ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

‘ও মাইগো , ও মাইগো, ও মাইগো’ বলে চিৎকার করেছে তের বছরের রাজন!

‘তাদের’ অট্টহাসিতে চাপা পরে গিয়েছে রাজনের এই আর্তনাদ।

‘আর আমারে মারিও না, আমার আত পা ভাঙ্গি গেসে’-ব্যাথা সইতে পা পেরে আকুতি করছিলো রাজন!

অথচ লোহার রড দিয়ে রাজনকে পিটিয়ে তখনো ‘তাদের’ হাতের সুখ মেটেনি। হাত পা গুলো ভেঙ্গেছে কিনা তাও ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। ভিডিওটাও ভালোভাবে করা হয়নি।

‘ও ভাই আমারে এক গলস পানি দেওরেবা’- পিপাসার্ত রাজনের বুক চিড়ে এই আর্তি বের হয়ে এসেছিলো!
অথচ ‘তাদের’ মনে হয়েছিলো রাজনের ঘাম খাওয়া উচিৎ। তাছাড়া এ সময় পানি খেতে দিলে নির্যাতনের মুডটা নস্ট হয়ে যেতো। দুই একজন অবশ্য এনার্জি ড্রিঙ্ক বা বিয়ার দেয়ার প্রস্তাব করেছিলো। রাজনের শরীরে একটু বল ফিরে আসলে আবার নতুন করে টর্চার শুরু করা যেত।

অথচ রাজনটা বড্ড বেয়াড়া। মাত্র আধাঘন্টার নির্যাতনে মরে গেলো। ‘তাদের’ আয়েশ করে মারতে পর্যন্ত দিলো না। ‘তাদের’ কত্ত শখ ছিলো ভালো একটা ভিডিও করে ফেসবুকে দিবে, দেশে বিদেশের মানুষ এই বীরত্বগাথা দেখে তাদের স্যালুট জানাবে।

এই ‘তাদের’ বলতে কাদের বুঝানো হচ্ছে? যদি তাদের পশুর সাথে তুলনা করেন তাহলে পশুদের অপমান করা হবে। বাকশক্তি থাকলে সব পশু চিৎকার করে প্রতিবাদ করে বলবে , ‘আমরা তোমাদের মতো মানুষ নই। আমরা এতো নীচ, পাষন্ড, জঘন্য নই। আমরা মনের আনন্দে আমার স্বজাতিকে আঘাত করিনা। আমরা দুর্বলকে মেরে নিজের বীরত্ব জাহির করিনা। ‘

আয়নায় একবার নিজের চেহারাটা দেখুন। হ্যা, ‘তাদের’ বলতে আপনাকেই বুঝানো হচ্ছে। কিছুক্ষন আগে আমিও আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে উঠেছি। আরে, এ যে রাজনের খুনী!

সমস্যাটা আমাদের মানসিকতায়। সমস্যা আমাদের বেড়ে উঠার প্রক্রিয়ায়। সমস্যা এই সমাজ ব্যবস্থার। রাজনের খুনের জন্য আমি, আপনি সবাই দায়ী। ভিডিও প্রচারের কারনে হয়তো রাজনের নামটা আপনি জানেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রতিদিন নাম না জানা অসংখ্য রাজন এভাবেই নির্যাতনের শিকার হয়। কেউ মারা যায়, কেউ সুস্থ হয়ে আবার নির্যাতিত হবার জন্য তৈরি হয়। আমরা তাদের খোঁজও রাখিনা।

২০১১ সালের ১৭ই জুলাই, সাভারের আমিনবাজারে শবে বরাতের রাতে ছয়জন কলেজ ছাত্রকে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে মেরেছিলো গ্রামবাসী। একজন, দুইজন কে নয় ছয়জনকে শুধু সন্দেহের বসে নির্মমভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছিলো। পুলিশ গিয়েও কিছু করতে পারেনি। যারা মেরেছিলো তারা কিন্তু কেউ দাগী আসামী বা পেশাদার অপরাধী না। তারা সবাই ‘নিরীহ’ (!) গ্রামবাসী।

