ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

৭১’র মুক্তিযুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীদের বিচার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় অভিযোগ নিয়োগকৃত প্রসিকিউটরগণ দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করতে পারছেন না। কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ২৯ মার্চ দ্বিতীয়ার্ধে ট্রাইব্যুনালের সামনে গোলাম আজমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করছিলেন প্রসিকিউটর জিয়াদ আল-মালুম। এক ঘণ্টারও বেশি সময় নিয়ে ১৯৯২ সালের জাতীয় সংসদের তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী) যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে একটি বক্তৃতা পড়ে শোনান তিনি।

দীর্ঘ সময় বক্তৃতা পড়ে শেষ করার পর ট্রাইব্যুনাল প্রধান নিজামুল হক ও বিচারক একেএম জহিরুল হক প্রসিকিউটরকে বলেন, এই বক্তৃতা দীর্ঘ সময় না পড়ে আমাদেরকে রেফারেন্স দিলেই চলত। একই সঙ্গে গোলাম আজমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোতে তিনি (গোলাম আজম) জরুরি অবস্থায় ৪ এপ্রিল ’৭১ তারিখে তৎকালীন পাকহানাদার বাহিনীর ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সঙ্গে কিভাবে বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন সেই প্রশ্নটি প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আসেনি। এই প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনাল প্রধান বিচারপতি নিজামুল হক প্রসিকিউটর জিয়াদ আল-মালুমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ওইদিন যেহেতু কারফিউ জারি ছিল তাই কারো বাসা থেকে বের হওয়া জীবনের জন্য নিরাপদ ছিল না। কিন্তু ওইদিন গোলাম আজম কিভাবে তৎকালীন শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সুরক্ষিত জায়গায় বৈঠক করলেন? এই প্রশ্ন সামনে রেখে এটাই কি প্রমাণিত হয় না যে, হানাদার বাহিনীর সঙ্গে গোলাম আজমের যোগসাজশ ছিল?

এই প্রশ্নের উত্তরে জিয়াদ আল-মালুম বলেন, জি মাই লর্ড। ট্রাইব্যুনাল প্রধান বলেন, এইরকম শক্তিশালী যু্ক্তিগুলোই আমরা আপনাদের (প্রসিকিউটরদের) কাছ থেকে আশা করি। কিন্তু আজকে বিচারকের আসন থেকে এই কথা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে হয়েছে। আপনারা যদি এইসব বিষয় ঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারেন তাহলে দুই বছর পার হওয়ার পর কি অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন? একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল প্রধান বলেন যে, আমরা যারা বিচারক হিসেবে কাজ করছি তারাও আপনাদের সমান বয়স। আমরাও এ বিষয়ে প্রতিদিন কাজ করার সঙ্গে নতুনভাবে অনেক কিছু শিখছি। কিন্তু যুক্তি-তর্কের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে দক্ষতা দেখানোর জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না। একজন দক্ষ আইনজীবীর তা সহজাত গুণ। তাই এতদিন পরে এসে প্রসিকিউশনের কাছ থেকে আমরা আরো গোছালো কাজ পেতে চাই। না হয় দিনের পর দিন আপনাদেরকে ছাড় দেয়া হবে না।

বার বার একই ভুল
তারিখ ঠিক না থাকা, সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ উপস্থাপন না করা, এক ঘটনার সঙ্গে আরেক ঘটনার সামঞ্জস্য না রেখে গুলিয়ে ফেলা, সুবিন্যাস্তভাবে কাগজপত্র না থাকাসহ অগোছালো আবেদনের কারণে বেশ কয়েকবার বিচারকগণ প্রসিকিউটরদের কাছে বিভিন্ন আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগপত্র ফেরত দিয়েছেন। সর্বশেষ গোলাম আজমের মামলার সময়েও একই ঘটনা ঘটেছে। এর আগে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে এরকমটি হয়েছিল। একই ভুল বার বার হওয়ায় অনেক সময় বিচারকগণ প্রসিকিউশনের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন।

বিচারক আনোয়ারুল হক প্রসিকিউটর জিয়াদ আল-মালুমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, প্রতিপক্ষের আইনজীবীরা অত্যন্ত সুবিন্যাস্তভাবে তাদের কাগজপত্র উপস্থাপন করছে। অথচ আপনারা পারছেন না। এটা অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। দুই বছরে একই বিষয়ে আপনারা অনেকবার ভুল করেছেন।

সর্বশেষ আল্লামা সাঈদীর সাফাই সাক্ষী শোখ রঞ্জন বালী ঘটনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বালী প্রথমে সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ার কথা ছিলো, পরে কেন সেই বিপক্ষে সাক্ষী না দিয়ে সাইদীর পক্ষে সাক্ষী দিতে রাজি হয়েছিলো ?

ট্রাইবুনালের এসব সমন্বয়হীনতায় এ বিচার প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে- সেটা দেখার বিষয়।