ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

দ্বিজাতি তত্বের ভূতের আছরে সঙ্গীন, কাহিল এবং অবশেষে কুপোকাত হওয়া তৎকালীন রাজনীতিবিদদের পারস্পারিক অবিশ্বাস আর ক্ষমতালিপ্সু মোহের বেড়াজালে আবদ্ধ নিতান্ত সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বলি হয়েই আমরা বিভক্ত হয়েছিলাম ভারত আর পাকিস্তান নামক দুটি বিচিত্র রাষ্ট্রে।লাহোর প্রস্তাব যদি হয় পাকিস্তান সৃষ্টির হাতিয়ার তাহলে সেই প্রস্তাবেই ছিলো বাংলা ভাষাভাষীদের নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবিও। কিন্তু বিধি বাম। পলাশীর আম্রকাননে ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন বাংলার স্বাধীনতা সূর্য যে অস্তমিত হয়েছিলো তা পুনরুদ্ধারের সকল আশা জলাঞ্জলী দিয়ে আমরা বাংলা ভাষাভাষীরাও ধর্মের বৃত্তে নিজেকে সমর্পণ করেই ভারত আর পাকিস্তানের পদানত হলাম।

পূর্ব বাংলা পরিচিত হলো পূর্ব পাকিস্তানরূপে। স্বাধীনতার স্বপ্নসাধে নোনা ধরতে আমাদের বেশি সময় লাগলো না ।৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করা, তারপর আউয়ুব খানের একটানা ১০বছরের সামরিক শাসনের যাতাকল, ৬২ এর শিক্ষা অন্দোলন, ৬৬ তে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং ৬৯ এর গন অভ্যুত্থান-এ সবই বাঙালির চড়াই উৎরায় পেরোবার ইতিকথা। তাই, বাঙালিরা এ ভাঙা-গড়ার খেলা খেলতে খেলতেই একটু একটু করে বুঝতে শিখেছিলো যে, বিষধর সর্পের সাথে যদিও বা আপোষ করা সম্ভব তবুও পাকিস্তানিদের সাখে একত্রে চলা আর সম্ভব নয়। অতপর আইয়ুবের পতন। দৃশ্যপটে আর এক সামরিকজান্তা ইয়াহিয়ার আগমন এবং আবার সামরিক শাসন জারি করা হলো। অবশেষে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।

কিন্তু বাঙলির শিকে ছিড়লো না। কেন্দ্রিয় ও প্রাদেশিক পরিষদের অধিকাংশ আসনে বিজয়ী হয়েও আওয়ামীলীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমষি, আলোচনার নামে সময়ক্ষেপন এবং পরিশেষে চুড়ান্ত নীলনকশা অনুযায়ী পরিকল্পিতভাকে বাঙালি নিধনের লক্ষ্যে ২৫ শে মার্চ রাতের আঁধারে সুসজ্জিত পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমন বাংলার মানুষকে প্রতিরোধে চুড়ান্তভাবে উদ্বুদ্ধ করে।
যুদ্ধ ছাড়া তাই আর বিকল্প ভাববার সময় নেই। এদিকে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষনা করেছেন ঠিকই কিন্তু তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। এখন, নেতা নেই। কি হবে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের? নেতৃত্ব কে দিবে? কিভাবেই বা যুদ্ধ পরিচালিত হবে? বিদেশী রাষ্ট্র ও সরকারসমূহের সাথে যোগাযোগ এবং সম্পর্ক রক্ষা ইত্যকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ কিভাবে সুরাহা হবে-এমনতর অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের প্রয়োজনীতা তাই তীব্র হয়ে ওঠে।

