ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখি নি।মহান মুক্তিযুদ্ধের ২০ বছর পর জন্ম নিয়ে আসলে জানার অনেক কিছু বাকি থেকে যায়।মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জানার এ ক্ষুধা আমার কোনদিন শেষ হয়নি।হবে না।

আমার বাবা যুদ্ধের সময় ক্লাস এইটে পড়তো।বাবা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন না করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের যথা সম্ভব সহযোগিতা করেছিলো।বাবাকে অনেক অল্প বয়সে হারিয়েছিলাম,কিন্তু যতোদিন কাছে পেয়েছে,আমার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জানার ক্ষুধা আরো বেড়ে গিয়েছিলো।প্রথম বাবা মুখে শোনা যে ঘটনা টা মনে পড়ে সেটা সূত্রপাত ছিলো অনেকটা এরকম,

বাবার ছাত্রজীবনের ডায়রী পেয়েছিলাম আলমারীর কোনে।সেটা পড়তে পড়তে একটা পেজে গিয়ে থমকে গেলাম। তারিখটা ১৬ আগষ্ট,১৯৭৫।

বাবা লিখেছিলো
“গতকাল নেতাকে কারা যেন হত্যা করেছে,আমরা আমাদের সমচেয়ে বড় নেতাকে হারালাম।”

বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এ ব্যাপারে।বাবা বলেছিলো
“খবর টা যখন আমি তখন আমি বি এম সি কলেজের ভেতরে ছিলাম।সবার চেহারা কালো হয়েছিলো।আমার শুধু মনে আছে ভাইজান বাসা থেকে কোথায় যেন চলে গিয়েছিলেন”

ভাইজান মানে আমার বড় চাচা,আব্বুর সবচেয়ে বড় ভাই,বর্তমান এ নওগাঁ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এর ইউনিট কমান্ডার এবং তার বন্ধুদের মতে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাক বাহিনীর ত্রাস ছিলেন।

আমি যখন বাবাকে এসব জিজ্ঞেস করছিলাম তখন স্পষ্ট মনে আছে,বাবা চোখে পানি এসেছিলো।তখন বুঝিনি কেন।আজ বুঝি।

যখন কেবল আমার মনে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা প্রশ্ন ভীর করা শুরু করলো,তখন ই বাবাকে হারালাম।তারপর আমার জানার ইচ্ছেয় কেমন যেন ভাটা পরেছিলো।জীবন যুদ্ধে সব সামলাতে সামলাতে অনেকটা নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।এর পর আবার এ ক্ষুধা চাগিয়ে ওঠে ক্লাস নাইনে এসে।

আমার দাদী এখনো বেঁচে আছেন।শুধু বেঁচে নাই,উনার স্মৃতি দেখলে আমরা আজো তাজ্জব হয়ে যাই।উনার বর্ননা এতো নিখুঁত এবং ব্যাখ্যা বহুল যে যেকোন জ্ঞান পিপাসু উনার সাথে বসলে কথা বলে শেষ করতে পারবে না।

দাদীর মুখে শুনতাম মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঘটনা।দাদী বাবাকে নিয়ে একটা ঘটনা বলেছিলো।তখন আমার দাদীবাড়ি পুরো খালি।সবাই পালিয়ে আছে বেশ কিছু দূরের একটা গ্রামে।আমার দাদীবাড়ি নওগাঁ শহর থেকে অনেক কাছে হওয়ায় পাকি আর্মি নিয়মিত টহল দিতো।তো একসময় দেখা গেলো আমার দাদী সহ সবাই যেখানে লুকিয়ে আছে সেখানে খাবারের টান পড়লো।তো আমার বাবা এবং বাবার ঠিক ইমিডিয়েট বড় ভাই মুকুল বরাব্বা রওনা দিলো আমাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে,সেখানে বেশ কিছু খাবারের মজুদ আছে।সেগুলো নিতে হবে।

