ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

আমাদের সমাজ আমরা কিছুটা বড় হওয়ার পরই যেসব বিষয় আমাদের জন্য নিষিদ্ধ করে রেখেছে তার মধ্যে ছাত্র রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন, প্রেম-ভালোবাসা, নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়া অন্যতম। অথচ সবকয়টিই আমাদের জন্য দরকারি।

অনেকে মনে করে রাজনীতি মানেই খুনোখুনি, চুরি-চামারি, টেন্ডারবাজী, ক্ষমতা দখল। অথচ এইসব রাজনীতি না, এইসব আমাদের দেশীয় অপ-রাজনীতির বাই-প্রোডাক্ট মাত্র। অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবী তোলেন, বলেন এই উপমহাদেশ ছাড়া অন্য কোথাও ছাত্র রাজনীতির অস্তিত্ব নেই। অথচ তারা অন্য রাষ্ট্রের সাথে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তূলনা করে দেখেন না। তারা সবসময় উদাহরন হিশেবে উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে টানেন, অতীত বিশ্লেষণ করে দেখা যাবে ঐসব উন্নত রাষ্ট্র আর আমাদের দেশের জন্মপ্রক্রিয়ায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য। অতীতের বিভিন্ন সংগ্রাম-আন্দোলনে, বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন, উনসত্তর, একাত্তরে ছাত্রদের প্রভাব ছিলো অনেক বেশি। প্রশ্ন আসতে পারে তারা তো দেশপ্রেম থেকেও এইসব করতে পারে, আবার এই সবের সাথে ছাত্র রাজনীতির সম্পর্কটা কোথায়। ছাত্রদের অধিকাংশের রাজনৈতিক ভিত না থাকলেও তাদের কিন্তু দিক-নির্দেশ, তথ্য, উৎসাহ ইত্যাদি কিন্তু ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িতরাই দিয়েছিলো। রাজনৈতিক দীক্ষা না থাকলে এইসব ক্ষেত্রে এগুলো অনেক কঠিন। আমাদের মা-বাবা’রা যখন তাদের সন্তানদের (বিশেষ করে ছেলেদের) কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে যান, তখন প্রথমেই দেখেন প্রতিষ্ঠানটি রাজনীতি মুক্ত কিনা। অভিভাবকদের মতো শিক্ষকেরাও ধরেই নিয়েছেন ছাত্রদের রাজনীতি করা ভালো না। ফলাফল, ছাত্ররা পাবলিক ভার্সিটি ছাড়া রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারছে না। গুটিকয়েক পাবলিক ভার্সিটি বাদে বাকি সবকয়টিতে ছাত্র রাজনীতি কেবল হল আর হলের সিট দখল কেন্দ্রিক। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মকে পুঁজি করে নানা অপকর্মে লিপ্ত। এইসবের ফলে অভিভাবকদের ধারণা হয়েছে এই কলুষিত ছাত্র অপ-রাজনীতিই মূল ধারার ছাত্র রাজনীতি। সমাজ উচ্চ মাধ্যমিক-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কে বিরূপ ধারণা দেয়ায় মেধাবীরা রাজনীতি থেকে দূরেই থেকে যাচ্ছে। ক্ষমতায় যাচ্ছে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের ছত্রছায়ায় থাকা ছাত্ররা, আর বংশানুক্রমে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিরা। এই চক্র থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে সাধারণ ছাত্ররা রাজনীতি সম্পর্কে চিরকাল অজ্ঞই থেকে যাবে।

আমাদের জন্য আরেকটা নিষিদ্ধ বিষয় হলো ধর্ম সংক্রান্ত প্রশ্ন তোলা। নিরানব্বুই শতাংশেরও বেশি মানুষ জন্ম সূত্রে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী। তাদের নিজেদের পছন্দমত ধর্ম বেছে নেয়ার সুযোগ নেই। একপ্রকার হিপনোটাইজড হয়েই তারা নিজ নিজ ধর্ম অনুসরণ করে থাকে। এই “চাপিয়ে দেয়া” ধর্ম ত্যাগ/পরিবর্তন করতেও নানা বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেই সবাই বাকা চোখে তাকায়, আর অবিশ্বাসী হলে তো কথাই নেই, পারলে শিরশ্ছেদ করে ফেলে। বিশ্বাসীরা ধর্মপ্রচারে নানান ধরণের কাজ করবে, মাইক দিয়ে ধর্মীয় বাণী প্রচার করবে, বাদ্য বাজিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাবে, তাতে কারো কোনরকম সমস্যা হলে তা আমলে নিবে না। অথচ কোন অবিশ্বাসী যদি তার অবিশ্বাসের বয়ান দেয়, অবিশ্বাসের মতবাদ প্রচার করে, তাহলে তাকে মুরতাদ আখ্যা দিয়ে কতল করার জন্য প্রকাশ্যে প্রচার করা হয়। আজিব আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। অবশ্য রাষ্ট্র নিজেই যেখানে নিজের মাথায় বিশেষ একটি ধর্ম চাপিয়ে নিয়েছে সেখানে ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না, অবিশ্বাসীরা তাদের মতবাদ প্রচারে বাঁধার সম্মুখীন হবে, ধর্ম ত্যাগীরা বলি’র পাঠা হবে সেটাই স্বাভাবিক।

চলবে।