পশ্চিম পাকিস্তানীরা ২৫ শে মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করতে পারলেও তাজউদ্দিন আহমেদ সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করতে পারেনি। ২৫ শে মার্চ রাতেই তাজউদ্দিন আহমেদ ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলামকে সাথে নিয়ে নারায়নগঞ্জে পৌঁছান।অতপর তারা ৩০ শে এপ্রিল ভারতে পৌছান। কিভাব তাঁরা ভারতে পৌঁছেছেন তা উঠে এসেছে ইতিহাস গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামানের নিবন্ধে। তিনি লিখছেন, ‘তাজউদ্দিন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম নিরাপদ স্থান থেকে ভারতের উদ্দেশে ২৭ মার্চ নিঃস্ব অবস্থায় ঢাকা ত্যাগ করেন। তাঁরা ২৯ মার্চ ঝিনাইদহে পৌঁছেন। ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদ (বীর বিক্রম), ইপিআর কমান্ডার মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক এলাহী চৌধুরী ও অন্যান্যের সহযোগিতায় তাঁরা ৩০ মার্চ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত পৌঁছেন। সীমান্তের ওপারে বিএসএফ আঞ্চলিক প্রধান গোলক মজুমদার তাঁদের সংবর্ধনা দেন।’ (সূত্র:ইতিহাসের পাতায় মুজিবনগর ও মুজিবনগর সরকার,দৈনিক জনকন্ঠ, ১৭ এপ্রিল, ২০১২)

ভারতে পৌছে তারা ৪ ঠা এপ্রিল তারিখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তার আগে ভারত সরকারের নানা পর্যায়ের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে তাদের বেশ কিছু বৈঠক হয়। সে সমস্ত বৈঠকের প্রেক্ষিতেই তাজউদ্দিন আহমেদ বুঝতে পারেন যে একটি স্বাধীন গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন ছাড়া ভারত সরকার সহ বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রসমূহের সাথে যোগাযোগ রক্ষাসহ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা অসম্ভব। তাই অনেকটা তাৎক্ষনিক কিন্তু বিচক্ষন সিদ্ধান্ত নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠকে তিনি জানান যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তিনি নিজে সে সরকারের প্রধানমন্ত্রী। সে বৈঠকে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে ভারতে অবস্থানের অনুমতি প্রদান, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র প্রদান, বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়, বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, যোগাযোগের জন্য একটি বিমান প্রদান, মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ প্রেরণের জন্য বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

তবে,এ সরকার গঠনের ফলে তিনি যে, আওয়ামীলীগের ভেতর থেকেই নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন ও প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন তাও তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি ব্যারিষ্টার আমীর-উল-ইসলাম এর প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘আপনি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি জানেন না। সরকার গঠন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বুঝি। জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই তা প্রয়োজন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও অন্য নেতাদের অনুপস্থিতিতে সরকার গঠন করে নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।’ (সূত্র:স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ মুজিবনগর সরকার ছিল ধারাবাহিকতার ফসল, মুনতাসীর মামুন ১০ এপ্রিল ২০১২, দৈনিক জনকন্ঠ)

সত্যি সত্যিই যে তাজউদ্দিন সাহবের আশংকায় কোন ভুল ছিলো না তা প্রমানিত হতে বেশি সময় লাগেনি। ৮ ই প্রিল তারিখে তিনি যখন কলকাতায় ফিরে আসেন এবং রাজেন্দ্র রোডের একটি বাড়িতে আওয়ামীলীগ ও যুব নের্তৃবৃন্দের সাথে দীর্ঘ আলোচনার ফলাফল জানানোর জন্য বৈঠকে মিলিত হন তখন নেতৃবৃন্দ তাজউদ্দিন সাহেবের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু করেন। বিশেষ করে শেখ ফজলুল হক মনি চরম বিরোধিতা করতে থাকেন। দলীয় অর্ন্তকলহের কারণে অস্থায়ী সরকারের গঠনে বড় কোন পরিবর্তন বিদেশী সহায়তাকারীদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করতে পারে, এবং মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে, এমন বিবেচনায় তাজউদ্দিন আহমদ প্রস্তাবিত সরকারের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। (সূত্র:Mukti Juddho Wiki ,মুজিবনগর সরকার) ।