পথে চন্ডীপুর নামের এক জায়গায় এসে পাক বাহিনীর সামনে পড়লেন।তিন টা জীপ এ সৈন্য ভর্তি।এক গাড়িতে একজন রাজাকার ও ছিলো সিভিল ড্রেসে টুপি মাথায় দিয়ে।বাবাদের দেখে প্রশ্ন করলো “কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”
আমার দাদী বুদ্ধি করে বাবাদের পাঠানোর আগে টুপি আর সাদা শার্ট পরিয়ে দিয়েছিলেন।কারন এটা নাকি তখন ঐ এলাকাতে জামাতের আইডি কার্ড টাইপের জিনিস ছিলো।টুপি আর সাদা শার্ট।বাবা উর্দূ তে জবাব দেন “আমার মা অসুস্থ,ঔষধ আনতে যাই”।
আবার প্রশ্ন করা হয় “তাহলে আমাদের জীপে ওঠো,নিয়ে যাই?”
বাবা বুদ্ধি করে বলে “আমরা যার কাছে যাবো তার বাড়ি গ্রামের ভেতরে,সেখানে রাস্তা নাই,পুল এর ওপর দিয়ে যেতে হবে”
রাস্তা নাই আর পুলের ওপর দিয়ে যেতে হবে শুনে পাক বাহিনীর হাওয়া বের হয়ে যায়।ওরা বাবাদের যেতে বলে।বাবা আর রিস্ক না নিয়ে মাঠের মধ্যে দিয়ে যাওয়া শুরু করেন।বাবা রা যে জমির ওপর দিয়ে যাচ্ছিলো ঠিক তার পাশের জমিতে দুই জন কৃষক কাজ করছিলেন।জীপ থেকে গুলি করে তাদের মেরে ফেলা হয়।বাবা প্রথমে ভেবে ছিলেন উনাদের ওপর গুলি চালানো হয়েছে।পরে দেখেন না।উনারা কোন রকম এ জীবন হাতে নিয়ে জমি পার হয়ে গ্রামের মধ্যে ঢুকতেই ঝেড়ে দৌড় দেন।

এসব শুনতাম আর মনে হতো তখন কতোটানা বিপদের মধ্যে সময় পার করেছেন সবাই। ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর এর সি লম্বা সময়ে যে কোন সময় এ জীবন যেতে পারতো।কিন্তু তাও দমে যায়নি বাঙ্গালী।জীবন বাজি রেখে লড়েছে।এখন স্বাধীনতা আদায় করে নিয়ে আসছে।

গতবছর ১৩ ডিসেম্বর আমি নওগাঁ যাই।উদ্দেশ্য ছিলো বেড়ানো।সামনে ১৬ ডিসেম্বর থাকায় আমি কয়েকদিন থেকে যাই।১৬ ডিসেম্বর সকাল বড় চাচা আমাদের ক্যামেরা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এর অফিসে আসতে বলেন।আমরা মানে আমি,আমার চাচাতো ভাই তানহিম এবং বড় চাচার ছেলে মিনহাজ তোতন।ওখানে পৌছে দেখি চারেদিকে সরগম।সমস্ত মুকিযোদ্ধা র এসেছে,কারো ছেলে,কারো বউ,কারো মেয়ে এসেছেন।মিনহাজ এবং তানহিম দাঁড়িয়ে ছিলো।আমি ক্যামেরা নিয়ে ষ্টেজের সামনে এসে ছবি তুলতে থাকি।আমি ছবি তোলার সময় চেহারা গুলো লক্ষ করছিলাম।এরাই সব বীর মুক্তিযোদ্ধা যারা ফ্রন্ট লাইনে থেকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন।চেহারা গুলোতে জীবন যুদ্ধের শেষ প্রান্তের দিকে এসেও কেমন একটা অজানা তৃপ্তি লক্ষ করা যাচ্ছিলো।কয়েকজন প্রবীন মুক্তিযোদ্ধা বক্তব্য দিলেন।একজনের বক্তব্যের কয়েকটা লাইন কোট করলাম

“আমরা এখনো মরে যাইনি।মাত্র কয়েক মাসের কিংবা বলা চলে কয়েকদিনের ট্রেনিং এ আমরা প্রশিক্ষিত পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি।এবং দেশ স্বাধীন করেছি।আজকে আমাদের দেশে এই সব রাজাকার যুদ্ধপরাধীরা নিয়মিত চক্রান্ত করে যাচ্ছে।লানত আমাদের ওপর যে আমরা এদের বসিয়ে বিরিয়ানী খাওয়াচ্ছি,আমার সিনিয়র রা আছেন বলে মুখ খারাপ করতে চাচ্ছি না।এই যুদ্ধপরাধীদের যদি বিচার না হয়,তবে আমরা মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়েরা আছি।আমরা আমাদের ট্রেনিং ভুলে যাইনি।প্রয়োজনে এদের শাস্তি আমরা দেবো।তবু এদের বাংলার মাটিতে হাঁটতে দেবো না”

