ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

এই যে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর তিরিশ লক্ষ শহীদ, দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা যেই স্বাধীনতা পাইলাম, এর পিছনের মূল কারনগুলা কি ছিলো? হুট কইরা তো আমরা যুদ্ধে ঝাপায় পরি নাই। সাতচল্লিশের দেশভাগের পরই যেই বিষয়টা সামনে আইসা পরে, তা হইলো দেশ বিভাজনটা হইছে কেবল গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থ সামনে রাইখা, ধর্ম দিয়া সাধারণ জনগনের গাব দিয়া আপেলের বুঝ দেয়া হইছে মাত্র। সেই স্বার্থান্বেষী মহল আমাগো উপর আবারো অত্যাচার চালাইছে। জাতিগত-ভাষাগত-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে আমরা নিপীড়িত জনগোষ্ঠী ছিলাম। এই থেইকা বাঁচতে মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিলো না। বায়ান্ন, ছেষট্টি, উনসত্তর, একাত্তরের যে আন্দোলন হইলো, যেই দাবী-দাওয়া উত্থাপিত হইলো সেইখানে স্বাভাবিকভাবেই এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর আশা-আকাংখ্যারই প্রতিফলন হইছে। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সবারই চাওয়া ছিলো অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক মুক্তি, স্বাধীনভাবে বাইচা থাকার অধিকার। হইছেও তাই।

তয় এইখানে কথা থাকে, এইসব দাবী-দাওয়া কি অসাম্প্রদায়িক ছিলো? বলতে চাইতেছি চাকমা, মারমা, গারো ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতি গোষ্ঠীর জন্য কি কোন আলাদা দাবী উত্থাপন করা হইছিলো? নাকি তাদের যেই দাবী, তা বাঙালীর দাবী-দাওয়ার সাথে মিশা গেছিলো? যদি তাই হয়, তাইলে কোন প্রশ্ন নাই। আর যদি তা না হয়, যদি তাদের পক্ষ থেইকা অথবা তাদের পক্ষ হইয়া কোন দাবী উত্থাপন করা না হয়, তাইলে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কি তাদের স্বার্থ রক্ষা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত ছিলো না? এইরকম কি হইছে?

