ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

স্বাধীনতার সুখ ভীষন মধুর। যে পেয়েছে সে জেনেছে। কাজল করে দু’চোখে তা লাগিয়ে নিয়েছে। আর তাই এ চোখে দিয়ে সে নিয়ত দেখতে পেয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত আলোকচ্ছটা। দৃষ্টি ঝাপসা হয়না সে চোখে। বরং আলোকিত পথপানে চেয়ে সে সারা জীবন ধরে তা দেখে, দেখায়, নিজে বিমোহিত হয়ে অন্যকে বিমোহিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। স্বাধীনতার এ এক অসম্ভব সুন্দর রূপ। যে অপরূপ রূপ মোহনীয় করে রাখে, আবিষ্ট করে রাখে সমস্ত হৃদয়, পলকহীন মুগ্ধ নয়নে মানুষ তা চেতনাহীন হয়ে অবলোকন করে।

কিন্তু দূর্ভাগা তারা যারা স্বাধীনতার এ মোহাবিষ্ট রূপ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করে আর অন্যকেও বঞ্চিত করে। তারা কারা? স্বাধীনতাহিন হয়ে কারা দিন গুজরান করতে চায়? কারা স্বাধীনতার দুর্নিবার আকাংখাকে চিরতরে নস্যাত্ করে দেওয়ার অভিপ্রায় নিয়ে ঘর শত্রু বিভীষণ আর মিরজাফর সাজতে চায়? জননী, জন্মভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে কারা মহান দেশপ্রেমিক, সাচ্চা ধার্মিক বলে নিজেদের কে জাহির করতে চায়? উত্তর ভীষন সহজ। ১৭৫৭, পলাশীর রক্তাক্ত প্রান্তর আর ১৯৭১, বাংলার রক্তাক্ত প্রান্তরে যারা দেশমার্তৃকার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারন করেছিলো এরা তারাই। চিনে নিতে কি তাদের এতটুকু কষ্ট হয় কারো? নিশ্চয় নয়।

তবুও কথা থেকে যায়। আমরা সহজে যাদের চিনতে পারি, শনাক্ত করতে পারি দেশদ্রোহী, বেইমান, মিরজাফর, রাজাকার হিসেবে অনেক তালকানা, দলকানা বুদ্ধিজীবিরা তাদের নাকি চিনতে পারে না। আর এদের আদর্শের সরাসরি অনুসারীরা তো তাদের কে মহান বুজুর্গ, ধার্মিক, সত্ ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করে। মানুষ খুন, ধর্ষণ, লুটপাট আর অগ্নিসংযোগের মতো ঘৃণ্য পাপাচারী যদি হয় বুজুর্গ, ধার্মিক, সত্ তাহলে আমরা কাদের কে বলব নর্দমার কিট? আর এসব জঘণ্য কাজে ১৯৭১ এ যারা লিপ্ত হননি তাদের কে তাহলে কি কি বিশেষনে আমরা বিশেষিত করতে পারি? এ প্রশ্ন রইলো আপনাদের কাছে।

আমাদের পূর্বসূরিরা যারা মা, মাতৃভূমির ও মাতৃভাষার জন্য অকাতরে জীবন দিয়ে গেলো ওই হায়েনাদের চোখে তাঁরা-ই নাকি বিশ্বাসঘাতক। অথবা যারা হায়েনাদের পক্ষে সাফাই গেয়ে কোরাসে বলে ১৯৭১ এ নপুংশসকেরা কোন অন্যায় করেনি, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে তারা নাকি কোন অপরাধ করেনি তাহলে অপরাধ করলো কি মুক্তিযোদ্ধারা-ই? সেই সাফাইকারীদের আমরা কি বিশেষণে বিশেষিত করতে পারি? ওদের ও কি সমভাবে বিচারের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত নয়? হয়তো সে সুদিনও আসবে সামনে। আর এ ভন্ড, বেইমানদের দোসর তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের খোলস অবগুণ্ঠন করে দেওয়ার অদম্য প্রত্যয় নিয়ে তরুন প্রজন্ম কে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। যেখানেই কথিত ছামচা বুদ্ধিজীবীদের টিকি দেখা যাবে সেকানেই তাদের প্রতিরোধ করতে হবে। জামাত-শিবিরের চেয়ে এরা আরো বেশি ভয়ংকর। এরা কালকেউটে। এদের বিষদাঁত তাই ভেঙে দিতে হবে এখনই। তাই বলি, সাধু! সাবধান!