আমার কথা গুলো শুনে মনে হয়েছিলো উনাকে একটা স্যালুট দেই।কিন্তু কেন যেন দিতে পারিনি।এর পর গরীব এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কম্বল বিতরণ করা হয়।অনেকেই আছেন যারা খুব অসুস্থ,অনেকেই সেই সময় আহত হবার পর আর ঠিক মতো সুস্থ হতে পারেন নাই।অনেকেই পরবর্তি সময়ে মারা গেছেন।

আমার বড় চাচা বক্তৃতা দিতে উঠে খুব আক্ষেপের সাথে বলেন যে

“আমরা আমাদের যোদ্ধা ভাইদের জন্য খুব বেশী কিছু করতে পারি নি।যাদের মাথায় তুলে রাখা দরকার ছিলো,তাদের পায়ে একটা জুতো পরিয়ে দিতে পারি নি”

কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী এবং কন্যার মধ্যে সেলাই মেশিন বিতরন করা হয়।এর মধ্যে কম্বল নিতে আসা এক প্রবীন মুক্তি যোদ্ধা ষ্টেজে উঠতে গিয়ে প্রায় পড়ে যেতে লেগেছিলেন।আমি পাশেই ছিলাম।আমি এগিয়ে গিয়ে ধরলাম।উনি নিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম বয়সের ভারে নুয়ে পরেছেন।তবুও চোখে মুখে তৃপ্তির স্বাদ।এ স্বাদ স্বাধীনতার।সেদিন বুঝছি কেন প্রশিক্ষিত পাক বাহিনী এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের সামনে টিকে থাকতে পারে নি।কারন সহজ সরল এই মানুষ গুলোর মধ্যে আছে অপরিসীম দেশ প্রেম।এবার দেশের জণ্য হাসি মুখে জীবন দিতে পারে।এমন সময় এক মুক্তিযোদ্ধা এগিয়ে এলেন কম্বল নিতে।মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের এক ব্যাক্তির কাছে জানলাম যে ইনি তার আহত সঙ্গীকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে গুলি খেয়েছেন। নিজে আহত হয়েও সঙ্গীকে নিরাপদ রেখেছেন।

আসলেই লানত আমাদের ওপর যে বাংলা মাটিতে রাজাকার রা বীর দর্পে হেটে বেরাচ্ছে।আর আমাদের দেশের মানুষের টাকায় বসে বিরিয়ানী খাচ্ছে।আমাদের জাতীয় পতাকা নিজেদের গাড়িতে উড়িয়ে বেরাচ্ছে।

অনুষ্ঠান থেকে বের হয়ে বাসায় ফেরার পর রাতে বরাব্বা আমাদের নিয়ে বসলেন।আমাদের তিন ভাইকে শোনালেন মুক্তিযুদ্ধের ফ্রণ্ট লাইনের কিছু ঘটনা।
একটা ঘটনা উল্লেখ করছি

৮ ডিসেম্বর ১৯৭১,নওগাঁর রানীনগর
বরাব্বার নেতৃত্বে মুক্তি যোদ্ধার একটা দল রানীনগরে ঢোকে।উদ্দেশ্য রানীনগর ব্রীজ ধধংস করা।রাতের শুরু থেকেই সবাই অবস্থান নেন।রাত ১২টায় শুরু হয় অপারেশন।টানা ৩৬ ঘন্টা চলে।১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২ টায় শেষ হয়।এই ৩৬ ঘন্টার বেশির ভাগ সময় কাদা পানির ভেতরে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা।শরীরের চামড়া অনুভূতি শূন্য হয়েগিয়েছিলো পানিতে লম্বা সময় থাকার কারনে।বরাব্বার হাতে একটা এল এম জি ছিলো।অনবরত গুলি চালিয়ে গেছেন।পাশে একজন ছিলো যার কাজ ছিলো ম্যাগজিন পাল্টানো।গুলি চালাতে চালাতে রাইফেল গরম হয়ে যেতো।তখন অস্ত্র বদলে নিয়ে গুলি চালাতেন।পুরো সময়টা পেটে কোন খাবার পরে নি।মাঝখানে এক বুড়ো চাচা এসে একটা শুকনো রুটি আর কিছু গূড় দিয়ে যান।বরাব্বা বলেন সেই রুটি মনে হচ্ছিলো রাবারের চেয়েও শক্ত।তাও সেটাই কোন রকম এ চিবিয়ে খেয়েছেন।পিপাসায় গলা কাঠ হয়ে গিয়েছিলো।তখন একটা বদনা তে করে সবাই কে পানি দেয় হয়।সেই পানিও তীর্থের কাকের মতো পান করেছেন।৩৬ ঘন্টার এ অপারেশন এ পাক বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়।

