ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

ক্ষুধার্ত ওরা? নাকি শুধুমাত্র মানসিক রোগী? ওদের কে দেখে মনে হয় পাগল। একটু কথা বলে দেখুন। ওরা সবাই পাগল? নাকি এর মাঝে মানসিকভাবে সুস্থ মানুষের লক্ষণগুলো আছে। আর পাগল ই হোক ওরা, কিন্তু ক্ষুধার্ত কেন? ওরা পাগল বলে ওদের কি কি ক্ষুধাশক্তি নেই? তাহলে চলুন, আমি আপনি সবাই পাগল হয়ে যাই। পেটের যন্ত্রণার জন্যই তো আমরা সব করি। পাগল হলে তো আর ক্ষুধা লাগবেনা।

আগে শুধু সিনেমাতে নায়ক নায়িকার বাবা-মা কে দেখতাম যে, ওরা কোন কারণে পাগল হয়ে যায়, শেষ বয়সে এসে সুস্থ হয়, সবাই কে ফিরে পায়। কিন্তু, বাস্তবে কি পাচ্ছে? কোথায় যাচ্ছে তারা, তাদের নিয়তি তাদের কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমরা কি সেসব ভাবি? ভাবি না? কেন ভাববো না? ওরা কি আমাদের কেউ না?

আমি পাগল শব্দটি ব্যবহারের পক্ষে নই। ওদের কে আমরা বলতে পারি মানসিক রোগী। কিন্তু এই রোগ কোথা থেকে আসছে সেটা আমাদের ভাবতে হবে। আমি সমস্যার গোঁড়ায় যেতে চাচ্ছি। আমার খুব ই ক্লোজ একজন ্মানুষ ছিলেন। উনি ছিলেন সাইকোলজি’র ষ্টুডেন্ট। তখন ওনার কাছাকাছি থাকার কারণেই সাইকোলজি আমার একটা প্রিয় বিষয় হয়ে উঠেছিল। এই বিষয় টা খুব ই মজার। আর এই বিষয়টআর মাঝে আমরা মজা পাই সেটা নিয়ে পড়াশোনা করতে খুব খারাপ লাগেনা। মানুষ কেন পাগল হয় সেটা বিভিন্ন বই-পুস্তক এবং অনলাইন রেফারেন্স থেকে জানতে পারলাম যে, মানুষ সাধারণতঃ তিন টি কারণে পাগল হয়ে থাকে।

১। শরীরের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের জন্য (বংশগত হতে ভাবে ও হতে পারে বিষয় টা। আবার কিছু রাসায়নিক স্তরে কিছু উপাদানের পরিমাণ কমে যাওয়ার জন্য ও হতে পারে)
২। মৌলবাদী মনস্তাত্বিক কারণে (আমি ধর্মীয় মৌলবাদের কথা বলছি না। আমি বলছি যে কোন বিষয়ে উচ্চাশা, উচ্চ মাত্রায় ঘৃণা, কোন ধরণের বিশ্বাসের উপর অতিরিক্ত আস্থা প্রকাশ ইত্যাদি অন্যতম কারণ),
৩। পারিপার্শ্বিক কারণে (সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা, একাকী জীবন যাপন করা, কোন বিয়োগান্তক ঘটনা, যে কোন ধরণের বিচ্ছেদ)

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবরগ কি কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছেন এই বিষয়ে? দেশে কতো রকম গবেষণা হয়, সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় বের করা হয়। কিন্তু, এই বিষয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ খুব বেশী কোন কার্যক্রম গ্রহণ করছেননা। মনোচিকিৎসক আমাদের দেশে মাত্র একজন রয়েছেন ১৫ লক্ষ মানুষের জন্য। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বরাতে জানা যায় যে, এই দেশের প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের প্রায় ১৭ ভাগ বিভিন্ন রকম মানসিক রোগে আক্রান্ত। তারমানে প্রায় ১,৫০,০০,০০০ (দেড় কোটি… কিন্তু সংখ্যা টা আরো বেশী হতে পারে, কারণ, বর্তমানে কতোজন ভোটার রয়েছেন তার সঠিক সংখ্যা আমার জানা নেই। আমি ধরেছি ৮,৫০,০০,০০০ ভোটার) প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ বিভিন্নরকম মানসিক রোগে আক্রান্ত। অবাস্তব মনে হলেও এটাই সত্য। কারোর সমস্যা টা বেশী, কারোর কম। কিন্তু, এই দেড় কোটি প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ যদি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়, তবে একটা দেশ কর্মক্ষম ব্যক্তির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে এবং তা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে না শুধু, সর্বক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। এই বিষয়ে আমি এখনো কোন জনপ্রতিনিধিদের খুব একটা বক্তব্য দিতে দেখি না। সরকার প্রধান যিনি আছেন, তিনি শুধুমাত্র অটিজম নিয়ে ভাবছেন। উনি কেন এই দেড় কোটি লোক নিয়ে ভাবছেন না?

আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার নীতিতে কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য কে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার আওতায় আনা হয়নি। কিন্তু এটা খুব ই প্রয়োজন। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও একজন করে মানসিক রোগের চিকিৎসক থাকা জরুরী। শুধু তাই নয়, প্রতিটি গার্মেন্টস, ব্যাঙ্ক, বীমা, বিভিন্ন অফিস-আদালতে ও এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ থাকা জরুরী। আমরা আজ হয়তো এই সমস্যা কে বড় করে দেখতে পাচ্ছিনা। কিন্তু, একটা সময় পর্যন্ত এই বিষয়ে অবহেলা করার কারণে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে।

তবে আশার বাণী হলো এই রোগের চিকিৎসা আছে। কিন্তু, আমরা এই ধরণের কোন সমস্যা হলে সাধারণতঃ বলে থাকি যে, জ্বীনের আছর পড়েছে। বা পরীর। কিন্তু এগুলো খুবই হাস্যকর এই যুগে। জন্ডিসে যখন একজন শেষ পর্যায়ে আসে, তখন তার লিভার নষ্ট হয়। তখন সেই মানুষটা মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। কিন্তু হজুর শ্রেণীর লোকেরা তাকে পিটিয়ে পিটিয়ে বেহুশ করে ফেলে। তখন বলে হয়তো, এখন জ্বীন ছেড়ে দিয়েছে। হুজুর চলে যায়, এর কিছুক্ষণ পর হয়তো মানুষ টি মরে যায়। এমন ঘটনা হয়তো অনেকেই দেখেছেন। আমি বলতে চাচ্ছি হুজুরের দরকার নেই। আল্লাহ কে নিজে ডাকুন। আল্লাহ/ভগবান, ঈশ্বরের নির্দেশ মতো চলুন এবং চিকিৎসকে শরণাপন্ন হোন। অনেক সময় আবার দেখা যায় যে, কোন কিশোর বা কিশোরী হঠাৎ করে বিষণ্ণতায় ভুগে। তখন ও আমরা ঐসব হুজুরের শুরণাপন্ন হই। আরে, হুজুর কে কেন ডাকতে হবে? নিজেরা কেন আল্লাহ কে ডাকিনা এবং ঐ কিশোর বা কিশোরীকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাই না?

রাস্তাঘাটে আমরা অনেক ধরণের ভবগুরে মানুষ দেখি। এদের মাঝে অনেক পাগল (মানসিক রোগী) দেখি, যারা বিভিন্ন ধরণের পাগলামী করে বেড়াচ্ছেন। খুব ই নোংরা অবস্থায় দেখি। এদের সংখ্যা কম নয়। এসব যখন প্রথম প্রথম দেখতাম খুব কষ্ট হতো, এখন আর হয় না। আবেগ ভোঁতা হয়ে গেছে। কিন্তু, যখন মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই এদে নিয়ে ভাবি তখন শিউরে উঠি। এরা বাঁচে কি করে, থাকে কোথায়? গোসল করতে পারে? বা মল-মূত্র ত্যাগ করে কোথায়? যারা বস্ত্রহীন অবস্থায় আছে, তারা অতি শীতে বা অতি গরমে কী করে জীবন ধারণ করে? আপনি ও একটু ভেবে দেখুন। অথবা ভাবুন যে, ওরা তো আমাদের পরিবারের বা আমি আপনি নিজেই হতে পারি। এসব কেন বলছি? এসব বলার কারণ একটাই, যার যার এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের কাছে এদের জন্য কিছু করার দাবী জানান। এদের জন্য সরাসরি কিছু করতে না পারুন, কিন্তু এদের জন্য যারা বৃহত্তর পরিসরে কিছু করতে পারে তাদের কে একটু চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখান। জনপ্রতিনিধিরা যদি দেখতে পারে, তবে হয়তো স্বাস্থ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও দেখবে। আর ওনারা উদ্যোগ নিলে দেখবেন সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের, ব্যক্তির অভাব হবে না।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে, জনপ্রতিনিধিরা এসব নিয়ে ভাবেন না। কারণ, মানসিক রোগীরা তো আর ভোটার নন। অনেকেই হয়তো ভাবেন, কিন্তু তাদের ভাবনা টা ভাবনার মাঝেই থেকে যাচ্ছে। আমরা ভাবনা কে ভাবনার মাঝে রাখতে চাই না। আমরা আমাদের নিজেদের দৃষ্টি খুলে দিতে চাই, আমরা চাই অপরের দৃষ্টি খুলে দিতে। আমরা চাই মানবতার প্রতিষ্ঠা করতে। মানসিক রোগীদের অবহেলা করে কি মানবতা প্রতিষ্ঠা হয়?