ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

সীমান্তের ওপারে আকাশ ছোয়া পাহাড়। দক্ষিনের বাতাসে ভেসে যাওয়া মেঘ গুলো আটকে থাকে পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝিরিঝিরি জলের ধারা রুপ নিয়েছে স্রোতস্বিনী ধলাই নদী। নদীর মাঝে মাঝে বালুর চর। চারিপাশে যতদুর দৃষ্টি যায় চড় আর চড়। আপাত দৃষ্টিতে বালুর মহাল বলে মনে হলেও এই বালুর নিচে আছে সোনার খনি। কে জানে এর শুরু এবং শেষ কোথায়? স্থানীয়রা বলে নদীর জলের সাথে ছোট ছোট সোনা ভেসে আসে তারপর স্থির জলে এসে বড় হয়।

আমি যেই সোনার কথা বলছি তা হলো পাথর। বালু খুঁড়লেই ছোট বড় নানান আকারের নানান রংয়ের পাথর। একসময় রেল লাইনে পাথর দেখে ভাবতাম পাথরের ব্যবহার বুঝি এখানেই শেষ। এখন জানি বড় বড় ইমারত, ব্রীজ সহ যে কোন মজবুত সভ্যতা গড়ে উঠছে এই পাথরে। শুধু তাই পাথরের তৈরী সুন্দর নকশা সহজেই আকৃষ্ট করে জীবন বিলাসী মানুষদের। কিন্তু কেউ কি জানে এই সোনা নামক পাথরের শুরু কোথায় শেষ কোথায়, কিভাবে উঠে কিভাবে শহরে আসে? কারা এ গুলো তুলে? কেমন থাকে তারা? তারা কিভাবে বেচে থাকে? কেমন কাটে তাদের পাথর সময়?

বালু মহালে আছে শত শত পাথর কলোনী। হাজার হাজার লাখ লাখ মানুষ সেই পাথর কলোনির বাসিন্দা। বালু খুড়ে বের করে আনছে পাথর। কখনো জলের নিচে আন্দাজে হাতড়ে তুলে নিয়ে আসছে পাথর। এছাড়া আছে পাথরের বাংকার। অনেক খানি জায়গা বাধ দিয়ে মেশিনে পানি তোলা হচ্ছে। বালু সরিয়ে পাথর তোলা হয়। একদল বালু তোলে আরেক দল পাথর। এভাবে গর্ত খুড়ে খুড়ে চলে যাচ্ছে মাটির গভীরে। শত শত মানুষ পিপড়ার মত দলে উঠছে আর নামছে বাংকারে। মনে পড়ে কবিগুরুর সেই কাহিনী- কতগুলি মানুষ জীবনের ঝুকি নিয়ে গভীর খনির ভেতর থেকে সোনার তাল নিয়া আসতো। কিন্তু যার আদেশে মানুষগুলি তাদের জীবনের ঝুকি নিত সেই রাজা কখনো আলোতে আসত না।

এখানে মানুষের জীবন বড়ই অদ্ভুত। ছোট ছোট খুপড়ি ঘরে বসবাস করছে দিনের পর দিন। ছোট বড় ছেলে মেয়ে পুরুষ মহিলা সবাই একই কাজ করছে। সকাল বাশি ফুঁ দেয় তাদের দলপতি। সাথে সবাই দল বেধে নেমে পড়ে যে যার কাজে। মেয়েরা কিংবা নারীরা অধিকারের কথা জানে না। কার কি অধিকার, কাজের বেলায় সমান নাকি অসমান তবুও সমান সমান হয়ে কাজ করছে পুরুষের সাথে। এরপর দুপুর হলে আবার সেই বাশির হুইসেল। যে যার মত উঠে আসে। দল বেধে খোলা আকাশের নিচে খাবারের বাটি খোলে। কেউ শেষ করে কেউবা না কিন্তু আবারও সেই বাশির হুইসেল। এভাবে চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এরপর দিনের শেষে বাঁশিটা বাজে যখন দিনটাও শেষ হয়।

