ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

ডক্টর জাফর ইকবাল স্যার, আপনি কোথায়, আর আমি কোথায়? আপনি হলেন বটগাছ, আমি হলাম ঘাষ। আপনি সমুদ্র, আমি এক মগ পানি। আপনি হলেন মানবতার মুক্তির এক সেনাপতি, আমি হলাম মানবতার মুক্তির এক সৈনিকের জুতো পরিষ্কার করার পর্যায়ের এক মানুষ। আপনার সাথে নিজেকে তুলনা করার মতো দুঃসাহস আমার নেই। আপনি আমাদের কাছে খুবই শ্রদ্ধেয় একজন মানুষ। কিন্তু, রোহিঙ্গাদের নিয়ে আপনার বক্তব্য আমার কাছে খুব ই অযৌক্তিক মনে হয়েছে। স্যার, আপনি নিজে কয়েকটা রোহিঙ্গা পরিবারের দায়িত্ব কেন নিচ্ছেন না? আপনার পরিবারের অন্যান্যদের অবস্থা ও আপনার থেকে অনেক ভালো, তাদের কে ও কেন উৎসাহ প্রদান করছেন না দায়িত্ব নিতে? আমাদের অবস্থা নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো। আপনার অবস্থা যতদূর জানি তেমন না। কারণ কি? আপনি শিক্ষা কে কাজে লাগিয়েছেন, নিজ যোগ্যতায় অনেক উপরে আছেন। আমরা আপনার পদধূলির ও যোগ্য নই। কিন্তু, আজ আপনাকে আমি কিছু কথা না বলে পারছিনা। কথাগুলো আপনার কাছে খুব খারাপ লাগবে, যদি আপনি সেগুলো কখনো পড়েন তবে হয়ত অনেক যুক্তি উপস্থাপন করবেন, আপনার সাথে যুক্তিতে আমি পারবো না। গণিতের মাধ্যমে ১+১=৩ ও নাকি বানানো যায়। আমি এসব জানিনা, বুঝিনা, পারিনা। কিন্তু, কোন যুক্তির মাধ্যমে আজ আপনি রোহিঙ্গাদের পক্ষ নিচ্ছেন? শুধুই মানবতা? শুধুই মানবতা দিয়ে কি জীবন চলবে স্যার?

আপনি একাত্তুর আর বর্তমান মায়ানমারের সমস্যা এক করছেন কোন দুঃসাহসে? হ্যাঁ, দুঃসাহসে। একাত্তুর কেন আপনি তো আমাদের চেয়ে বেশী জানেন। আপনি একাত্তরের সাথে রোহিঙ্গাদের দাঙ্গা কে কি করে সমানভাবে দেখছেন? ভালো কথা, ওদের জন্য আপনার খারাপ লাগছে। মানুষ হিসেবে খারাপ লাগতেই পারে, আমাদের ও খারাপ লাগছে। কিন্তু, আপনি এই দেশের একজন শীর্ষ নাগরিক হয়ে সরাসরি ওদের পক্ষ নিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, মানবিকতার দোহাই দিয়ে নিজ দেশের হাজারো সমস্যা উপেক্ষা করা “একাত্তুর কে ভুলে গেলাম” টাইপের প্রশ্ন করেছেন। আপনার কি সামর্থ্য আছে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দেবার?

কোথায় স্বাধীনতার সংগ্রাম, আর কোথায় এক ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে জাতিগত দাঙ্গা। রোহিঙ্গারা ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়ে নিজেদের দেশে দাঙ্গার সৃষ্টি করেছে। আর আমাদের দেশে ৭১ এ যে যুদ্ধ হয়েছিল, সেই যুদ্ধের কারণ কি? ওরা আমাদের সারা দেশ কে ভারত বিভক্তির পর ধর্ষণ করেছিল। করেনি? এই দুই ধর্ষণ কে কি আপনি এক করে দেখছেন?

আপনি কি ওদের (কাদের? সেটা বলতে ঘেন্না লাগে) মতো বলতে চাচ্ছেন যে, আমাদের দেশে একাত্তুরে স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়নি? ওট একটা গণ্ডগোল ছিল?

শরণার্থীদের কষ্টের জীবনের কথা আপনি ভোগ করেছেন, আর আমরা শুনেছি। এবং ইতিহাস পড়ে আমরা জানি যে, যুদ্ধের পর আমাদের দেশে শরণার্থীরা ভারত থেকে চলে এসেছিল। কিন্তু, দুই দফায় এই দেশে যেসব শরণার্থী এসেছিল, সেই শরণার্থীদের কি মায়ানমার ফেরত নিয়েছিল?