এ বিরোধপূর্ন ঘটনাএখানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাজউদ্দিন সাহেবকে যে প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত অব্যাহত ছিলো এবং এ ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে বিশেষ করে মোশতাকের সাথে শেখ মনির ঘনিষ্ঠতা অনেকেরই নজর এড়ায়নি। এ প্রসঙ্গে তাই কামাল লোহানী লিখছেন, ‘মোশতাক আশ্চর্যজনক ও অবিশ্বাস্যভাবে গাটছাড়া বেঁধেছিলেন যুবনেতা শেখ মনির সঙ্গে। মনি মনে মনে তাজউদ্দিন আহমেদের বঙ্গবন্ধুর কাছে গ্রহনযোগ্যতায় ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং আদর্শগতভাবে তাজবিরোধী ছিলেন। ….শুধু কি তাই, আগরতলায় আওয়ামীরীগের স্পেশাল কাউন্সিল ডেকে তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবও উঠিয়েছিলেন কিন্তু কোন লাভ হয়নি।’ ( সূত্র: রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার, কামাল লোহানী, পৃষ্ঠা-১৪৬)

যাই হোক, এমন প্রতিকুল পরিবেশ এবং নানা বাঁধা পার করেই তিনি যোগ্য কান্ডারীর ভূমিকায় নিজেকে মেলে ধরেন। অতপর তাজউদ্দিন আহমেদ মালদহ, বালুরঘাট, শিলিগুড়ি, রূপসা ও শিলচর হয়ে ক্যাপ্টেন মনসুর আলি, আবদুল মান্নান ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে সঙ্গে করে ১১ই এপ্রিল আগরতলা পৌঁছান এবং আগে থেকেই অপেক্ষারত খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও কর্ণেল ওসমানীর সাথে মিলিত হন। অবশেষে সেখানে দীর্ঘ বিতর্ক শেষে তাজউদ্দিন কর্তৃক প্রস্তাবিত মন্ত্রীসভার গঠন ও আয়তন বহাল রেখেই ক্ষমতার পরিসরে কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়, যা ১৭ই এপ্রিলে ঘোষিত “স্বাধীনতা আদেশ ঘোষণা”তে প্রতিফলিত হয়।

এদিকে ১০ ই এপ্রিল শিলিগুড়িতে থাকা অবস্থায় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া তাজউদ্দিন আহমেদের ভাষন রেকর্ড করা হয় যা রাত দশটায় প্রচারিত হয় শিলিগুড়ি খেকে।১১ ই এপ্রিল এ ভাষনটি আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে প্রচারিত হয়। তৎকালীন এ সংকটময় মৃহূর্তে বাংলার মানুষের কাছে এ ভাষন একটি অনবদ্য আশা আকাংখার প্রতীকরূপে পরিগণিত হয়েছে। সে ভাষনে তিনি সবাইকে স্বাধীন বাংলাদেশের বীর ভাই ও বোন বলে সম্বোধন করে গণমানুষের নেতা বঙ্গবন্ধূ শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সরকারের পক্ষ থেকে সংগ্রামী অভিনন্দন জানান। এ ভাষনেই তিনি সেক্টর কমান্ডারদের নাম ও তাদের উপর যে যে অঞ্চলের ভার দেওয়া হয়েছে তা উল্লেখপূর্বক দিক নিদের্শনামূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তবে, জহুরির মুক্তা চেনার মতো করেই তিনি নিশ্চিত হয়েই তাই সেই ভাষনে বলছেন, ‘আমাদের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আমাদের স্থির বিশ্বাস; কারণ প্রতিদিনই আমাদের শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আমাদের এ সংগ্রাম পৃথিবীর স্বীকৃতি পাচ্ছে।’ সবশেষে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় স্বাধীন বাংলাদেশ’ বলে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।

আমরা মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহন মানে ১৭ই এপ্রিলকেই বুঝি-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাসরে দায় থেকে এটাও উল্লেখ করলে ভালো হয় যে, এ সরকারটি ১৪ ই এপ্রিল তারিখে চুয়াডাঙ্গাতেও শপথ নিতে পারতো। কিন্তু এ খবরটি রাষ্ট্র হয়ে গেলে পাকিস্তানী বোমারুবিমান ১৩ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গাতে বৃষ্টির মতো বোমাবর্ষণ করে। ফলে চুয়াডাঙ্গাকে রাজধানী ঘোষনা করে যে শপথগ্রহন হওয়ার কথা ছিলো তা চুড়ান্তভাবে বাতিল হয়ে যায়। তাই, ১৪ এপ্রিলকে পেছনে ঠেলে দিয়ে ১৭ এপ্রিল দৃশ্যপটে হাজির হয়।

