং তাদের অনেকের হাত জোর করে নাক বরাবর প্রতিস্থাপিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে যা হিন্দুদের প্রার্থনার ধরন হিসাবে পরিচিত।

এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রগুলো থেকে অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। এগুলো তৎকালীন সময়ে দেবদেবীর পূজার রীতি নীতির প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত করে। খনন কাজের কিছু কিছু জায়গায় শিব লিঙ্গও পাওয়া গিয়েছে। এই প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রের বয়স যিশুর জন্মের ৩৫০০ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে।

আমাদের একথা মনে রাখতে হবে এই সকল প্রাচীন শহরগুলো অনেক উন্নত ছিল। এবং যে ধরনের উনয়নের নিদর্শন এখানে পাওয়া গিয়েছে তা কখনই একরাতে অর্জিত হয়নি। এর পেছনে হয়ত রয়েছে কয়েকশো বছরের ইতিহাস।

হিন্দু ধর্মের মুল বীজ হয়ত এই সভ্যতার লোকেদের ভেতরে আরও আগে থেকে নিহিত ছিল। এবং এটিই পরবর্তী সকল ইন্দুস উপত্যকার সভ্যতার ভেতরে যুগ যুগ ধরে চলে এসেছিল।
এথেকে এই মতে কি আসা যায়না, যে হিন্দু ধর্মের উৎপত্তির ইতিহাস তখন থেকেই শুরু যখন মানুষ প্রথম প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করে?
হিন্দু ধর্ম “এক” এ বিশ্বাস করে এবং “আমি কে” ধারনার উত্তর দেয়।

এটি কোন ধর্ম নয় যার কোন উৎপত্তিকাল থাকবে। একে বুঝতে হলে আমাদের ধর্মের সুক্ষ ধারণাকে বুঝে আসতে হবে। আমার এই পুরো লেখাটির কিছুটা প্রতিফলন হয়ত পেতে পারেন স্টিফেন হকিংস রচিত “A Brief History of Time” গ্রন্থে।

মুলঃ অভিলাশ, পুনা, ভারত
[ লেখাটি হিন্দু-ব্লগ.কম প্রথম প্রকাশিত হয়। আমি সেখান থেকে লেখাটি সরাসরি অনুবাদ করে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি। ]