ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

আমি একজন বুয়েটিয়ান।
আমি একজন ছাত্রলীগার।
আমি বর্তমান ভিসি-প্রোভিসি কে সমর্থনকারী গুটিকতক মানুষদের একজন।

এইটুকু পড়েই যারা ঘৃণায় নাক সিঁটকে চলে যাচ্ছেন, তাদেরকে বলছি- আপনার বিচারে যদি আমি দোষী সাব্যস্ত হয়েও থাকি, তবু আমায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তো দিন!

অনেকদিন পর আজ (শনিবার) সকাল থেকেই ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক-কর্মচারীদের পদচারণায় মুখর হয়েছিলো বুয়েট ক্যাম্পাস। আমি যখন ক্যাম্পাসে পৌঁছাই ততক্ষণে আন্দোলনকারীদের মিছিলটাও হয়ে গেছে। আমরা ৮-১০জন ছেলে তখন অডিটরিয়ামের সামনে বসে আড্ডা দিচ্ছি। হটাৎ রেজিস্টার বিল্ডিং এর সামনে অবস্থানরত এক বন্ধুর কাছ থেকে খবর পেলাম যে, স্যার’রা ভিসি-প্রোভিসিকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। তাড়াতাড়ি ছুটে গেলাম রেজিস্টার বিল্ডিং এর সামনে। নিজ ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক-সহপাঠী সবার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গিয়ে উপস্থিত হলাম প্রোভিসি’র রুমে। ভিতরে তখন ছাত্র-শিক্ষক আর মিডিয়ার লোকদের ভীড়। প্রোভিসি তাঁর চেয়ারে বসে আছেন। তাঁর রুমে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রেখেই মিডিয়ার কাছে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন স্যারেরা। অনেক ছাত্র-ছাত্রী এরই ফাঁকে রুমের এখানে সেখানে বিভিন্ন পোজে ছবিও তুলছে। এমনই সময় ভীড়ের মধ্য থেকে লুব্ধক’০৭ ব্যাচের আমিনুল চেঁচিয়ে উঠলো, “স্যার, স্যার, ছাত্রলীগের গুণ্ডা-সন্ত্রাসীগুলা ঢুকে পড়েছে!!!” সাথে সাথে সবার চোখ আর মিডিয়ার ক্যামেরা ঘুরে তাকালো আমাদের দিকে। জেনে রাখুন, পানিকৌশল বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র আমিনুল বুয়েটে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সবচেয়ে পরিচিত ও সক্রিয় সদস্য। অন্তত লুব্ধক’০৭ এর কারোরই সেটা অবিদিত নয়।

মুহূর্তেই হট্টগোল লেগে গেল। স্যার’রা চেঁচাতে লাগলো। “ছাত্রলীগ এখানে কেন? ছাত্রলীগ এখানে কেন??” নিজের ফ্যাকাল্টির হেলালী স্যার, যাকে একসময় ব্যক্তিগত ভাবে অনেক শ্রদ্ধা করতাম, রাজ্জাক স্যার, আজীম স্যারসহ পিতার বয়সী হোসেন আলী স্যার, জয়নাল স্যার, মায়ের বয়সী রাজিয়া ম্যাডামদের চোখের সামনে এই ছেলেগুলাকে গুণ্ডা, সন্ত্রাসীর অপবাদ মাথায় নিতে হলো। মুহূর্মুহূ গালিগালাজ ভেসে আসতে লাগলো চারপাশ থেকে। ঘৃণার সে যে কি তীব্র রূপ!

