ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

বেশ কিছুদিন ধরে সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করে কিছু (আসলে “কিছু” না, ৫১ জন!) শিক্ষক তাদের ছাত্র ও স্থানীয় মানুষদের নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, পুণ্যভূমি সিলেটে কোন মূর্তি (?) স্থাপন করা যাবে না, একইসাথে তারা সিলেটকে “আধ্যাত্মিক রাজধানী” আখ্যায়িত করে আধ্যাত্মিকতার দোহাই ও দিয়ে যাচ্ছেন। যদিও “আধ্যাত্মিকতা”, “আধ্যাত্মিক রাজধানী”, “ভাস্কর্য”, “মূর্তি” ইত্যাদি টার্মগুলো আসলেই তারা জানেন কিনা তা নিয়ে আমার ব্যাপক সন্দেহ আছে! ধর্মপ্রাণ হিশেবে সিলেটবাসীদের বিশেষ খ্যাতি আছে, যদিও সেই “খ্যাতির” উদাহারণ আমরা আজকাল দেখি না। ধর্মপ্রাণ বলতে যদি তারা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসকন, জামায়াত-শিবির, হিজবুত তাহরীর’র মতোন উগ্র ধর্মীয়-সংগঠনগুলোর জনপ্রিয়তা হিসাব করেন তাহলে আধ্যাত্মিক রাজধানী নাম পাল্টে জঙ্গী-অভয়ারণ্য হতে দেরি হবে না। নো অফেন্স!

ভাস্কর্য আর মূর্তির পার্থক্যটা কোথায়? ভাস্কর্য হচ্ছে শিল্পকলা বিশেষ, যা অবশ্যই ত্রিমাত্রিক হতে হবে, সেটি দেখতে ভেক্টর মতোন হতে পারে, মানবাকৃতির হতে পারে। মূর্তি বলতে দেবতার প্রতিমাকে বোঝায়। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল “অবয়ব”। মূর্তি দেবতার প্রতিনিধি, দেবতার আবাহন ও প্রাণপ্রতিষ্ঠা করার পরই হিন্দুরা সেই মূর্তিকে পূজোর যোগ্য মনে করেন। তার আগপর্যন্ত সেটি ভাস্কর্য বলেই গণ্য হবে। তবে ভাস্কর্যকে পূজোর যোগ্য মনে করলেই সেটি মূর্তি হয়ে যাবে না, পূজোর যোগ্য হতে হলে নির্দিষ্ট একজন দেবতা অথবা দেবীকে প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। পূজো যদি স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য হয় তাহলে দ্যাখা যাচ্ছে হিন্দুদের কালী দেবীর প্রতিমা যেমন “মূর্তি”, বৌদ্ধদের ক্ষেত্রে বুদ্ধের প্রতিমা যেমন “মূর্তি”, মুসলমানের হাজরে আসওয়াদও তেমনি “মূর্তি”।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যেই ভাস্কর্যটি (পাঠক, সেটি মূর্তি নয়, যেমনটি বিরোধিতাকারীরা বলছে) স্থাপন করার প্রস্তুতি চলছে সেটির থিম এরকম: এক মা তার সন্তানকে যুদ্ধে যাবার আগে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করছেন, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও তার ছেলে রুমি’র আদলে। অনুভব করার মতোন, একই সাথে দ্যাখার মতোন একটি ভাস্কর্য হতে যাচ্ছে সেখানে, অথচ কিছু শিক্ষক-ছাত্র-এলাকাবাসী তা শুরুই করতে দিচ্ছে না! তাদের কথামতোন তথাকথিত “আধ্যাত্মিকতা” রক্ষা করতে গ্যালে সারা দুনিয়া তো দুনিয়া-ই, বাংলাদেশে কোন মানবাকৃতির ভাস্কর্য থাকা উচিৎ নয়, তাতে সিলেটের ৩৬০ আউলিয়াসহ সারা দেশের আওলিয়াদের অপমান হয়। কারণ আধ্যাত্মিকতা স্থান-কালভিত্তিক কোন বিষয় না, বাঙালিও নৃতাত্ত্বিক জাতি না, যে বাঙালি অন্তরে এই ধরণের ভ্রান্ত “আধ্যাত্মিকতা” ধারণ করে সুদূর আমেরিকার ভাস্কর্য দেখেও তার “আধ্যাত্মিক অনুভূতিতে” আঘাত লাগবে, শাহজালালের অপমান হবে।

এই বিরোধিতাকারীদের পেছনে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সংশ্লিষ্টতা থাকা অসম্ভব কিছু না। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আধ্যাত্মিকতার দোহাই দিয়ে পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত ব্যাপারের বিরোধিতা এটাই প্রথম নয়। এর আগে, ১৯৯৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নামকরণ জাহানারা ইমামের নামে হওয়ার কথা থাকলেও সেই একই শ্রেণির ধর্মান্ধ মানুষদের বিরোধিতার কারণে তা হয়নি। তাদের দাবী একই ছিলো, সেই “আধ্যাত্মিক রাজধানী” যার সাথে শাহজালালের নাম জড়িত সেখানে জাহানারা ইমামের নামে হল হতে পারে না। এমনকি সেই সময় পুলিশের গুলিতে এক ছাত্র নিহতও হয়েছিলো।

ভাবতে অবাক সুদূর ইয়েমেন থেকে শাহজালাল যেই সূফিবাদ নিয়ে এসেছিলেন, যে সূফিবাদ-ভক্তিবাদ ছড়িয়েছে ৩৬০ জন আওলিয়ার মাধ্যমে, তারা ছাড়াও যে ভূমির সাথে রাধারমণ, হাসন রাজার স্মৃতি মিলেমিশে আছে সেই ভূমি এখন ধর্মান্ধদের আখড়ায় পরিণত হতে যাচ্ছে। অতীতের কর্মকান্ডের সাথে বর্তমান যোগ করে এর সাথে বিরোধিতাকারীদের পরিচয় (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১জন শিক্ষক!) মেশালে এই সিদ্ধান্তে পৌছাতে দেরি হয় না যে সিলেট আর পূণ্যভূমি নেই, সিলেট আর আমাদের নেই। ইসলামাবাদ কিংবা লাহোর অথবা সোয়াত উপত্যকা হতে খুব বেশি দেরি হবে না যদি না এখনই এই ধর্মান্ধদের মূলোৎপাটন করা হয়। চিন্তার বিষয়, ধর্মান্ধতা সেখানে একাত্তরের চেতনাকে-আধ্যাত্মিকতা-ভক্তিবাদকে পরাজিত করতে চলেছে। ধর্মান্ধতা বলছি এই কারণে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ “আধ্যাত্মিকতা”, “ধর্ম” বুঝবে না অ্যামন তো হতে পারে না, তারা কৌশলে ভাস্কর্য স্থাপনের সাথে আধাত্মিকতা ও ধর্ম গুলিয়ে ফেলেছেন (যদিও তারা ভাস্কর্য যে অনৈসলামিক সেটা সরাসরি সামনে আনছেন না)।

(কিছুটা তাড়াহুড়া করে লেখা, হয়তো ঠিক বোঝাতে পারলাম না কী বলতে চাইছি। ক্ষমাপ্রার্থী।)

***
ফিচার ছবি: [, ] লিংক থেকে সংগৃহিত