ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

বাণিজ্য মন্ত্রী গতকাল একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সাংবাদিকরা অসাধু ব্যবসায়ীর চেয়েও খারাপ’।

কোনো পেশার সঙ্গে অন্য যে কোনো পেশার তুলনা বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিকই করতে পারেন, এতে দোষের কিছু নেই, তবে গুরুত্বের একটি বিষয় আছে। যে কারণে আম জনতা যতো মন্তব্যই করুন না কেন তা পত্রিকার শিরোনাম হয় না, কিন্তু লে. ক. ফারুক খান কোনো মন্তব্য করলে সেটি একাধিক পত্রিকার প্রথম পাতায় স্থান পায়।

প্রতিজন মানুষেরই একাধিক পরিচয় থাকে। একই ব্যক্তি হতে পারেন একজন সন্তানবৎসল বাবা, একজন স্বামী, একজন চাকুরিজীবী, সমাজের একজন সদস্য, ইত্যাদি। সেই পরিচয় অনুসারে একজন ব্যক্তি কোন পরিবেশে কোন কথাটি বলছেন তার ভিত্তিতে কথার গুরুত্বও এদিক-সেদিক হয়। সে কারণেই, ছোট সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় একজন বাবা যে আষাঢ়ে গল্প শোনাতে পারেন সেই গল্পটিই ওই একই ব্যক্তি তার অফিসে পরের দিন বলতে পারেন না। কারণ সেখানে তার পরিচয় ও দায়িত্ব ভিন্ন।

ফারুক খান উল্লিখিত মন্তব্যটি করেছেন সচিবালয়ে, যেখানে তিনি পেশাগত কাজ করেন। পত্রিকা সূত্রে জানা গেল, ওই বিশ্লেষণটি তিনি যখন করেন তখন তিনি মন্ত্রী হিসেবেই মিটিং করছিলেন একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সঙ্গে। কাজেই তিনি কথাটি বলেছেন মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব নিয়েই। সাচ্চা মুসলিম হিসেবে তিনি ওই কথার সঙ্গে কোরআনের রেফারেন্সও টেনেছেন। সংবিধানমতে শপথ নেয়া একজন মন্ত্রী নিজের ধর্মের সর্বোচ্চ গ্রন্থকে রেফারেন্স টেনে ফালতু কথা বলবেন, সেটি হবার কথা নয়। ধরে নেয়া যেতে পারে কথাটি তিনি সজ্ঞানে দায়িত্ব নিয়েই বলেছেন।

এখন দেখা যাক মন্ত্রী মহোদয়ের কথার অর্থ কী দাঁড়ায়। এ বাক্যে তিনি দুটি পেশার লোক টেনেছেন। এক. অসাধু ব্যবসায়ী। তিনি গোটা ব্যবসায়ী শ্রেণীকে টানেননি, টেনেছেন ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসাধু শ্রেণী টিকে। অপরদিকে সাংবাদিকদের বেলায় তিনি কবল অসাধু শ্রেণীকে টানেননি। টেনেছেন গোটা সাংবাদিক শ্রেণীতেই। এমনকি তিনি কেনো বিশেষ আমলের সাংবাদিকদের কথাও বলেননি। ফলে তার এই কথার আওতায় হালের মুন্নী সাহা, জ. ই মামুনরা যেমন আছেন, তেমনি আছেন শহীদ সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেন বা দৈনিক বাংলা সম্পাদক প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের মতো সাংবাদিকও। এদের সবাই ফারুক খানের মতে, অসাধু ব্যবসায়ীদের চেয়েও খারাপ।

এটি মন্ত্রীর বক্তব্য। এ বিষয়ে সবাই একমত হবেন এমনটা আশা করা যায় না। তাই বলে মন্ত্রী এই কথাটি বলতে পারবেন না, সেটিও বলা যাবে না। উনি যেটি সঠিক বলে মনে করেছেন, সেটাই বলেছেন।

তবে-

একজন দায়িত্বশীল ব্যাক্তি যখন দুটি বিষয়ের তুলনা করেন, তখন তাঁকে ওই দুটি বিষয়েই পূর্ণ জ্ঞান নিয়েই তুলনা করতে হয়। কাজেই মন্ত্রী মহোদয় যখন মন্তব্যটি করেই ফেলেছেন, বলা যেতে পারে সাংবাদিক এবং অসাধু ব্যবসায়ী এই দুটি শ্রেণীকেই উনি যথেষ্ট ভালোভাবে জানেন। এখানে ‘খারাপ’ সাংবাদিকদের জেনে উনি কী ব্যবস্থা নেবেন সেটা উনিই ঠিক করবেন, অথবা করবেন না। তবে, বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে ‘অসাধু ব্যবসায়ীদের’ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া তাঁর পেশাগত দায়িত্বের মধ্যেই পরে। আশা করা যায় মন্ত্রী মহোদয় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।

দুটি পেশার মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা একজন মন্ত্রীর, বিশেষ করে বাণিজ্য মন্ত্রীর কাজের আওতায় পড়ে না। তারপরও উনি এই কাজটি করেছেন। এতে কোনো দোষ নেই। ধরে নেয়া যেতে পারে, উনি কাজটি ভালবেসে বা সামাজিক দায় থেকে করেছেন।

মন্ত্রী মহোদয় যদি বেয়াদবি না নেন, আপনি অবসর সময়ে আরো কিছু পেশা বিষয়ে তুলনামূলক আলোচনা করতে পারেন। যেমন ধরা যাক, অসাধু ব্যবসায়ী বনাম অসাধু রাজনীতিবিদ অথবা অসাধু রাজনীতিবিদ বনাম বাচাল মন্ত্রী বিষয়েও একটি থিসিস উপহার দিতে পারেন আপনি। আমরা সে থিসিসের অপেক্ষায় থাকলাম। আপনাকে ধন্যবাদ।