আমাদের স্যারেরা নাকি দলবাজী করেন না; সকল ছাত্রছাত্রীরাই নাকি তাঁদের সন্তানের মতো। তাহলে সিফাত সামি’০৬, শাহেদ’০৬, আমিনুল’০৭, পলাশ’০৭, জিম তানভীর’০৮, নাহিয়ান বিন হোসেন’০৮(ব্লগ ), জেইসান’০৮ , আলিমুদ্দিন’০৮, কে এম শিহাব উদ্দিন’০৮ এর মতো ক্যাম্পাসের প্রায় সবার কাছেই চিহ্নিত শিবিরেরা (সন্দেহভাজন গুলা না হয় বাদই গেল) তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেও ছাত্রলীগের এই ৮-১০টা ছেলেকে কেন গুণ্ডা-সন্ত্রাসী আখ্যা পেতে হয়?

ক্যানভাস’০৬ ব্যাচের আন্দোলনের জেরে (ধরে নিচ্ছি; যদিও সেটা প্রোভিসি’র রুম ভাংচুর ও ২জন নির্দোষ ছাত্রকে মারার অভিযোগে) ২০ জন ছাত্রের রেজাল্ট আটকানো হয়েছিল। সেই ঘটনার সমালোচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে রেজাল্টের উপর সেই স্থগিতাদেশ তুলে নেয়াও হয়। কিন্তু আজ বেশ কয়েকজন স্যার যেভাবে আমাদেরকে ভিডিও করলো আর ছবি তুলে রাখলো, তাতে কি এটাই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে যে, ক্লাস শুরু হয়ার পর তাঁরা আমাদেরকে দেখে নেবে? নয়তো মিডিয়ার এতো এতো ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও আমাদের ছবি তোলার জন্য তাঁদের এতো আগ্রহ কেন? আর যদি প্রতিহিংসাই তাঁদের উদ্দেশ্য হয়, তবে আর এতো এতো ভালো বুলি কেন? তবে আর কোথায় থাকলো তাঁদের মহত্ত্ব? কই, আমরা তো সেখানে গিয়ে একটা টুঁ শব্দও করি নি, বরং স্যাররা চলে যেতে বলার পরই বেরিয়ে আসছিলাম। তবে কেন আর দশজন ছাত্রের মতো আমাদেরকে একজন বুয়েটিয়ান হিসেবেই বিবেচনা করতে পারলেন না? যেখানে শিবির দাঁড়িয়ে থাকলো তাঁদেরই গা ঘেঁষে?

কারণ, ঐ যে, আমরা বিবেকের ডাক শুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি; আমরা আর দশজন কোনদিকে গেল সেটা দেখেই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাই নি। আর তাই আমরাই দোষী, দালাল, কুত্তা ইত্যাদি ইত্যাদি।

এবার তবে আসি মূলকথায়, আমি বা আমরা কেন ভিসি-প্রোভিসিকে সমর্থন করি?

আলোচনা নাতিদীর্ঘ করার স্বার্থেই শিক্ষকদের দাবিগুলার বিস্তারিত বিবরণে যাচ্ছি না। তাছাড়া এরইমধ্যে অসংখ্যবার অসংখ্য ব্লগে সেগুলোর উল্লেখ হয়েছে। গুগল সার্চ দিলেই পেয়ে যাবেন।

প্রথম দিকে এই আন্দোলন শুধুমাত্র শিক্ষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে এটা ছাত্রছাত্রীদের সাথে ঘনিষ্টভাবে জড়িয়ে গেছে। আর এর অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা যায় রেজাল্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বলে বহুল-প্রচারিত অভিযোগটিকেই। যেটাকে কেন্দ্র করেই মূলত শিক্ষার্থীদের মাঝে বুয়েট গেল, বুয়েট গেল রব তোলা সম্ভব হয়েছে। এই অভিযোগটির ব্যাপারে বিভিন্ন স্ক্যানকপি ও তার ভিত্তিতে শিক্ষকদের অভিযোগ এবং তার প্রেক্ষিতে প্রশাসনের জবার বহু আগেই অনলাইন মিডিয়াতে চলে গেছে।

অভিযোগটির সত্যতা নিরূপন নিয়ে প্রশাসন আর সমিতির বিতর্ক হয়েছে। আমি সেসবে না গিয়ে আমার আলোচনার স্বার্থে অভিযোগ সত্য ধরে নিয়েই আলোচনা করছি।

