ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

‘ওতো মানুষ না আওয়ামী লীগ।’ এমন এই কথাটি তখনি একজন আরেক জনকে উদ্দেশ্য করে বলে যখন ওই ব্যক্তি সভ্য সমাজের বাইয়ে গিয়ে অথবা মনুষ্য ব্যক্তিত্বের বাইরে কোনো কিছু করেন বা বলেন। পথে-ঘাটে, আড্ডায় এ কথাটি ব্যপক প্রচলিত। অবশ্য তরুণ সমাজের মধ্যে বাক্যটিতে একটি শব্দের পরিবর্তন আছে। ‘ওতো মানুষ না ছাত্রলীগ।’ যাই হোক, ‘আওয়ামী লীগ’ কিংবা ‘ছাত্রলীগ’ ইতোমধ্যে এক ধরনের গালিতে পরিণত হয়েছে। মনে করার কোনো কারণ নেই আওয়ামী বিদ্বেষী কিংবা বিরোধীদের কাজ এটি। আমিও প্রথমে তাই মনে করেছিলাম। কিন্তু আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ করেন এমন অনেকের মুখে এই উক্তিটি অনেকবার শুনে, বুঝে নিশ্চিত হয়েছি এর সত্যতা আসলে কতটুকু। এখন অবশ্য হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি আওয়ামী লীগ কোন দিক দিয়ে যাচ্ছে-আসছে। আপনিও কী টের পাচ্ছেন না?

যাক, যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাই সে প্রসঙ্গে আসি। দিন বদলের কথা বলে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে নির্বাচনে বিশাল সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে মহাজোট। আরো আড়াই বছর বাকী আছে এ সরকারের। তবে শুরুতেই কিছুটা হলেও চমক ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রী পরিষদে। আওয়ামী লীগের বাঘা বাঘা নেতাদের বেশিরভাগই স্থান পেলেন না এবারের মন্ত্রীসভায়। যাকে বলে একেবারে ‘গুরুদ-’। তাতে মনে মনে কিছুটা বেজার হলেও তারা একান্ত বাধ্যগত এবং আজ্ঞাবহ। রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে তাদের কেউ কেউ বেশ চোটপাট দেখালেও দলীয় প্রধানের কথা শিরোধার্য। আর যারা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বনে গেছেন তাদের কথা না হয় বাদই দিলাম। তবে শুরুতে নব্য মন্ত্রী-এমপিরা চলনে-বলনে কিছুটা মার্জিত হলেও এখন তারা অনেক বেশি অসংযত, ঔদ্ধত। কোনো বিষয়ে কখন কাকে কী বলছেন তার ঠিক নেই। এই যেমন সেদিন (সম্প্রতি) জাতীয় সংদদে দাঁড়িয়ে বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি’কে টোকাইদের সংগঠন বলে মন্তব্য করেছেন। শুধু তাই নয়, জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ‘আনু মুহম্মদ’র নাম ব্যঙ্গ করে বলেছেন ‘মনু মুহম্মদ।’ আওয়ামী লীগ করার অন্যসব যোগ্যতা থাকলেও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কম, মানুষজন চেনেন না বললেই চলে-তাই এমন কথা বা ব্যঙ্গ তিনি করতেই পারেন। তাছাড়া প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বার্থে আঘাত লাগলে অনেকের শিষ্টাচার জ্ঞান তো দূরের কথা মনুষ্যত্বই হারিয়ে ফেলেন। হাছান মাহমুদের বেলায়ও এর কিছু একটা ঘটেছে। যাই হোক, ভেবেছিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাননীয় এই মন্ত্রীবরকে ধমক-টমক দিয়ে মুখে লাগাম দিতে বলবেন, শিষ্টাচার শিখতে বলবেন। কিন্তু কই, শেখ হাসিনা ‘টু’ শব্দটি পর্যন্ত করলেন না। আসলে ভুলটা আমারই হয়েছে। আমার মতো এ ভুলটা আরো অনেকে হয়তো করে থাকবেন। যিনি নিজেই হরহামেশা অমার্জিত, বেফাঁস কথা বলে অভ্যস্ত তিনি এই নাবালক প্রতিমন্ত্রীকে কী ধমক দেবেন বা শেখাবেন? তাছাড়া প্রতিমন্ত্রীর এই ঔদ্ধত আচরণের এক-দু’দিন আগে প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেখানে কনকো-ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি করার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। বিরোধীতাকারীদের অদেশপ্রেমিক, উন্নয়নবিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছেন। নিজেই শ্রেষ্ঠ দেশ প্রেমিক বলে দম্ভ করেছেন। আমারা নাদানরা ভুলটা এখানেই করি। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিমন্ত্রী সংস্করণই তো হাছান মাহমুদের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। তাঁর করতলেই তো তিনি আশির্বাদপুষ্ট। শেখ হাসিনা এবং হাসান মাহমুদের পর এবার আরেক দেশ প্রেমিক (শেখ ফজলুল করিম সেলিম), দেশ দরদী গত শনিবার (২৫ জুন) জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে একই ভঙ্গিতে কথা বললেন। নিচে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশিত সংবাদ থেকে তা তুল ধরা হলো,

