ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

অনেক আশা, অনেক নীতি নৈতিকতার কথা শুনে সাংবাদিকতায় এসেছিলাম। স্বাধীন পেশা, নিত্য নতুন ঘটনার সাথে ছুটে চলা সহ অনেক কিছুই ছিল এই পেশায় আশার পেছেনে। তাই অন্য কোন চাকরির পেছনে ছুটিনি কিন্তু আজ নিজেকে কেন জানি অসহায় লাগছে। সাগর-রুনির হত্যা কান্ডের পর নিজে সাংবাদিক হয়েও এই পেশার প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলছি, আমাদের গুটি কয়েক শ্রদ্ধা ভাজন (???) সাংবাদিকদের কারনে। বলা হয় কোন ঘটনার মধ্যে একটা মেয়ে থাকলেই হয়, বাকি গল্পটা সাজিয়ে নিতে সাংবাদিকদের সমস্যা হয়না, বিশেষ করে যারা ক্রাইম রিপোর্টিং করেন তাদের জন্য এই কথার সত্যতা অনেক বেশি। সাগর-রুনির ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। ইত্তেফাকের মতো ঐতিহ্যবাহি পত্রিকায় যদি দিনের পর দিন তা হতে দেখি তাহলে আর কিছু বলার থাকে না।

গত ২১ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি সাগর-রুনির হত্যাকান্ডের ফলোআপ রিপোর্টি দেখলে এটিকে হলুদ সাংবাদিকতাও বলা যায় না। এর নাম হতে পারে ‍‌‌‌‌‌‌’কু্ৎসিত সাংবাদিকতা’। ২১ ফেব্রুয়ারি শিরোনাম করা হয় ‘স্ত্রীকে ডিভোর্স দাও, আমি সাগরকে ছেড়ে দিচ্ছি’। এই দিন পত্রিকাটিতে দাবি করা হয়, ১১ ফেব্রুয়ারি এই বার্তাটি রুনি পাঠান তার এক বন্ধুর মোবাইলে। সাত দিনে তার ঐ বন্ধুর সাথে ২৬৬ বার কথা হয়েছে। অংকের হিসেবে প্রতিদিন গড়ে ৩৮ বার। যদি গড়ে ৫ মিনিট করে কথা বলেন,( যেহেতু পত্রিকার ইঙ্গিত অনুযায়ি তারা খুব ঘনিষ্ট তাই গড়ে ৫ মিনিট হওয়া অস্বাভাবিক নয়) তাহলে প্রতিদিন তিন ঘন্টারও বেশি তারা কথা বলেছেন। ২৪ ঘন্টার মধ্যে ৮ ঘন্টা একজন মানুষ ঘুমায়, রুনিকে তার ছেলে স্বামীকে সময় দিতে হতো। সর্বপরি তার কাজে থাকতে হতো কম করে হলেও আট নয় ঘন্টা। তাহলে এতো কথা সে বলত কখন???? প্রতিদিন ৩৮ টি কল তারা আদান প্রদান করেছে। তাহলে জেগে থাকা অবস্থায় (১৬ ঘন্টা) তারা কি প্রতি ঘন্টায় কমপক্ষে দুই বার করে কথা বলত??? রুনিকে যারা চেনেন, যারা তার সহকর্মি তারা কখনোই রুনিকে মোবাইলে বেশি কথা বলতে দেখেননি।

এবার আসি অন্য প্রসংগে, ২১ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয় গোয়েন্দারা এই কললিস্ট দেখে তানভির ও তৌশিক নামে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কিন্তু ঘটনার দিন তাদের মোবাইল ফোনের অবস্থান দেখা গেছে অন্য জায়গায় তাই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা যাচ্ছে না। তাহলে কি হলো ???? আমরা সবাই রুনির হত্যা কান্ডের রহস্য জানতে চাই, তার সাথে কারো প্রেম ছিল কিনা, তার সাথে কার কার কথা হয়েছে, তিনি কারো সাথে নতুন করে সংসার স্থাপন করতে চেয়েছিলেন কিনা এটা রুনিই ভাল বলতে পারবে। যদি তথাকথিত এই ঘনিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশ হত্যা সংশ্লিষ্ট প্রমান না পেয়ে থাকে তাহলে এই রসালো গল্প কেন লেখা হলো?? ইত্তেফাক কি প্রমান করতে চাইছে রুনি দুশ্চিরিত্র ছিল??? ধরে নিলাম ইত্তেফাকের রিপোর্টি অনেক বস্থুনিষ্ঠ কিন্তু তার সাথে হত্যার সম্পর্ক কি দয়া করে একটু বলুন। আমরা সাগর রুনির হত্যা রহস্য জানতে চাই তাদের নিয়ে রসালো গল্প নয়।

এবার আসি ২৩ ফেব্রুয়ারির রিপোর্টটিতে, এদিনের শিরোনাম ছিল “সকালে রুনির মোবাইল থেকে ৩টি কল, কথা হয় ৮ মিনিট”। প্রতিবেদনে একটি ফোন নম্বর দিয়ে বলা হয় এই নম্বরে রুনির ফোন থেকে দুই বার কথা বলা হয়েছে সকাল ৭টা ২৭ ও ৩১ মিনিটে। কারা এই কথা বলেছে তা খুজে দেখা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যে মোবাইল নম্বরটি ছাপা হয়েছে তা ব্যবহার করে রুনির মা। এই নম্বরটি পত্রিকায় প্রকাশ হবার পর তাতে হাজার হাজার লোক ফোন দিচ্ছে। এভাবে একজনের ব্যক্তিগত নম্বর প্রকাশ করার কারনটা কি?? যদি বলা হয় ইচ্ছেকৃত ভাবে রুনির পরিবারের জীবন দুর্বিষহ করার জন্যই এটা করা হয়েছে তাহলে কি খুব একটা ভুল বলা হবে??

আমরা যারা তরুন সাংবাদিক তারা পুরাতনদের কাছ থেকে শিখতে চাই। এই তথাকথিত সিনিয়র সাংবাদিকদের কাছ থেকে আমরা এখন শিখছি কি করে একজন মৃত মানুষের চরিত্র হরণ করা যায়। কি করে কুৎসিত সাংবাদিকতা করা যায়। আমি জানি না পুলিশের তদন্তে ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কোন প্রতিফলন থাকবে কিনা যদি না থাকে তাহলে কি ঐ প্রতিবেদক আর পত্রিকাটি জাতির কাজে ক্ষমা চাইবে? ক্ষমা চাইবে রুনির পরিবারের কাছে? রুনির ফুটফুটে ছোট্ট ছেলেটার কাছে ? যে কিনা বড় হয়ে দেখবে তার মায়ের সম্পর্কে …।