এখানে রেজাল্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে একজনে ছাত্রের ফেল করা একটি কোর্স উইথড্র করাকে বুঝানো হয়েছে, যার প্রেক্ষিতে উক্ত ছাত্র অন্যায়(এটাও ধরে নিচ্ছি) সুবিধা পেয়ে ভবিষ্যতে অধিকতর ভালো রেজাল্ট করার সুযোগ থাকে এবং পরে ভিসি এটাকে অনিচ্ছাকৃত ভুল হিসেবে সংশোধনও করে। এই সুবিধাপ্রাপ্ত ছাত্রটির নাম মোকাম্মেল হোসাইন।

> সে পানিকৌশল বিভাগের ’০৬ ব্যাচের ছাত্র ও বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি।
> তার বাবা বরিশাল জামায়াতে ইসলামী’র একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা।
> বুয়েটে তার এডভাইজর হচ্ছেন ডঃ আতাউর রহমান, কোষাধ্যক্ষ, বুয়েট শিক্ষক সমিতি।
> ডঃ আতাউর রহমান ব্যক্তিগত জীবনে একাত্তরের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেফতার মুক্তিযুদ্ধকালীন আলবদর বাহিনীর কমাণ্ডার ও পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মীর কাসেম আলী’র ভাগ্নে।

উপরের চারটি লাইনের সাথে আরো দুটি বিষয় মাথায় রাখুন। আজ প্রোভিসি রুমে ঢুকতে গিয়ে প্রথমেই যে আন্দোলনরত রমণীটির মুখোমুখি হতে হয়েছে সে হলো এই মোকাম্মেল-এরই ক্লাসমেট ও বাগদত্তা (এরই মধ্যে বিয়ে হয়ে গেছে কিনা জানিনা) শুভা। আর খালেদা-ফখরুলদের বুয়েট কে আন্দোলনের ইস্যু বানানোর ব্যাপারে তো এরই মধ্যে অবগত হয়েছেন। এবার তবে হিসেবটা নিজেই মিলিয়ে নিন। দুঃখের সাথেই বলতে হয়, শিবিরের অনুপ্রবেশকারীরা যে ছাত্রলীগকে কিভাবে গ্রাস করছে তার আরও একটি জলন্ত উদাহরণ এই বুয়েট।

এছাড়া আর যে অভিযোগটি নিয়ে মাতামাতি হচ্ছে সেটা হলো অনিয়ম তথা শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য করা অর্থাৎ কাউকে বেশী সুবিধা দেয়া কাউকে বঞ্চিত করা। আলোচনার সুবিধার্থে আমি শুরুতে ধরে নিচ্ছি এই অভিযোগটিও সত্য।

কিন্তু বুয়েটের নিয়োগ তো প্রথমে এডহক ভিত্তিতে হয়। তারমানে যারা এই ভিসি-প্রোভিসি’র আমলে নিয়োগ পেয়েছেন তাদের চাকরি এখনো স্থায়ী হয় নি। আর যেহেতু অনিয়ম এর মাধ্যমে নিয়োগ, কাজেই ভিসি-প্রোভিসি না থাকলে তাদের চাকরিও থাকবে না। কিন্তু তাহলে নিজের চাকরি বাঁচানোর তাগিদেও ভিসি-প্রোভিসি’র পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য কোনো তরুন শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী কাউকেই দেখা যাচ্ছে না কেন? মুনাজ-জব্বার-মুমিনুল স্যাররা তো সেই অনেক আগে থেকেই বুয়েটে আছেন, তাঁদেরকে তো ভিসি-প্রোভিসি নিয়োগ দেয় নি।

