ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্বের ধন। কত রক্ত, কষ্ট, লুণ্ঠন, নির্যাতন, ধর্ষণ আর ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি!পৃথিবীতে আর কোন জাতি তাদের স্বাধীনতার জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করেনি বা করতে হয়নি।এর কারন কি? উত্তরে হয়ত বহুমাত্রিক যুক্তি উপস্থাপন সম্ভব।কিন্তু এ উদাহরণ কি দেখানো যাবে যে, নিজ দেশের মুক্তিপাগল জনতার মুক্তির আকাংখাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার অভিপ্রায় নিয়ে সে দেশে-ই জন্মগ্রহণকারী কিছু স্বার্থান্ধ,ভন্ড দখলদার বাহিনীর পক্ষ নিয়ে নির্বিচারে এমন গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ,লুণ্ঠন,ধর্ষণ এর মতো ঘৃণ্য, অমানবিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে?এমন কুলাঙ্গার কি আর কোন দেশে জন্মেছে?‍‍‍‍‍‍‍ ‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍‍“স্বদেশ প্রেম ঈমানের অঙ্গ” এটা ভুলে গিয়ে ধর্মের অপব্যবহার করে এমন অপকর্ম বিশ্বের আর কোন দেশে হয়েছে কি? এ কুলাঙ্গাররা কি “বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা” নয়? ‍

তাহলে হানাদারদের পদলেহনকারী এমন অপকর্মের হোতাদের কি শাস্তি হওয়া উচিত? শাস্তি হলে তা কি সর্ব্বোচ্চ হবে না?যারা মানবতাবিরোধী এ অপরাধীদের বিচার হোক এটা-ই চায় না তাদের কাছে অবশ্য এসব প্রশ্ন করা অবান্তর।তবে, যে কোন অপকর্মের দায়ে অভিযুক্তদের যারা ন্যায়ানুগ বিচার ও প্রত্যাশিত শাস্তি আশা করে তারা তা সর্ব্বোচ্চ পরিমাণেই দেখতে চাইবে এটা-ই তো স্বাভাবিক। তাই সংগত কারণে দেশপ্রেমিক প্রতিটি মানুষের প্রত্যাশা হচ্ছে মানবতার শত্রু, দেশদ্রোহী এ মীরজাফরদের যথাযথ বিচারের মাধ্যমে সর্ব্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশিত শাস্তি কি আমরা পেয়েছি?এক কথায় উত্তর হচ্ছে “না”।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে, আমরা কেন আশানুরুপ রায় থেকে বঞ্চিত হলাম? প্রসিকিউশন কেন এ মামলাগুলো সঠিকভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলো? নাকি কোন রাজনৈতিক সমঝোতার ফসল এ রায়? অথবা পর্দার অন্তরালে কি অন্য কোন গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের তথাকথিত স্বপক্ষ শক্তির ময়ূরপুচ্ছ পরে এ বিচার বানচাল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত? এ জিজ্ঞাসাগুলো এ রায়ের পরে তাই এখন আর সাধারন কোন প্রশ্ন হিসেবে নয়; কোটি টাকার প্রশ্ন-ই হয়ে থাকবে।

যদিও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের অর্থ হলো ৩০ বছরের কারাবাস। তবুও আশংকা হচ্ছে যে সরকার পরিবর্তন হলে এ রায় বানচাল হয়ে যেতে পারে। কারন জামাত হবে তখন সরকারের অংশ। তাহলে, কাদের মোল্লা সহ অপরাপর অন্যান্য অপরাধীদের মুক্তি পেতে সময় লাগবে না।কারণ ওরা কোনদিন-ই আইনের শাসনে বিশ্বাসী ছিলো না।তার জলজ্যান্ত প্রমান হচ্ছে, ট্রাইবুনাল কর্তৃক প্রদত্ত শুধুমাত্র কারাদন্ডের রায় শুনে যারা হরতালের ডাক দেয়, ট্রাইব্যুনালকে অবৈধ্য বলে ভেঙে দেওয়ার দাবি তোলে, গৃহযুদ্ধের হুমকি দেয় তাহলে ফাঁসীর রায় হলে তারা কি করতো? এজন্য আর যাই হোক তারা যে আইনের শাসনে বিশ্বাসী নয় তা পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত। সুতরাং এটা বলা-ই যায়, ওরা ক্ষমতায় গেলে এ অপরাধীরা জামাই আদরে বের হয়ে আসবে।তাই,যেহেতু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলেও তাদের মুক্তি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে তাই বলতে হচ্ছে ওদের শাস্তির জন্য এ রায় যথেষ্ট নয়। এ দু:খ,লজ্জা,কষ্ট কোথায় রাখি?

এ রায়ের পর জামাত আবারও হরতালের ডাক দিয়েছে। এ হরতালের মোজেজা কি? কিসের হরতাল? সরকারের কঠোরতম ভূমিকা না থাকার ফলেই কি ওরা এ সাহস দেখাতে পেরেছে? রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, মফিদুল হক সহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল মানুষ তাদের গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। যদিও এ রায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে তবুও বুকের মাঝে কি যেন না পাওয়ার খচখচানি তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।অসীম হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছি আমিও অন্য সকলের মতো-ই।

ট্রাইবুনাল এ্যাক্টের ২১ নং ধারায় সরকারের এ রায়ের বিরুদ্ধে আর আপিলের সুযোগ নেই।যদিও প্রসিকিউশন আপিল করবে বলে জানিয়েছে তবুও তা উচ্চ আদালত কিভাবে নেবে তা নিয়ে নি:সংশয় হওয়া যায় না।তাই প্রসিকিউশন কে আরো বেশী তৎপর হতে হবে এখনই; যেন পরবর্তী রায়গুলোতে জন প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটে। অন্যথায় জাতি তাদের এ ব্যর্থতাকে ক্ষমার অযোগ্য দায়িত্বহীনতা ও অপরাধ হিসেবে-ই গণ্য করবে। অত্যন্ত সচেতনভাবেই সেটা হোক আমি তা চাইনে। সবশেষে বলতে চাই, যে অপরাধে বাচ্চু রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে তার চেয়েও ভয়ংকর বেশী অপরাধ করে কাদের মোল্লার কম শাস্তি হলো- এটা কতটা গ্রহনযোগ্য?