ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

greece

গ্রিসে ‘বেল আউট’ প্রস্তাবের উপর অনুষ্ঠিত হওয়া ঐতিহাসিক গণভোটে ৬১ শতাংশ গ্রিক ‘না’ ভোট দিয়েছে। এর অর্থ হলো কঠিন শর্তে আর কোন আন্তর্জাতিক ঋন নিতে গ্রিকরা রাজি না। এই ব্যাপারটিকে অনেকে গ্রিকদের বিজয়, সবলের বিরুদ্ধে দুর্বলের জবাব, সার্বভৌমত্বের জয় ইত্যাদি নানা অভিধায় অলংকৃত করছেন। কিন্তু বাস্তবতা কি এমন? আসলেই কি গ্রিকদের বিজয় হয়েছে নাকি তাদের জন্য অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির পথ প্রশস্থ হয়েছে?

বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র স্বীকৃত দেউলিয়া দেশ গ্রীস। আর এই পরিণতির জন্য সম্পূর্ণরুপে দায়ী দেশটির রাজনীতিবিদ তথা নীতি নির্ধারকরা। সংশয়বাদী বামপন্থীরা একে পুঁজিবাদী আগ্রাসনের ফলাফল হিসেবে উল্লেখ্য করে সাম্যবাদী বিপ্লবের আওয়াজ তুলতে পারেন, কিন্তু এতে করে গ্রিকদের ভাগ্য পরিবর্তনের আপাত কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। সমস্যা সমাধান করতে হলে সমস্যার মূলে যেতে হবে। শুকনা কথায় যেমন চিড়ে ভিজে না তেমনি আবেগী বা বিপ্লবী শ্লোগান দিয়েও অর্থনীতি চালানো যায় না। গ্রিসের পরিস্থিতি বুঝতে হলে আগে সমস্যার প্রকৃতিটা বুঝতে হবে।

আসুন সহজ করে গ্রিসের সমস্যাটা বোঝার চেষ্টা করি। গ্রিস ইউরোতে প্রবেশ করে ২০০১ সালে। এর আগে ১৯৯৯ সালে তারা ইউরোতে প্রবেশের জন্য আবেদন করে এবং নিজস্ব মুদ্রা ‘ড্রাকামা’ বদলে ‘ইউরো’কে নিজেদের মুদ্রা হিসেবে গ্রহন করে। ইউরোতে প্রবেশের পরের ৮ টি বছর ছিল গ্রিসের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময়। প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগের ফলে এ সময় গ্রিসের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হুয়। কিন্তু গ্রিক সরকারের দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারনে তাদের বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকে। এই ঘাটতি পূরণের জন্য গ্রিস সহজ শর্তে ঋণ নেয় ইউরোজোন থেকে। এই ঋনের টাকায় চলতে থাকে তাদের রাস্ট্রীয় ভোগবিলাস। ঋণ নেয়ার সময় তারা ঋণদাতাদের কাছে অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র গোপন করে তারা। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা বিবেচনা করে এবং ভবিষ্যত সম্ভাবনা বিবেচনায় আইএমএফ ও ইইউ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সহজ শর্তে ঋন পায় গ্রিস।

২০০৮ সালের শুরু হওয়া বিশ্বমন্দায় ব্যাপক ভাবে আক্রান্ত হয় গ্রিস। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ে। বিশ্বমন্দার কারনে ইউরোপের অন্যান্য দেশও আক্রান্ত হওয়ায় সহজ শর্তে গ্রিসকে ঋন দেয়ার মত আর কেউ থাকলো না। তাছাড়া ইউরোজোনের নীতি নির্ধারকরাও বুঝতে পারলেন যেভাবে গ্রিসের অর্থনীতি চলছে তাতে করে গ্রিসের পক্ষে পূর্বের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। তাই পরবর্তী ঋন দেয়ার আগে তারা বেশ কিছু কঠিন শর্ত আরোপ করে। এর মাঝে ছিলো সরকারের ব্যয় সংকোচন, সুযোগ সুবিধা সীমিত করণ, করের পরিমাণ বৃদ্ধি ইত্যাদি। বাধ্য হয়ে এসব শর্ত মেনেই ২০১০ সালে দুই বেল আউটে ইইউ ও আইএমএফ থেকে ২৪০ বিলিয়ন ঋন নেয় গ্রিস সরকার।