পরবর্তীতে অনেক চিন্তা করে এবং নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে তাজউদ্দিন আহমেদ কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলাকে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহনের জন্য চুড়ান্ত করেন ব্যাপক গোপণীয়তার মাধ্যমে। তাই খেয়াল করলে দেখবেন যে, ১৭ ই এপ্রিল তারিখে দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের সাথে নিয়ে কলকাতা থেকে ১০০ গাড়ী রওনা হচ্ছে ২০০ কিমি দুরের মেহেরপুরের পানে ভোর ৫ টার দিকে তখন পর্যন্ত কয়েকজন ছাড়া কেউই জানতো না যে, তাদেরকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এমন গোপনীয়তার মাঝেই সকাল সকাল ১১টায় বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার ভিআইপিরা সেখানে পৌঁছান।মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক তওফিক এলাহী চৌধুরী এবং এসপি মাহবুবের নেতৃত্বে বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে ছোট্ট একটা মঞ্চ সাজানো, ছোট দুটি কার্পেট বিছানো এবং দেবদারুর কচিপাতার তোরণ নির্মাণ কার্যক্রম তখনো চলছিল। তোরণের দুপাশে বঙ্গবন্ধুর বড় বড় ছবি ঝোলানো হয়।

পূর্ব নির্ধারিত সূচী অনুযায়ী কোরাণ তেলাওয়াতের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। যে মাওলানাকে কোরাণ তেলাওয়াতের জন্য আগে থেকে ঠিক করে রাখা হয়েছিলো সে অনুপস্থিত থাকায় সেখানে উপস্থিত মেহেরপুরের কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র মহেশ নগরের বাকের আলীকে দিয়ে তেলাওয়াত করানো হয়। পরে পাকিস্থানপন্থিরা নাকি এ ছেলেটিকে বেঁধে গায়ে গুড় মাখিয়ে পিঁপড়ার বাসা শরীরে ঢেলে দেয়। ( সূত্র: মুজিবনগর ওয়েবসাইট)

যাই হোক, এ অনুষ্ঠানের স্থায়ীত্বকাল ছিলো মাত্র ৪৫ মিনিট। টাঙ্গাইলের এমএনএ আব্দুল মান্নানের পরিচালনায় চিপ হুইফ অধ্যাপক ইউসুফ আলী গনপরিষদের পক্ষে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র পাঠ করেন। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি ঘোষনা করে এবং তার অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার অর্পণ এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষনা করে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের অন্যান্য সদস্যবৃন্দের নাম ঘোষিত হয় এবং তারা শপথ নেন।

অতপর তাজউদ্দিন আহমেদ গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ভাষন প্রদান করেন। সে বক্তব্যে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্সন করে তাদের সমর্থন কামনা করে এ বলে বক্তব্য শেষ করেন, ‘ বিশ্ববাসীর কাছে আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করলাম, বিশ্বের আর কোন জাতি আমাদের চেয়ে স্বীকৃতির বেমি দাবিদার হতে পারে না। কেননা, আর কোন জাতি আমাদের চেয়ে কঠোরতম সংগ্রাম করেনি, অধিকতর ত্যাগ স্বীকার করেনি।জয়বাংলা।’

১৭ই এপ্রিলেই বদ্যনাথতলার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মুজিবনগর। ২৩ শে জুন, ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে যে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিলো তাই আবার উদিত হলো পলাশী হতে ৭০ কিমি দুরে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে। বাংলার ইতিহাসে তাই এদিনটি চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাংলার ইতিহাস থাকবে। কারন, আমাদের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধিকারের সাথে এ দিনটি ওৎপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে।