ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

এই হত্যাকাণ্ডটি সংগঠিত হওয়ার পর মাসাধিকাল অতিক্রম হয়েছে। হত্যাকাণ্ড টি ঘটে যাবার পর যেভাবে প্রতিবাদ হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে তার ফলে অভিযুক্তদের গ্রেফতার ও বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে।কিন্তু অনেকে ন্যায়বিচার নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছেন। অভিযুক্তরা পার পেয়ে যেতে পারে এমন আশংকাও ঝরেছে কারো কারো কণ্ঠে।তাহলে প্রতিবাদের ভাষা তো তার স্বরে আরো সরব হওয়ার কথা। কিন্তু তা এখন মিইয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে কেন? নাকি আশংকাই অহেতুক ছিলো? নাকি সরকার তার ভুল বুঝতে পেরেছে বলে মনে হয়েছে? নাকি বাঙ্গালীর চিরাচরিত ধরন ঘটনা ঘটার পর উল্কাপিণ্ডের মত জ্বলে উঠে অতপঃর পুণঃ মুশিক ভবঃ হয়ে যাওয়া?অভিযুক্তদের পার পাওয়ার সম্ভাবনা আদৌ আছে কিনা??

যে কোন হত্যাকাণ্ড তা রাজনৈতিক না অরাজনৈতিক, কেন, কি কারনে বা কিভাবে ঘটেছে সেগুলো সাধারণভাবে আলোচ্য ও বিবেচ্য বিষয় হতে পারে; তবে তা বিচার্য বিষয় নাও হতে পারে। বিচার্য বিষয় পরিপূর্ণভাবে আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। কোন্ বিষয় আদালতে আমলযোগ্য বা আমলযোগ্য নয় – তা আদালতই নির্ধারন করে থাকে। ঠিক এ কারনেই নিরপরাধী বা অপরাধী- যেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হোক না কেন তা আইন ও আদালতের দৃষ্টিতে হত্যাকাণ্ড হিসেবেই বিবেচ্য ও বিচার্য এবং প্রমাণ সাপেক্ষে এ অপরাধের সাথে জড়িত মানুষরূপী পশুগুলোর সর্বোচ্চ শাস্তিই প্রদান করে থাকে।
বিশ্বজিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমরা পত্রপত্রিকা ও ব্লগে অসংখ্য লেখা দেখেছি। কমবেশি সবগুলো লেখাতেই এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে- যা অত্যন্ত স্বাভাবিক।এছাড়াও প্রতিবাদের অনান্য উপায় যেমন মানববন্ধন,বক্তব্য,বিবৃতি ইত্যাদি পন্থায়ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ বিশ্বজিতের পরিবারের প্রতি এভাবেই তাদের সহমর্মিতা প্রকাশ করেছে এবং দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেছে।প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু একই সাথে আমার কাছে যা অস্বাভাবিক লেগেছে তা হচ্ছে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়ে অহেতুক আশংকা।

ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়ে অহেতুক এ আশ্ংকা কেন?। কারন কি? উত্তর হচ্ছে, আমরা ঘর পোড়া গরু। তাই সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পায়। অর্থাত, বিচারহীনতার দীর্ঘদিনের যে অপসংস্কৃতি আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি অজান্তে এ যেন তারই বহি:প্রকাশ। হতাশার এ বহি:প্রকাশ যেন তার স্বরে প্রতিবাদের ভাষার শক্তিকে ম্লান করে দিয়েছে।এতে ফল কি হলো? উত্তর জলবত্ তরলং। এক. যারা আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে পার পেয়েছে সেই অপরাধীরা নৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। আর দুই. আইনের শাসনে বিশ্বাসী মানুষগুলোর হতাশা দীর্ঘতর হয়েছে। ঘৃণ্য,নারকীয় এ হত্যাকাণ্ড দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়েছি।ধিক্কার জানিয়েছি। সেইসাথে হতাশার বৃত্ত ভেঙে এ আশায় বুক বেধেছি যে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত হবে। না হলে যে প্রতিবাদের প্রজ্ব্বলিত মশালের সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। সে প্রশ্ন উঠুক-আমি তা চাইনে। কারণ তাহলে অতীতে এবং বর্তমানে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের পথ ধরে ভবিষ্যতে তার ব্যাপকতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেতে পারে।