২০১৫ সালে এই ঋনের কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়ে রাষ্ট্রীয় দেউলিয়াত্বের শিকার হয় গ্রিস। এই পর্যায়ে এসে কিছু কটু সত্য কথা বলা দরকার। ইউরোজোনে প্রবেশের পর থেকে গ্রিস যা করেছে সেটা হলো স্রেফ পরের ধনে পোদ্দারি। নিজেদের অর্থনৈতিক কাঠামো ঠিক না করে একের পর ঋণ নিয়ে সেই টাকা দিয়ে বিলাসিতা করেছে। এমনকি ২০০৪ অলিম্পিক আয়োজনের বিলাসিতাও করেছে তারা। ব্যাপারটা ছিল এমন যে লাগে টাকা দেবে গৌরি সেন! কিন্তু এটা ভাবেনি যে গৌরিসেন ইইউ এর ভাণ্ডারও একসময় সীমিত হয়ে পড়তে পারে। যারা ঋন দেয় তারা স্বভাবতই তাদের ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তা চাইবে। গ্রিসের অর্থনীতি যেভাবে চলছিলো তাতে করে তাদের ঋন কখনো পরিশোধ হবে না এটা বুঝতে পেরেই ইউরোজোনের নেতারা ২০১০ সালের বেল আউটের সময় বেশকিছু কঠিন শর্ত আরোপ করেছিলো। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। গ্রিস ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। এখন পুনরায় ঋণ দেয়ার আগে তারা কেন কঠিন শর্ত দিবে না? ফেরত পাবে না জেনেও টাকা ধার দেয়ার মতো হাতেম তাই তো বিশ্বে এখন নেই। তাছাড়া ঋনদাতা ঋনের টাকার যথাযথ ব্যবস্থাপনা দাবি করতেই পারে যেহেতু অব্যবস্থাপনার যথেস্ট নজির ইতোমধ্যেই তৈরি করেছে গ্রিস।

গ্রিসের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিবে এবার? পরিবর্তন আনার আশাবাদ শুনিয়ে গ্রিসের ক্ষমতায় এসেছে বামপন্থী সিরিজা পার্টি। মাথা উঁচু করে বাঁচার আহবান জানিয়ে, দেশবাসিকে কথার জালে মুগ্ধ করে প্রধানমন্ত্রী এলেক্সেই সিপ্রাস বেইল আউট প্রস্তাবের উপর আয়োজিত গণভোটে ‘না’ কে জয়ী করেছেন। এখন পরিস্থিতি নির্ভর করবে ইউরোজোনের নীতি নির্ধারকদের উপর। খুব সম্ভবত গ্রিসকে ইউরো জোন থেকে বের করে দেয়া হবে এবং পূর্বের ঋন পরিশোধের জন্য চাপ দেয়া হবে। সেক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে গ্রিসকে রাশিয়ার কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋন নিতে হবে।

কথায় বলে গরীবের বউ সকলের ভাবী। এককালের মহাপরাক্রমশালী গ্রিসের আজ হয়েছে এই অবস্থা। রাশিয়া কোনকালেই গ্রিসের বন্ধু ছিল না। তাও পুতিন গ্রিসকে লোন দেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন শুধু রাজনৈতিক কারনে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভেঙ্গে একই আদলে ইউরোশিয়া গড়ার স্বপ্ন পুতিনের। গ্রিসকে ইউরো থেকে বের করে আনতে পারলে সেটা পুতিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে। কিন্তু গ্রিস বা গ্রিকদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?

রাশিয়ার কাছ থেকে ঋন নেয়াকে স্বভাবতই ভাল চোখে দেখবে না ইইউ কিংবা ন্যাটো। ফলে তারা বকেয়া ঋন পরিশোধের জন্য আল্টিমেটাম দিবে, অন্যথায় গ্রিসের উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। অতএব এটাও কার্যকর সমাধান না। একটা কার্যকর সমাধান অবশ্য আছে এবং তা নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী সিপ্রাসের নেগোসিয়েশন দক্ষতার উপর। সেটা হলো ইইউ থেকেই সহজ শর্তে ঋন পাওয়ার ব্যবস্থা করা। সিপ্রাস যদি এটা করতে পারে তাহলে আপাতভাবে হয়তো পিঠ বাঁচবে গ্রিসের অন্যথায় তাদের জন্য চরম ভোগান্তিই অপেক্ষা করছে।

এখন গ্রিসের ব্যাংকগুলো বন্ধ। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বুথ থেকে গ্রিকরা দিনে ৬০ ইউরোর বেশি তুলতে পারেন না। অথচ বিদেশি নাগরিকদের এক্ষেত্রে কোন বাধা নেই। দ্রুত লোনের ব্যবস্থা না হলে এই ৬০ ইউরোও কিছুদিন পর আর পাওয়া যাবে না। অবস্থাটা একবার চিন্তা করুন, নিজেদের দেশে টাকার অভাবে হয়তো অভুক্ত থাকবে গ্রিকরা কিন্তু তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে ফাস্টফুডের দোকানে বসে বার্গারে কামড় দিবে বিদেশি নাগরিকরা। হ্যাঁ, এটাই হতে যাচ্ছে গ্রিসে। আর আজ যে গ্রিকরা সরকারের কথায় ‘না’ ভোট দিলেন, দুইদিন পর তারাই সরকারের পতনের দাবিতে রাস্তায় নামলে অবাক হবো না। পেটে খাবার না থাকলে আত্মসম্মানবোধ খুব বেশিদিন কাজ করে না।

নীতি নির্ধারকদের দুরদর্শীতার অভাবে একটি দেশের পরিণতি কতটা করুন হতে পারে তার উদাহরন হলো গ্রিস। গ্রিসের এই পরিস্থিতি থেকে এটাও শিক্ষনীয় যে, অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে সাময়িক উন্নতি করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর জন্য কঠিন মাশুল দিতে হয়। সাধারন গ্রিকদের জন্য একরাশ সহমর্মিতা, তোমাদের দূর্ভাগ্য যে একপাল অযোগ্যের হাতে তোমরা শাসন ক্ষমতা তুলে দিয়েছিলে।