মুক্ত, স্বাধীন দেশে শিক্ষাঙ্গনে কেন অস্ত্রের ঝনঝনানি আজ? ছাত্রদের হাতে অস্ত্র দিয়ে রগকাটার মন্ত্রে কারা দীক্ষা-শিক্ষা দিলো আজকের তারুন্যকে? কি মোহজালে তাদের আবিষ্ট করে রাখা হয়েছে যে দেশমার্তৃকার বেইমানদের আদর্শ কে বুকে ধারন করে স্বাধীণ বাংলায় তারা ঐ পরাজিত শত্রুদের পক্ষ নিয়েছে? শুধু-ই কি ধর্মের জন্য? নাকি অন্য কোন রস আস্বাদনের ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে? নিশ্চয় আছে।কিছু না কিছু তো আছেই। এসমস্ত কিছুর উত্তর কি আমরা সক্কলে জানি? কেমন করে তারা তাদের হীন স্বার্থ হাসিল করে? কি হতে পারে তার সমাধান? কেমন করেই বা এ বাঁদরগুলো লোকালয়ে আমজনতার মাঝে জায়গা করে নিলো? তা না জানলে আমরা কিভাবে ওদের মুখোশ উন্মোচন করব? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের অবস্থা থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত একটা নির্মোহ বিশ্লেষণ সাপেক্ষে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। তাহলেই, সামগ্রিকভাবে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিলো একটা শোষণহীন, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। দেশ স্বাধীনের ১ বছরের মাথায় আমরা একটা সুলিখিত সংবিধান পেলাম। যেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করে ধর্মণিরপেক্ষতার সুস্পষ্ট ঘোষনার উল্লেখ থাকলো। বলা হলো, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ফলে, অসাম্প্রদায়িক বাংলা গড়ে তোলার পথে আমাদের এক যুগান্তকারী যাত্রা শুরূ হলো। মূলনীতিতে যুক্ত হলো গনতন্ত্র আর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র। কিন্তু তবুও কেন আমরা শোষণহীন, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলাম? প্রথমেই এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক।

মনে রাখতে হবে যে, বিপ্লবের পরও প্রতিবিপ্লবীরা সক্রিয় থাকে।তাই, বিল্পবের পর যেটা সমধিক গুরুত্বপূর্ন হয়ে ওঠে তা হচ্ছে বিপ্লবের চেতনা কে সামাজিক কাঠামোর মোড়কে ঘরে ঘরে পৌছে দেওয়া। কিন্তু আমরা বোধ হয় তা পারিনি। আর তাই, স্বাধীনতার অব্যবহিত পর হতেই পরাজিত শক্তি আর তার এ দেশীয় ও আর্ন্তজাতিক দালালেরা সক্রিয় হয়ে ওঠে আমাদের এ স্বাধীনতাকে নস্যাত করে দেওয়ার জন্য। ফলে, দেশ স্বাধীনের পরে ভঙ্গুর অবকাঠামো, খাদ্য নিরাপত্তা সহ অন্যান্য সেবাখাতে যেভাবে বর্হিবিশ্বের সহযোগিতা পাওয়ার কথা তা আমরা পেলাম না। উল্টো আমাদের কে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে গালি দেওয়া হলো; আর বিশ্ব মিডিয়া তা তাত্পর্য সহকারে প্রচার করতে শুরু করলো। এমন কি এ কথাও বলা হলো যে আমাদের স্বাধীনতা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এ ধরনের অপপ্রচারের মানে কি ছিলো? এর উত্তর আর যাই হোক, তা যে সত্ উদ্দেশ্যে করা হয়নি- এটা দিব্যি দিয়ে বলা যায়।

কারন, আজকের বিশ্বমোড়লেরা সেদিন আমাদের বিরোধিতা করেছে।খাদ্য সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা তা না পাঠিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকে। যুদ্ধের ময়দানে আমাদের কে পাখির মতো মেরেও ওদের আত্মা শান্তি পায়নি। ওরা তাই জীবিত বুভুক্ষু মানুষ গুলোকে হত্যার চরমতম পরিকল্পনার রূপকল্প বাস্তবায়নের জন্য দিচ্ছি, দেব করে শেষ পর্যন্ত আর খাদ্য সহায়তা দিলো না।ফলশ্রুতিতে, কপর্দক শুন্য, যুদ্ধবিধ্বস্থ আমার এ দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। আর সেই অবস্থার সুযোগ নিয়ে দেশবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তত্পর হয়ে উঠল। (চলবে)