আমার কাছে মনে হয়েছে যেহেতু বিশ্বজিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে প্রকাশ্যে যার ভিডিও ফুটেজ আছে এবং চাক্ষুষ সাক্ষী বিদ্যমান সেহেতু এ হত্যাকাণ্ডে কাঙ্খিত বিচার পাওয়া অবশ্যই সম্ভব।যদিও অনেকে সুরতহাল এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে সংশয় প্রকাশ এবং এর ফলে ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশংকা ব্যক্ত করে এক প্রকার হতাশা ও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানে এ দুটি বিষয়ে একটু আলোকপাত করতে চাই-যদিও আমি আইনজ্ঞ নই।

সুরতহাল প্রতিবেদন(Inquest report) কি? কে,কিভাবে প্রস্তুত করেন?
কোন অস্বাভাবিক,আকস্মিক বা সন্দেহজনক মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃতদেহের অবস্থার যে প্রাথমিক অনুসন্ধান পুলিশ কর্তৃক লিখিতভাবে প্রস্তুত করা হয় তাই সুরতহাল প্রতিবেদন। সাধারনত পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে কেউ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে পারেন না।সংক্ষেপে বলতে গেলে, যখন কোন অস্বাভাবিক,আকস্মিক বা সন্দেহজনক মৃত্যুর তথ্য পুলিশের কাছে আসে তখন উক্ত পুলিশ কর্মকর্তা সাধারনত একজন কন্সটেবলকে সাথে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে কমপক্ষে ২ জন স্বাক্ষীর উপস্থিতিতে মৃতদেহের নাম,পরিচয়(জানা গেলে),বয়স উল্লেখপূর্বক উক্ত দেহে প্রাপ্ত জখম/ক্ষত/অস্বাভাবিক চিহ্ন কোথায়,কয়টি পাওয়া গেছে তা লিপিবদ্ধ করে থাকেন।এছাড়াও এমন কোন পারিপার্শ্বিক অবস্থার কথা(circumstantial evidence) যা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে সহায়ক হতে পারে মনে করলে তাও উল্লেখ করতে হবে। সর্বশেষ মৃত্যুর সম্ভাব্য প্রাথমিক কারন(সম্ভব হলে) সম্পর্কে ধারনা দিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত সম্পন্ন করে থাকেন।

ময়নাতদন্ত(Postmortem) কী? কে, কিভাবে প্রস্তুত করেন?
ডাক্তার মৃত্যুর কারন,ধরন,প্রকৃতি ইত্যাদি নির্ধারন কল্পে মৃতদেহকে বাহ্যিকভাবে এবং অত:পর কেটে অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরীক্ষা করেন যা ময়নাতদন্ত নামে পরিচিত। আর লিখিতভাবে আদালতে উপস্থাপিত প্রতিবেদনই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন(Postmortem report) নামে পরিচিত। সংক্ষেপে বলতে গেলে,সুরতহাল প্রতিবেদন ভালভাবে পড়ে ডাক্তার মৃতদেহকে প্রথমে বাহ্যিকভাবে দেখেন ও প্রাপ্ত তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। জখম/ক্ষত/অস্বাভাবিক চিহ্ন পাওয়া গেলে কোথায়,কয়টি পাওয়া গেছে তা পরিমাপসহ লিপিবদ্ধ করে থাকেন।তারপর মৃতদেহ কেটে অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থা একইভাবে লিপিবদ্ধ করেন।প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ভিসারা(যেমন লিভার, কিডণী ইত্যাদি) কেমিক্যাল, মাইক্রোবায়োলজিক্যাল, হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল ইত্যাদি পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে থাকেন। সবশেষে মৃত্যুর কারন,ধরন,প্রকৃতি নিয়ে তার মতামত দিয়ে থাকেন।বিশ্বজিত হত্যা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং এর প্রকৃতি যে হত্যাকাণ্ড তা উল্লেখ করা হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়।

