ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আমি রাজনীতি ভালো বুঝি না, তবে আমার ধারণা রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে রাজনীতি ভালো বুঝতে হয়না অথবা বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না। আব্বু-মামারা রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকায় ছোটবেলা থেকেই উনাদের রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক শুনছি। রাজনীতি বিষয়ক শব্দগুলোর মধ্যে “ওয়ান ইলেভেন” শব্দটা শুনতে সবসময়ই আমার ভালো লাগে। ভালো লাগার কারন ওয়ান ইলেভেনের সামনের-পেছনের পরিস্থিতি না, কারনটা হলো শব্দটার সাথে “নাইন ইলেভেন” এর মিল থাকা। ওয়ান ইলেভেনের সময় আমি মোটামুটি সিয়োর ছিলাম এবার দেশটা সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, নাইন ইলেভেনের সময় য্যামন আমেরিকা সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান শুরু করলো। আমেরিকার ঐ অভিযানের পেছনে সাম্রাজ্যবাদী নীতি অথবা ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব থাকলেও আমার মাথায় ঐসব ঢুকেনাই। পাকিস্তান-আফগানিস্তান আর লাদেন-তালেবান শব্দগুলো অ্যাতোই বাজে লাগতো যে যখন তাদের নির্মূলের কথা উঠলো তখন সেই “বাচ্চা আমি” হাত-পা তুলে সমর্থনই দিয়েছিলাম (আব্বু-মামাদের সাথে!)।

ওয়ান ইলেভেনে যা ঘটলো তা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এদেশের রাজনীতিতে কখনো ঘটে নাই বলে আমার ধারণা। সেনা সমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার আর দুদক যখন হাসিনা-খালেদা সহ বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি উদ্ঘাটন করতে লাগলো তখন দেশে-বিদেশে ছিঃ ছিঃ পরে গেলো। মন্ত্রী-এমপিদের ত্রাণের টিন-বিস্কুট চুরির ঘটনা তখন সবার মুখে মুখে। হাসিনা, খালেদা আর তার দুই রাজপুত্রের দুর্নিতির প্রমাণ হাতেনাতেই পাওয়া গেলো। সাধারণ মানুষ প্রায়ই উনাদের রাক্ষুসি আখ্যায়িত করে বলে থাকেন উনারা ক্ষমতা থেকে না গেলে দেশের উন্নতি হবে না। এইসময় সবার সামনে হাজির হলো “মাইনাস টু” তত্ত্ব। মনে মনে অনেকেই এই তত্ত্ব সমর্থন করে গেলো। ঐসময়ে সুশীল নামক একটা সমাজের উত্থান বেশ ভালোভাবেই ঘটলো। এই সমাজের প্রায় প্রত্যেকেই বিগত সরকারগুলোর বিষোদ্গার করে সংবাদপত্র আর গোলটেবিল নামক বৈঠকে বাণী প্রসব করতে লাগলো। সংবাদপত্র খুললেই দেখা যেতো মন্ত্রী-এমপিদের চুরি-ডাকাতির খবর। প্রায় সব রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধেই যখন পাহারসম দুর্নিতির প্রমাণ চলে আসলো তখন অধিকাংশ মানুষের মতো আমারো ধারণা হয়েছিলো দেশের মানুষ পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে আর এইসব কুলাঙ্গারদের ক্ষমতায় আনবে না।

আশা ভঙ্গ হতে দেরি হয়নি। তিন মাসের মেয়াদ নিয়ে আসা কেয়ারটেকার সরকার যখন দেড় বছরেও ক্ষমতা ছাড়লো না তখন দেশীয় রাজনীতি বিশেষজ্ঞ আর বিদেশী দাতা গোষ্ঠী আশঙ্কা করে বসলেন সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকার দেশে আবার একনায়কতন্ত্র শুরু করতে যাচ্ছে। জরুরী অবস্থা আগেই জারি করা ছিলো, প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ হলো। গ্রেফতার হওয়ার আগে শেখ হাসিনা দাবী করেছিলেন ওয়ান ইলেভেন তাদের আন্দোলনেরই ফসল, এবার তিনি মত পাল্টালেন। ইয়াজউদ্দীন ঘটনার সাথে সাথেই ফখরুদ্দীনের উত্থান দাবী করে সব দোষ চাপালেন খালেদা জিয়ার উপর। কেউ কারো থেকে কম যান না। এবার খালেদা নিজেকে আপসহীন দাবী করে বললেন হাসিনা ফখরুদ্দীনের সাথে গোপন আঁতাত করে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার জন্য এই ধরনের অবস্থা সৃষ্টি করেছেন।

সম্ভবত জেলে পুরার কারনেই হাসিনা-খালেদা আবারো জনগনের সহানুভূতি ফিরে পেলো। টিন-বিস্কুট চোর মন্ত্রী-এমপিদের কথা আমরা তো ভুলেই গেলাম, নির্বাচন করার জন্য তাদের সমর্থনও দিয়ে গেলাম। সুশীল সমাজ এবার নড়েচড়ে বসলেন। ফখরুদ্দীন মতিগতি ভালো ছিলোনা, উনারা ফখরুদ্দীনকে সমর্থনও জানাননি দাবী করে পল্টিবাজি করলেন। পরিবর্তনের ধোঁয়া তোলা প্রথম-আলো, ডেইলিস্টারের উপর মোটামুটি দোষ পরলো। কেউ কেউ দাবী করলেন প্রথম-আলোর সম্পাদক মতি ফখরুদ্দীনের সাথে চুক্তি করে এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছেন। আরো কয়েকজন কিছুটা এগিয়ে এসে বললেন মতি’র ক্ষমতায় আসার লোভ ছিলো।

যাই হোক। পুরো দেশ ডিগবাজী খেয়ে হাসিনা-খালেদা আর তাদের গোলামদের নির্বাচনে নিয়ে আসলো। ফখরুদ্দীন, যাকে আমরা একনায়ক আখ্যায়িত করে ক্ষমতার পাশাপাশি সদলবলে দেশ ত্যাগ করালাম, তার মতোন আরেক একনায়ক এরশাদকে সাথে নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে “ডিজিটাল”, “দিন বদল”, “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার” প্রভৃতি নতুন কিছু শব্দ সংযোজন করা আওয়ামী লীগ নের্তৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আনলাম। এরপর তো ইতিহাস।

সোহেল তাজ, আন্দালিব পার্থ দের মতোন প্রতিভাবান কিছু তরুণদের দেখে প্রথমে আশা জাগলেও পরে দেখলাম তাদের মধ্যে কেউ কেউ আর টিকতে পারলেন না। পরবর্তী নির্বাচনের আগে আরেকটা ফখরুদ্দীন আসলে দেখতে পাবো আগের মতোই টিন-বিস্কুট চোরেরাই এতোদিন রাজত্ব করলেন। এদের নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ নাই। রাগ লাগে যখন তথাকথিত সুশীল-বুদ্ধিজীবীরা ডিগবাজি দেন। কষ্ট লাগে যখন বুঝি সোহেল তাজ দের মতোন খাঁটি রক্তের “বাচ্চা ছেলেদের” সমর্থন জোগাতে আমরা সমর্থ নই।