অনিয়মের আরেকটি রূপ হলো আগে থেকেই চাকরিরতদের মধ্যে বৈষম্য। কতদূর করেছেন জানি না, কিন্তু যদি করে থাকেনও মূলত এজন্যই আমরা তাঁকে সমর্থন করি। আন্দোলনরতদের থেকেই যতদূর শুনেছি, তিনি জামাতী শিক্ষকের বয়স বাড়াতে গড়িমসি করেছেন কিংবা কন্সালটেন্সীতে প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি করেছেন। তিনি জামাতপন্থী যে শিক্ষকরা বাইরে পড়তে যাবার জন্য ছুটির আবেদন করেছেন, তাদের কে ছুটি দেন নি বা দিতে চান নি; যাতে তাদের কে বাইরে যেতে হলে বুয়েট ছেড়েই যেতে হয়। জোর গলায় বলছি, জামাতীদের কে এভাবে বঞ্চিত করাটাকে আমরা সমর্থন করি। আমাদের পক্ষে জামাতীদের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন করা সম্ভব নয়।

আমরা ভিসি-প্রোভিসিকে সমর্থন করি আরও একটা কারণে। কারণ আমরা এই স্বার্থপর, জামাতঘেঁষা শিক্ষকদের সমর্থন করি না। আমরা সমর্থন করি না এই শিক্ষকদের, যারা সনি হত্যার সময়কার সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনে, এমন কি ঈশানের উপর হামলার বিচার চেয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনেও পাশে এসে দাঁড়ায় নি, কিন্তু আজ নিজেদের আন্দোলনকে সবার আন্দোলন বলে নিজেদের সন্তান-তুল্য ছাত্রছাত্রীগুলোকে অস্ত্র বানিয়ে ময়দানে ছুঁড়ে দিচ্ছে আর নিজেরা থাকছে সেফসাইডে।

পরিশেষে বুয়েট ছাত্রলীগ সম্পর্কে কিছু কথা বলি। আমরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ায় লিমনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি; ‘০৬ ব্যাচের র‍্যাগ পরবর্তী আন্দোলনেও সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মতামতকে শ্রদ্ধা দেখিয়েছি। সারা বাংলাদেশের প্রসঙ্গে না গিয়েই শুধু বলবো আমাদের বুয়েট ছাত্রলীগ ন্যায়ের পথে স্থির আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

কিন্তু যদি কখনো স্বাধীনতাবিরোধীরা হুংকার দিয়ে ঊঠে, যদি কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুন্ঠিত করার চেষ্টা করে, যদি কেউ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কে অসম্মান করে- ছাত্রলীগ সইবে না, গর্জে উঠবে বারবার। আর তাতে যদি গুণ্ডা হিসেবে, সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত হতে হয়, তবে সেই বদনাম মাথা পেতে নিতেও মুজিবপ্রাণ বুয়েট ছাত্রলীগ সদাই প্রস্তুত।

আর আমার ব্যক্তি নামটা অপ্রকাশিতই থাকুক। শুধু জানবেন, আমাদেরও মা-বাবা আছেন। তারাও আমাদেরকে প্রকোশলী বানানোর স্বপ্ন নিয়েই বুয়েটে পাঠিয়েছেন। একজন বুয়েটছাত্রকে রাজনীতি যা দিতে পারে, তার চেয়ে অনেক বেশী কিছু সে তার মেধা দিয়েই অর্জন করতে পারে। কিন্তু তারপরও যখন সে রাজনীতিতে আসে, বিশেষ করে ছাত্রলীগ করতে আসে, তখন রাজনীতির প্রতি, দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আসে। এ ও জানবেন, পরিস্থিতির ফেরে দু-একজন সে চেতনা থেকে বিচ্যুত হতে পারে, কিন্তু বাকীরা সঠিক পথেই থাকে। আপনার নির্মম ঘৃণার বাণী তাদের মধ্যে হতাশার, ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। অনুরোধ জানাই, তাদেরকে গুণ্ডা হতে, সন্ত্রাসী হতে উৎসাহিত করবেন না।

(রাত ১১টা, শনিবার, ০১/০৯/১২)