অনেকে এ ধারনা পোষন করে থাকেন যে, যদি সুরতহাল এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন যথাযথ হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে অপরাধীর সাজা হবে। আসলে বাস্তবতা এমন না। কারন মনে রাখতে হবে যে, এ ২ টি প্রতিবেদন অপরাধী সনাক্ত করে না। শুধুমাত্র মৃত্যুর কারন,ধরন,প্রকৃতি ইত্যাদি নির্ধারন করে থাকে। সুতরাং প্রশ্ন এসে যায় তাহলে সুরতহাল এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে লাভ কি? উত্তর হচ্ছে, উক্ত প্রতিবেদন ২ টিতে প্রাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে তদন্তের মাধ্যমে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধী সনাক্তকরণ এবং শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভবপর হয়।তাই এ কথা বলা যায় যে, উক্ত প্রতিবেদন ২ টি যথাযথ হলেও অনেকক্ষেত্রে উপযুক্ত সাক্ষ্য ও প্রমানের অভাবে অপরাধীরা পার পেযে যায়।মহামান্য আদালতের তেমন করার কিছুই থাকে না। যেমন শহীদ ডা. মিলন হত্যাকান্ড। এ হত্যার সাথে জড়িত খুনিরাই নাকি আজ পর্যন্ত সনাক্ত হয়নি। তাহলে শাস্তি কাকে দিবেন? এরকম অসংখ্য উদাহরন ইতিহাসে আছে। তবে এটাও ঠিক যে, সুরতহাল এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দূর্বল/ভুল হলে তাতে প্রকারান্তরে কথিত খুনিরাই লাভবান হয়। সুতরাং যথাযথ সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন,স্বাক্ষীর সাক্ষ্য এবং উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ এ সব কিছু বিচার বিশ্লেষণ করে মহামান্য আদালত দায়ী ব্যক্তি/ব্যক্তিদের শাস্তি প্রদান করে থাকেন।

এখন বিশ্বজিত হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে আসা যাক। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রস্তুত সুরতহাল এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে যে ধূম্রজাল তৈরী হয়েছে তা ইত:মধ্যে মহামান্য হাইকোর্ট প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী পুলিশ ও ডাক্তারকে ডেকে কিছু প্রশ্ন করে বিষয়টা বুঝতে চেয়েছেন। তারা সশরীরে উপস্থিত হয়ে তাদের প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মহামান্য হাইকোর্ট এর একটি মন্তব্য এ প্রসঙ্গে খুবই প্রণিধানযোগ্য যা ন্যায়বিচার প্রাপ্তির আশা কে নিশ্চিত করবে। তা হচ্ছে মৃত্যু মৃত্যুই। কয়টি কোপে মৃত্যু হয়েছে তা বড় ব্যাপার নয়। তাছাড়া ভিডিও ক্লিপ,চাক্ষুষ সাক্ষী,আসামীদের স্বীকারোক্তি এ বিষয়গুলোর উল্লেখ করেছেন।দ্রুত চার্জশীট প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছেন।

আমি আশাবাদী এবং মনে করি অপরাধীদের অপরাধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট তথ্য উপাত্ত বিদ্যমান বিধায় তাদের ঘৃণিত কাজ আদালতে প্রমাণিত হবে এবং তারা যথাযোগ্য শাস্তি পাবে। আমরা কাঙ্খিত সে রায়ের প্রত্যাশায় রইলাম। প্রতিবাদের ভাষা ও শক্তির কাছে আসুরিক শক্তি পরাস্ত হবে-এ ভাবনা নিশ্চয় অবান্তর নয়!