ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

ছোটবেলা থেকে আমি খাতার চেয়ে পত্রিকাতে আঁকাআঁকিই পছন্দ করি। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতা অথবা কার্টুনের উপর লাইনিং টানা। হয়তো শেখ হাসিনার দাঁত বের হয়ে আছে, একটা দাঁত পোকায় খাওয়া করে দিলাম। অথবা মোটা করে খালেদা জিয়ার ভ্রূ এঁকে দিলাম। বিষণ্ণ এরশাদ চাচুর ঠোঁটে স্মাইলি এঁকে “হোয়াই সো স্যাড আঙ্কল?” রুপ দিতেও আমার ভালো লাগে। যখন পড়ি, তখন পুরো সংবাদ পড়ার চেয়ে পজিটিভ-নেগেটিভ সংবাদের রেশিও হিসাব করতে আমার মজা লাগে। কখনো ফার্স্ট পেইজে কোন নেগেটিভ সংবাদ না পেলে সেই সংখ্যাটাকে স্টার মার্ক দিয়ে দেই। এইরকম সংখ্যা পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যপার। নোবেল পুরস্কার/ক্রিকেট দলের বিজয় ছাড়া অ্যামন সংখ্যা পাওয়া যাবে না।

সাংবাদিকেরা আজকাল খুব অলস হয়ে গেছে। তারা অ্যাখন খুব গরম পরলে বাসায় বাইরের পরিস্থিতির উপর রিপোর্ট না করে নিজেদের পোষা বিড়াল অথবা কুকুরকে পানিতে ডুবিয়ে ছবি তুলে পত্রিকায় দিয়ে দেয়। সাথে ক্যাপশন থাকে “প্রচন্ড গরমে স্বস্তিতে নেই পশুপাখিও, জলকেলি করছে আমার পোষা কুত্তা জেরি”। কেউ কেউ গরমে কিছুটা শান্তি পেতে চিড়িয়াখানায় চলে যায়। সেখানে বড় বড় গাছের ছায়ায় বসে হাওয়া খায়। লাঞ্চ করতে বাসায় আসার আগে পানিতে অর্ধডুবন্ত কুমির অথবা জলহস্তীর ছবি তুলে নিয়ে আসে। সেটাতে “প্রচন্ড গরমে স্বস্তিতে নেই উভচর প্রানী কুমির/জলহস্তিও, মিরপুর চিড়িয়াখানায় গিয়ে আমাদের প্রতিবেদক দেখতে পান এই দৃশ্য। কর্তৃপক্ষের কাছে দাবী, তাদের খাচায় এসি বসানো হোক” ক্যাপশন দিয়ে পত্রিকায় প্রকাশ করে দেয়। এইসব পড়ার পর আমাকে পশুপাখি মনে হয়, ক্যানোনা পত্রিকায় দেখছি গরম শুধু পশুপাখির লাগে। মানুষের ক্যানো লাগবে?

সব সাংবাদিক কিন্তু অলস হয়নি। প্রত্যেকদিন দুই একজন এনার্জিটিক সাংবাদিককে দেখা যায়। তারা মূলত ধর্ষনের সংবাদগুলো লিখে থাকে। ঐ অংশে গেলে আমি “প্লেবয়” ম্যাগাজিনের ছায়া দেখতে পাই। শুধু ধর্ষিতার দেহের বর্ননা আর ছবি ছাড়া বাকি সবই লিখে দেন তারা। মেয়েটি কোথায় যাচ্ছিলো, ক্যামন পোষাক পরেছিলো, পথে কারকার সাথে দেখা হলো, দেখা হওয়ার পর কার সাথে কী কথা হলো, কি বলে ফুঁসলিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হলো, স্পটটি পাটক্ষেত নাকি অসমাপ্ত কোন বিল্ডিং, নাকি ধর্ষকের বেডরুম, কতজন ধর্ষন করলো, পালাক্রমে নাকি গ্যাপ দিয়ে…… (আর লিখতে ইচ্ছা করছে না) – পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে এইসবের বর্ননা দেন। ও হ্যা, মেয়েটির নাম, বয়স, পিতার নাম, ঠিকানা প্রকাশ করে আরেকবার ধর্ষনও করে ফেলেন। এই ধরনের এনার্জেটিক সাংবাদিকের জন্য পত্রিকাগুলো টিকে আছে।

“কিভাবে নিজের ফেইসবুক বানাবেন” টাইপের বই পড়া কিছু প্রযুক্তিমনষ্ক সাংবাদিক দেখা যায়। এরা মোটামুটি মানের অলস। সারাদিন এরা ফেইসবুক/ব্লগে ঘুরে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করে থাকেন। “কিভাবে ইয়াহু অ্যাকাউন্ট খুলবেন”, “কিভাবে ড্রাইভ ফরমেট করবেন”, “নতুন কিছু ইলেক্ট্রনিক পণ্য”, “ফেইসবুক ফর এভরি মোবাইল”, “এসে গেলো আনন্দ কম্পিউটার্সের বিজয় অপারেটিং সিস্টেমের অত্যাধুনিক মোবাইল ফোন” – ইন্টারনেট থেকে এই টাইপের সংবাদ সংগ্রহ করে হাতে লিখে পরে কম্পিউটারে কম্পোজ করে তা পত্রিকায় প্রকাশ করেন। ওহ! তারা হেল্প কর্নার টাইপের একটা বিভাগে ট্রাবলশ্যুটিং বিষয়ে হেল্প করেন। “কিভাবে ইয়াহু অ্যাকাউন্ট খুলবেন” সংবাদ পড়ে যদি কেউ খুলতে না পারেন তাহলে অপারেটিং সিস্টেমের নাম, র‍্যাম-হার্ডডিস্কের সাইজ, ডেস্কটপ পিসি নাকি ল্যাপটপ, এইসব তথ্য দিয়ে চিঠি পাঠালেই হবে, তারা আপনাকে যতটা সম্ভব সাহায্য করবে।

পেইড কিছু কলামিস্ট আছেন যারা পাঠককে আনন্দ দিতে পারেন। এরা রাজনৈতিক কলাম লিখে থাকেন। কেউ যদি বিএনপি-জামায়াত সমর্থক হয় তাহলে বদরউদ্দীন উমরের “বঙ্গবন্ধু ক্যানো বঙ্গশত্রু” টাইপের কলাম পড়ে পুলকিত হবেন। আর আওয়ামী সমর্থক হলে আব্দুল গাফফারের “বঙ্গবন্ধু, রাজনীতি নামক সিনেমার অমিতাভ বচ্চন” টাইপের কলাম পড়বেন।

সবচে মজা লাগে ফ্রী ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলো। পত্রিকা তো নয়, য্যানো মেয়েদের ছবির অ্যালবাম! তাদের ছবিগুলাও খুব অদ্ভুত। শিরোনাম হয়তো “হারকাঁপানো শীতে ক্যামন পোষাক পরবেন”, দেখা যাবে মেয়েটা শর্টস আর পাতলা টি-শার্ট পরে আছে। আবার শিরোনাম “প্রচন্ড গরমে স্বস্তিদায়ক পোষাক”, মেয়েটা পরে আছে জাপানী কিমোনো টাইপের আগাগোড়া মোড়া লম্বা কোন ড্রেস! বৈশাখ, নজরুল-রবীন্দ্রজয়ন্তী, ঈদ-পূজো সংখ্যাগুলোও মজার।

আপাতত এই পর্যন্তই।