ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

১৯৬২ সালের এই দিনে (১৫ মার্চ) মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কংগ্রেসে এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে প্রতিদিন যত অর্থ ব্যয় হয় তার তিন ভাগের দুই ভাগ ব্যয় করে সাধারণ ভোক্তারা। এই ভোক্তারাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক গ্রুপ। যারা প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রভাবিত হয় অথবা প্রভাবিত করে। কিন্তু অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপটি (ভোক্তা) সুসংগঠিত নয়। (ফলে) তাদের মতামত প্রায়ই শোনা (গ্রাহ্য) হয় না।’

কেনেডি তাঁর ভাষণে ভোক্তাদের জন্য চারটি অধিকার সংরক্ষণের প্রস্তাব করেন। ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ সেই চারটি অধিকারকে বিস্তৃত করে আরো চরটি অধিকার সংযুক্ত করে। সেই থেকে ভোক্তাদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘কনজুমার ইন্টারন্যাশনাল’ (সিআই) আটটি অধিকারকে সনদভুক্ত করে। সেগুলো হচ্ছে- ১. মৌলিক চাহিদা পুরণের অধিকার। ২. তথ্য পাওয়ার অধিকার। ৩. নিরাপদ পণ্য ও সেবা পাওয়ার অধিকার। ৪. পছন্দের অধিকার। ৫. জানার অধিকার। ৬. অভিযোগ ও প্রতিকার পাওয়া অধিকার। ৭. ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা লাভের অধিকার। এবং ৮. সুস্থ্য পরিবেশের অধিকার।

১৯৮৫ সালের পর থেকে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ভোক্তা অধিকার স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশে দেশে ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভোক্তা সংগঠন গড়ে উঠেছে। বেশিরভাগ দেশেই ভোক্তাদের স্বার্থ দেখার জন্য সরকারীভাবে বিভিন্ন কার্যালয় বা দপ্তর খোলা হয়েছে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। ২০০৯ সালে সরকার ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’ পাশ করে। এ আইন ছাড়াও ভোক্তার স্বার্থে ‘ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৪’, ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’, ‘ভোজ্য তেলে ভিটামিন এ সমৃদ্ধকরণ আইন’সহ প্রায় অর্ধশত আইন রয়েছে। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ২৭২ ও ২৭৩ ধারায়ও খাদ্যে ভেজাল মেশানোর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

এতসব আইন-কানুন থাকার পরও প্রতিদিন খবরের কাগজে খাদ্যপণ্যে ভেজালের যেসব তথ্য দেখা যাচ্ছে তা রীতিমতো উদ্বেগের বিষয়। ২০১৪ সালে জাতিসংঘের খাদ্য বিষয়ক সংস্থা-এফএও এবং খাদ্য নিরাপত্তা গবেষণাগার যৌথভাবে ৮২ প্রকার পণ্য পরীক্ষা করে। এতে ৪০ শতাংশ পণ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকারক দ্রব্য ধরা পড়ে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিইউট ২০১০-১৩ সালের মধ্যে বাজার থেকে ২১, ৮৬০টি খাদ্যপণ্যের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে। এতে ৫০ শতাংশ পণ্যে ক্ষতিকারক উপাদান পাওয়া যায়। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানের আরেক পরীক্ষায় ৪৩টি খাদ্যপণ্যের ৫ হাজার ৩৯৬টি নমুনার মধ্যে ২ হাজার ১৪৭টি নমুনাতেই মাত্রাতিরিক্ত ও ভয়াবহ ভেজালের উপস্থিতি ধরা পড়ে। যা শতকরা হিসাবে ৪০ ভাগ। এর মধ্যে আবার ১৩ ধরণের পণ্য পাওয়া গেছে যা শতভাগ ভেজাল। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায়ও একই রকম ভেজাল ধরা পড়ছে। ভেজাল ধরা পড়ার তালিকায় অনেক নামিদামি প্রতিষ্ঠানও থাকছে।

খাদ্য পণ্যে এসব ভেজালের কারণে মানুষ প্রতিনিয়ত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগ, গর্ভস্থ শিশু ও মায়ের নানা রোগ, ডায়রিয়া অন্যতম। খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে দেশে কি পরিমান মানুষ রোগাক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০১২ সালে দিনাজপুরে লিচু খেয়ে ১৪ শিশুর মৃত্যুর কারণ ছিল বিষাক্ত কেমিক্যাল। ২০১৯ সালের স্বাস্থ্য বুলেটিনে ২০১৮ সালে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় ৭ হাজার ৪৩৮ জনের মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়। গত ক্যান্সার দিবসের এক সেমিনারে বলা হয়েছে প্রতি বছর দেশে চার লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং দেড় লাখ মানুষ এ রোগে মারা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালে দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা হবে ২ কোটি ১৪ লাখ।
অন্যদিকে বিশ্ব কিডনি দিবসের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘন্টায় মারা যাচ্ছে পাঁচজন। যা বছরে যার পরিমান প্রায় পঞ্চাশ হাজার। বিগত কয়েক বছরে এসব রোগ ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। যার প্রধান কারণ হচ্ছে খাদ্যে ভেজাল। কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন এক সেমিনারে এ অবস্থাকে ‘নীরব গণহত্যা’ ও ‘নীরব মহামারী’ হিসেবে উল্লেখ করে।

শুধু পণ্য নয়, দেশের সেবা খাতের অবস্থাও নাজুক হয়ে পড়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, আইন, পরিবহন, টেলিকমিউনিকেশন, বীমাসহ সংশ্লিষ্ঠ প্রতিটি সেবা খাতে গ্রাহক বা ভোক্তার অধিকার বলে যেন কিছুই নেই। মূলত সেবা খাত হলেও বর্তমানে এসব খাতকে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। যেখানে কর্তৃপক্ষ তাদের আর্থিক লাভের জন্য ভোক্তাদের সাথে রীতিমতো কসাইয়ের ভুমিকা পালন করছে।

পণ্যে ভেজাল রোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ স্টান্ডার্ড এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), সিটি করপোরেশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে থাকে। তবে তাদের এসব কার্যক্রম প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই সামান্য। আবার আইনে ফাকফোকর দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। প্রায় অর্ধশত আইন ও সরকারের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি থাকলেও কোনভাবেই যেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ হচ্ছে না।

যদিও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে এ কাজ সম্ভব নয়। তবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ালে এবং বাজার ও উৎপাদন স্থলে নিয়মিত অভিযান চালালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনা সম্ভব। তাই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে জনস্বার্থে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে র‌্যাব-পুলিশের অভিযান জোরদার করা খুবই জরুরী। সাথে সাথে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো কঠোর হতে হবে। ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘণকারীদের লঘু শাস্তিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সেকারণে আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্ছ শাস্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর হাতে ভেজাল ও ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ করতে হবে।