আর ভারত আমাদের কে সাহায্যের বিনিময়ে কি কিছুই নেয়নি? পরাজিত সৈনিকদের অস্ত্র এবং মালামাল নিয়েছিল কি না? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে যে সকল চুক্তি হয়েছিল তা পালন করেছিল কি না? পানি নিয়ে কি আমদের বঞ্চিত করছে কি না? এসব কেন? ৭১ এর সাহায্যের জনই করছে না? আমরা কি মায়ানমার সরকার থেকে কিছু পেয়েছি? (যদি ও আমরা কিছু চাই না ওদের কাছে, আমরা চাই ওদের যেসব শরণার্থী এই দেশে ছে, তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাক।)

ওরা নৌকায় জীবন-যাপন করছে, খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছে, কিন্তু এই দেশেই কোটি কোটি মানুষ অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে না? কয় টা দৃশ্য দেখতে চান আপনি? আমার নিজের তোলা ছবি আছে যে, একজন লোক ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়াচ্ছে। তাদের জন্য কি বেশী ভাববো? নাকি রোহিঙ্গাদের জন্য? আমাদের দেশে এমন অনেক মানুষ আছে যারা তাদের গাঁয়ের পোষাক পর্যন্ত পড়তে পারছেনা অভাবের জন্য। ছেঁড়া পোষাক পড়ে দিনযাপন করছে। স্যার, ছেঁড়া পোষাক পড়ে, ফুটপাতে থেকে, অথবা গাছ তলায় থেকে যারা জীবন নির্বাহ করে তাদের জন্য আমরা কি করছি? আপনি কি করছেন? আপনি শুধু লেকচার দিয়ে গেলেন, যান, রোহিঙ্গাদের কয়েকটা পরিবারের দায়িত্ব আপনি নিন। আমাকে নিতে বলবেন? আমার সামর্থ্য নেই।

এই দেশে যেসব রোহিঙ্গা এসেছে, তাদের কে নিয়েই তো আমাদের অনেক অনেক অনেক অনেক সমস্যা। সেই সমস্যা কি ভুলে যাচ্ছেন? এই দেশে কি আপনি আরো রোহিঙ্গা এনে জঙ্গিদের উৎসাহিত করতে চাচ্ছেন? আপনি জানেন না যে, রোহিঙ্গাদের সাথে কাদের সম্পর্ক?

রোহিঙ্গা এই দেশে আসলে কাদের লাভ হয় আপনি জানেন না? আপনি কি জানেন না যে, রোহিঙ্গা সরকার আমাদের দেশের দূতাবাসে কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে ভবিযোগ করেছেন যে, আমাদের দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ঐ দেশে বিভিন্ন ক্ষতিকর এবং ধ্বংসাত্মক কাজের ইন্ধন দেয়া হচ্ছে।এসব কি মিথ্যা?

পরিশেষে আপনাদের একটা লিঙ্ক দিচ্ছি যা কয়েকদিন আগে আমি পোষ্ট করেছিলাম আমার ওয়ালে। সেই পোস্টে এমন অনেক প্রশ্ন আছে। যদি সামর্থ্য থাকে তবে ঐ সবের উত্তর দিন। আমরা খন্ডন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। যদি না পারি, আমরা সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করবো যেন রোহিঙ্গাদের এই দেশে প্রবেশ করতে দেয়া হয়।

স্যার, আরেকটা কথা, মায়ানমারের নোবেল বিজয়ী নেত্রী কোথায় এখন? জানেন নিশ্চয়ই। উনি জন্মদিন পালন এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার আনতে বিলেতে গিয়েছেন। আর সেনা সরকার নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। অথচ, আমার আপনার দরদ দেখে মনে হচ্ছে যে, মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশী। আর মাসির দরদ যখন বেশী দেখা যায়, তখন সে নাকি মাসী না। ডাইনি … নিজ দেশে আগুন জ্বলছে, মানুষ মরছে, অথচ উনি চুপ। উনি পেয়েছেন শান্তিতে নোবেল। হায়রে আমার নোবেল।

স্যার, অনেক কটু কথা বলে ফেললাম। কিন্তু শেষে একটা মজার বিষয় উল্লেখ না করে পারছিনা। মৌলবাদী এবং স্বাধীনতার বিরোধীরা আপনার কোন কথাই পছন্দ করেনা। কিন্তু, আপনা প্রথম আলোতে রোহিঙ্গা নিয়ে লেখার পর আমাদের কাছে আপনাকে মানবতার মুক্তির সেনাপতি হিসেবে উল্লেখ করা যাচ্ছেন। দিলেন তো স্যার আগুনে ঘি ছিটিয়ে … আবেগের কাছে বিবেকের সমর্পণ মানতে পারলাম না।

(আরেকটা কথা না বলে পারছিনা, মানুষ কে জ্ঞানী ভাবুন, এখন আমরা এমন যুগে আছি, যেই যুগে আর কোন পয়গম্বর আসবেন না। যারা আছি, তারা মানুষ। আর মানুষ মাত্রেই ভুল হতে পারে। ডক্টর জাফর ইকবাল স্যার একজন মানুষ। ওনার ভুল হতেই পারে। তারপর ও বলবো যে, এই দেশে জাফর ইকবাল স্যার এর অনেক অবদান। উনি সত্যি ই আমাদের দেশের সবার জন্য একজন আদর্শ হতে পারেন। ভুলে যাবেন না, আবারো বলছি, কোন পয়গম্বরের আর জন্ম হবে না পৃথিবীতে।)