বায়ান্ন, একাত্তরের বিশাল আদর্শগত তাৎপর্য আছে। তা হইলো আমরা ঐসময় নিপীড়িত হইছি, রক্ত দিয়া ভাষার অধিকার পাইছি, যুদ্ধ কইরা স্বাধীনতা আনছি। তো দেশে যেই ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠি বা আদিবাসী, যা ই বলেন তারা আছে, তাদের অধিকার রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের উপরই বর্তায়। আমরা কি আদৌ তা করছি? আমরাই তো তাদের বাঙালী হইয়া যাইতে বলছিলাম কেবল সংবিধানের কিছু ধারার মৌলিকত্ব রক্ষায়। আমরা আমাদের ভাষা, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য যুদ্ধ কইরা মুক্তি পাওয়ার পরও আদিবাসীদের ক্যান ধমক দিয়া, সেনা দিয়া চুপ করায় রাখি? আমরা কি পারি না আদিবাসী/উপজাতি তকমা বাদ দিয়া তাদের চাকমা, মারমা, গারো ইত্যাদি জাতি বইলা ডাকতে? বাংলাদেশে আমরা যেমন “বাঙালী” জাতি? ভাষার জন্য আমরা প্রাণ দিছি, আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করছি। এই যে ক্ষুদ্র জাতিগুলা, এদেরও তো আলাদা ভাষা আছে, অন্তত একটা পর্যায় পর্যন্ত কি তারা তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের অধিকার পায় না? তাদের সাংবিধানিক অধিকারের সাথে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষাও তো এই আমাদেরই দায়িত্ব, যারা একসময় দেয়ালে পিঠ ঠেকায়া অধিকার আদায় কইরা নিছে। আসলে আমাদের অবস্থাও করুণ, প্রতিবেশী দেশগুলার ভাষা-সংস্কৃতি যেইভাবে আমাদের চাইপা ধরছে, তাতে অন্যদের দিকে তাকানোর ফুরসৎ নাই।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকি বাহিনীর অত্যাচারে হিন্দুরা জ্ঞাতি গোষ্ঠি সহ ভারতে দেশান্তরি হইছে, মুসলামানেরা রিফিউজি হইছে। মুসলমানেরা ফেরত আসলেও হিন্দুরা কিন্তু ফেরত আসে নাই। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যেই অল্প হিন্দু ছিলো, তারাও একে একে ভারতে পালাইছে। দেশত্যাগের পরিসংখ্যান দেখলে অবাক হইতে হয়। এর কারন কি? স্বাধীনতার পর তো দেশটা আমাদেরই, এইখানে তো তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি থাকার কথা না। আমরা বাঙালী মুসলমানেরাই কি তাদের এই দেশত্যাগের পিছনে দায়ী না? আমরা তো সেই সাতচল্লিশের মতো ধর্মের গুড়ের কারনে স্বাধীনতা আনি নাই। এই দেশ যতটুকু মুসলমানের, ততটুকুই হিন্দুর, ততটুকু অন্য ধর্মের মানুষের। বাঙালী মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গিই কি হিন্দুদের দেশত্যাগের মূল কারন না? যদি বলেন মুক্তিযুদ্ধ কেবল নব্যসৃষ্ট মুসলিম মধ্যবিত্ত বাঙালীর স্বার্থরক্ষার চিন্তা চেতনার ফসল, তাইলেও তো এর একটা আদর্শ থাকে, যেই আদর্শের কারনে বাঙালী হিন্দুর অধিকার রক্ষা করা বাঙালী মুসলমানের দায়িত্ব হইয়া দাড়ায়। বাঙালী মুসলমানেরা একপ্রকার হীনমন্যতায় ভুগে, তারা মনে করে হিন্দুর অধিকারের জন্য কথা কইলে, দেশটারে সেক্যুলার করলে মুসলমানিত্বে টান পরে, দেশের উপর তাদের অধিকার কইমা যায় কিনা। তারা হিন্দু, তারা মালাউন, তারা মনে পুষে ভারতে যাওয়ার স্বপ্ন, কট্টরদের এই ধরনের মানসিকতাও দেশান্তরের জন্য দায়ী। যাদের সামর্থ্য আছে তারা সাতচল্লিশেই দেশত্যাগ করছে, একাত্তরের পর যারা ত্যাগ করছে তারা অপেক্ষাকৃত কম বিত্তশালী, তারা কি ভারতে সুখে আছে?

বায়ান্ন, একাত্তরের চেতনা বইলা আমরা প্রায়ই লাফালাফি করি, দেশটারে সেই চেতনা অনুযায়ী গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করি। এইটা আমাদের ক্ষণস্থায়ী আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। বায়ান্ন, একাত্তরের যেই বিশাল আদর্শিক অবস্থান, সেই অবস্থান থেইকা আমরা বহু বহু মাইল দূরে অবস্থান করি। দেশের কোন সমস্যা নিয়া কথা কইলে একাত্তরের ঘটনা রিপিট কইরা আবেগপ্রবণ হইয়া পরি, একাত্তর একাত্তর বইলা কান্নাকাটি করি, অথচ একাত্তর দিয়াই যে সমস্যার সমাধান সম্ভব সেইটা বোঝার চেষ্টা করিনা, কান্নাকাটিই সার। ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিত গোষ্ঠি, সংখ্যালঘু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করলে মহান বায়ান্ন, একাত্তরের মহত্ব বাড়ে বৈ কমে না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি বইলা যারা পরিচিত, তাদের আমলে এরা কিছুটা স্বস্তিতে থাকে। কিন্তু বড় পরিসরে কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায় না। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের রাজনীতির অবস্থা তো আরো করুণ। “বাবারা, আমার মাইয়াটা ছোট, তোমরা একজন একজন কইরা যাও” টাইপের কথাবার্তাও এদের আমলেই শুনা যায়। দেশান্তর, নিপীড়নের ঘটনা তাদের পরোক্ষ সহযোগীতায়ই ঘটে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলার কথা বাদই দিলাম। বায়ান্ন, একাত্তরের যেই বিশাল আদর্শিক তাৎপর্য, সেই আদর্শ কি আমাদের মুক্তির সাথে সাথেই বিলীন হইয়া গেছে?