এই টুকরো টুকরো ঘটনা গুলোতে ফুটে ওঠে একদল অকুতভয় দেশ প্রেমিকের কথা যারা নিজের জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য লড়ে গেছেন।কেউ যুদ্ধের ময়দানে দেশের জণ্য প্রান দিয়েছেন।কেউ আহত হয়ে ঘরে ফিরেছেন এবং পরবর্তীতে প্রানের মায়া ত্যাগ করেছেন।কেউ দারিদ্রের সাথে যুদ্ধ করে ধুকে ধুকে মারা গেছেন এবং এখনো যাচ্ছেন।এখন এমন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা আছেন যারা ক্ষুধা দারিদ্রের সাথে যুদ্ধ করে একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছে।খুব কম মুক্তিযোদ্ধাই আছেন যারা ভালো আছেন।

দেশের সেরা সন্তান গুলো ধুকে ধুকে মারা যাচ্ছেন।আর অপরদিকে একদল রাজাকার আমাদের আসছে মানবতা শেখাতে?অমি ভাই এর সাথে রিকশায় করে যাওয়ার সময় অমি ভাই একটা কথা বলেছিল যে যারা যুদ্ধের সময় অসংখ্য নিরিহ মানুষকে হত্যা করেছে,এই শুয়োরের বাচ্চারা আমারে মানবতার কথা কয়?

আমার জানার আগ্রহ এখনো প্রবল।ঢাকায় যে কয় দিন ছিলাম অমি ভাই এর বাসায় ছুটে গেছি বার বার,দেখেছি অসংখ্য ডকুমেন্টরী।অমি ভাই আমাকে অনেক ডকুমেন্টরী দিয়েছেন,সে জন্য তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।উনি আমার এই ক্ষুধা মেটাতে অনেক সাহায্য করেছেন।

লেখাটা লিখতে গিয়ে বার বার চোখ জলে ভরে আসছিলো।কয়েকবার লেখা বন্ধ করে উঠে গেছি।জানিনা এই দেশপ্রেমিক নিঃস্বার্থ মানুষ গুলোর জন্য আমি কি করতে পারবো,তবে এতোটুকু জানি আমার পরের প্রজন্ম কে রাজাকার মুক্ত বাংলার মাটিতে হাটতে দেবার জন্য যতোটুকু সম্ভব করবো।যদি বেঁচে থাকি তাহলে এই বাংলার বুকে রাজাকারদের শ্বাস নিতে দেবো না।আর যদি এদের হাতে মারা পরি,তাহলে অন্তত একটা তৃপ্তি নিয়ে মরবো যে কুত্তার বাচ্চাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে,মাঠে নেমে মরেছি।

কৃতজ্ঞতাঃ হারুন-অর-রশিদ[নওগাঁ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এর ইউনিট কমান্ডার]
মিনহাজ তোতন[মামা জটিল লিখছস,পুরা তামা তামা বলে আমাকে সর্বদা উৎসাহ প্রদান করার জণ্য]
তোকি চৌধুরী[আমার মতো চিন্তা করে এমন একটা ছেলে,অল্প সময়ে আমার খুব ভালো বন্ধু]
সবশেষে এবং সবচেয়ে বেশি অমি রহমান পিয়াল ভাই [আমার লেখা তে যার উৎসাহ,ঝাড়ি এবং মৌনবৃত্তির কোনটারই অভাব নাই এবং যে আমাকে লেখার জন্য সর্বদা উৎসাহ দিয়েছেন।]

আমার সাইটে এ লেখাটিঃ http://blog.oritro.com/244/