দরোজা জানালা বিহীন নৌকার ছইয়ের মত খুপড়ি ঘর গুলায় এক শরীর ক্লান্তি নিয়ে শুয়ে পড়ে এই পিপড়ার মত জীবনের মোট বয়ে চলা মানুষ গুলো। যাদের মাথার ঘাম, শরীরের রক্ত আর জীবনের বিনিময়ে গড়ে উঠে আধুনিক সভ্যতা, সেই মানুষগুলির সারা জীবনটাই রয়ে যায় রাতের নিকশ কালো আধারের মতো। রাত শেষে দিনের আলো ফুটলেও তাদের জীবনে কোনদিন আলো ফোটে না।

অনেক আগে একটা ইংরেজী সিনেমা দেখেছিলাম। রাজার হাতে বন্দী থাকত অনেক মানুষ। রাজা তাদের দিয়ে সবসময় কেবল কাজই করাত। কিন্তু তাদের ন্যুনতম চাহিদাগুলো পুরণ করতো না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে কঠোর শাস্তি দেয়া হতো। এখানে এসে তাদের সেই জীবন যাত্রা দেখে আমার দেখা সেই সিনেমা আর রক্তকরবীর কথাই মনে পড়ছে। একসময় মনে করতাম এই ধরনের ঘটনা বুঝি গল্প আর সিনেমাতেই সম্ভব। এখন নিজের চোখে দেখলাম কিন্তু আর বাস্তবতা পার্থক্য করার হিতাহিত জ্ঞান আমি হারিয়েছি। কেননা এত কিছুর পর এখান মানুষের থাকার জায়গা নেই, চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। পানিয় জলের ব্যবস্থা নেই। নেই ন্যুনতম সেনিটেশনের ব্যবস্থা। আর শিক্ষা সেতো কল্পনারও অতীত। এই মানুষগুলোকে চির আধারে রেখে আলোকিত হচ্ছে আধুনিক সভ্যতা এবং ক্রমশ বাড়ছে আধারের সীমারেখা, একদিন যখন সারা পৃথিবী ঢেকে যাবে আধারে সেদিন আধুনিক সভ্যতার ল্যাবরেটরিতে এমন কোন আলো কি তৈরী হবে যা দিয়ে শত বছরের আধারকে আলোকিত করা যাবে? আলোকিত মানুষদের এটা ভাবার এখনই উপযুক্ত সময়।

আপনারা কি জানেন আমি এতক্ষণ কোথাকার কথা বলেছি? আপনারা যারা সিলেটের জাফলং গিয়েছেন আমার কথার সত্যতা পাবেন। এমন হাজারও গল্প জমা হয়ে আছে পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলের প্রতিটি ঢেউয়ের সাথে। আরো দেখতে চাইলে কষ্ট যেতে হবে সিলেটের ভোলাগঞ্জ। আমি এতক্ষণ যা বলেছি সেই গল্প পাবেন এখানে। ধলাই নদীর তীর আর তীর ঘেঁষা লাখ মানুষের জীবন। আধারে ডুবে যাওয়া, পাথরের নিচে চাপা পড়া লাখ শিশুর ভবিষ্যত। দেখবেন বালুমহালের উপর কিলবিল করে জীবনের বিনিময়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা মানুষের রোদে পুড়া মুখ। দেখবেন সভ্যতাকে গড়ে তোলা বঞ্চিত মানুষের বক্র চাহনি। আপনাকে ঠাট্টা করছে, বিদ্রুপ করছে। আপনি তাদের মুখের দিকে তাকাতে পারবেন না। আপনি নিজেই চিৎকার করে বলবেন এভাবে জীবন বাঁচে না, এভাবে মানুষ বাঁচে না। তবে তারা বেঁচে আছে মানুষ নয়তো মানুষের মত কিছু একটা হয়ে। নিজেরা বিলীন হয়ে যাচ্ছে সভ্যতাকে বাঁচাবে বলে।

***
লেখাটি গত ১০-০৪-১১ তারিখে সমকালে ছাপা হয়েছে।