“জনগণের স্বার্থে সরকার খনিজ অনুসন্ধান ও উত্তোলন করবে জানিয়ে শেখ ফজলুল করিম সেলিম তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির উদ্দেশ্যে বলেছেন, আপনার যা পারেন করুন গিয়ে। তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা হরতাল ডেকেছেন। কার স্বার্থে, কোন অধিকারে আপনারা হরতাল ডেকেছেন? আপনারা কি জনপ্রতিনিধি? আপনাদের তো জনগণের কাছে জবাব দিতে হবে না। “জনগণের স্বার্থে আমরা গ্যাস-কয়লা অনুসন্ধান করবো, গ্যাস-কয়লা উত্তোলন করবো এ কথা উল্লেখ করে শেখ সেলিম বলেন, “আপনারা যা পারেন করুন গিয়ে। দেশের মানুষের ভালোর জন্য যা করার তাই আমরা করবো। আপনারা চিৎকার করতে থাকেন। যুক্তিসঙ্গত কিছু থাকলে নিয়ে আসুন।“ জাতীয় সংসদের শনিবারের অধিবেশনে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে শেখ সেলিম এসব কথা বলেন।

বঙ্গোপসাগরে ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস উত্তোলনে মার্কিন প্রতিষ্ঠান কনকো-ফিলিপসের সঙ্গে গত ১৬ জুন উৎপাদন-বণ্টন অংশীদারিত্ব (পিএসসি) চুক্তি করে সরকার। চুক্তিতে ৮০ শতাংশ গ্যাস কনকো-ফিলিপসের রপ্তানির সুযোগ রয়েছে- এ দাবি করে শুরু থেকেই এই চুক্তির বিরোধিতা করে আসছে তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটি। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার মডেল পিএসসি-২০০৮ প্রণয়ন করে। ওই মডেলের আলোকে আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে বঙ্গোপসাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য কনকো-ফিলিপসকে নির্বাচিত করা হয়।

‘আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি দরদ থাকতে পারে না’ কনকো-ফিলিপসের সঙ্গে সরকারের চুক্তির সমালোচনা যারা করছেন তাদের উদ্দেশ্যে শেখ সেলিম বলেন, “আমাদের দেশে মাটির নিচে প্রচুর পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ- গ্যাস ও কয়লা আছে। এই প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের জনবল, ক্ষমতা বা আর্থিক স্বচ্ছলতা আমাদের নেই।”

“প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনে সরকারের নেওয়া কিছু ব্যবস্থা বিষয়ে অনেকে আপত্তি তুলেছে,” জানিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীগ সদস্য শেখ সেলিম বলেন, “আওয়ামী লীগই এই দেশকে জন্ম দিয়েছে। জন্মদাতা কোনো সন্তানের ক্ষতি করতে পারে না।”

“আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি দরদ এই দেশের প্রতি কারো থাকতে পারে না,” যোগ করেন সেলিম। তেল-গ্যাস খনিজ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির কর্মকান্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “দেশে নতুন শিল্প হোক- আপনারা তা চান না। গ্যাসের জন্য শিল্প-কলকারখানা হচ্ছে না। আপনারা চান না- বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাসের সংযোগ লাগুক, বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হোক?”

সুতরাং হাছান মাহমুদ, শেখ সেলিমদের নিকৃষ্ট মুখে ভবিষ্যতে আরো অনেক কিছুই হয়তো শুনতে হবে। এসব নিকৃষ্ট মুখের বচন বন্ধ করার উৎকৃষ্ট দাওয়াই হলো দাঁতভাঙা জবাব। দাঁত ভেঙে দিয়ে জবাব দিলেই এদের আস্ফালন বন্ধ করতে হবে। না হয় দেশটাই আওয়ামী লীগ হয়ে যাবে।