প্রায়ই পত্রিকার পাতায় বাড়ির গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর পাওয়া যায়। কি বাহারি সব নির্যাতনের উপায়। গরম খুন্তি দিয়ে ছেক দেয়া, গরম ইস্ত্রী দিয়ে গাঁ পুড়িয়ে দেয়া, গায়ে গরম পানি ঢেলে দেয়া, অভুক্ত রেখে স্টোররুমে আটকিয়ে রাখা। কারা করে এই নির্যাতন? না, তারা কেউই অপরাধী না। বরং তারা সমাজের উচ্চবিত্ত সমাজের গণ্যমান্য লোক। মাঝে মাঝে নারী আর শিশু অধিকার নিয়েও তাদের কথা বলতে দেখা যায়।

বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল গুলোতে চোর সন্দেহে মাঝে মাঝে বহিরাগত আটক হয়। তখন  হলের ছাত্রদের যেন ঈদ লেগে যায়। যে যেভাবে পারে আঘাত করে রক্তাক্ত করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিটিকে। অনেককে আবার এই নির্যাতনে অংশীদার হতে না পেরে মন খারাপ করতে দেখা যায়। বন্ধুদের আড্ডায় চোর পেটানোর এই বীরত্বগাথা গর্বের সাথে আলোচনা করা হয়। খেয়াল করে দেখুন, এরাও অপরাধী না। বরং প্রত্যেকে দেশের শীর্ষ মেধাবীদের একজন।

প্রায়ই দেখা যায়, রাস্তার পাশের টি স্টলের চা বিক্রেতাটি আগুন গরম পানি নিতান্ত খেয়ালের বশে রাস্তার পাশে কুকুরটির গায়ে ছুড়ে মারে। যন্ত্রণাকাতর কুকুরটির ঘেউ ঘেউ চিৎকার তার কানে শান্তির পরশ দেয়। রাস্তায় কোন ছিনতাইকারী বা চোর ধরা পড়লে দল মত নির্বিশেষে সকলে তাকে মারার জন্য অস্থির হয়ে যায়। আপাত নিরীহ মানুষটিও বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

সমস্যার প্রকৃতিটা ধরতে পারছেন? সমস্যা আমাদের মানসিকতায়।  সমাজের বেশিরভাগ মানুষই নিরীহ নিপাট ভদ্রলোক সেজে দিন গুজরান করে। কারন সুযোগ বা সাহসের অভাব। কিন্তু একবার সুযোগ পেলে তাদের ভিতরের প্রকৃত হিংস্র রুপ বের হয়ে আসে। ভাজা মাছটি উলটে খেতে না জানা ছেলেটি দারুন আক্রোশে আঘাত করে দেয়। সারাজীবন আধুনিক চলিতরীতিতে কথা বলা ছেলেটির মুখেও বের হয়ে আসে আদিমতম অশ্রাব্য গালিগালাজ। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার আমাদের এই সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আমি আপনি সবাই মনেপ্রানে এটা লালন করি। এটাই নির্ভেজাল সত্য। আর আমাদের ভালমানুষি বাহ্যিক রুপটা একটা ভন্ডের প্রতিচ্ছবি মাত্র।

খুব হতাশ লাগছে। নিজেকে অক্ষম মনে হচ্ছে। নিজের মানুষ সত্ত্বাটির জন্য লজ্জা লাগছে, ঘেন্না হচ্ছে। যে সমাজ, সমাজের মানুষ তের বছরের রাজনের বাঁচার নিশ্চয়তা দিতে পারেনা, সেখানেই আমাদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে। আসলেই কি বেঁচে আছি আমরা?

(রাজনের হত্যাকাণ্ডটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপকভাবে আলোচিত হওয়ায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তড়িৎ ব্যবস্থা নিয়েছে। হত্যাকান্ডের মূল আসামি মুহিতকে গ্রেফতার করে পাঁচদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। আরেক হত্যাকারী সৌদি আরবে পালিয়ে যাওয়া কামরুলকেও জেদ্দা থেকে আটক করা হয়েছে। শীঘ্রই দেশে ফিরিয়ে এনে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হবে। চিহ্নিত করা হয়েছে এই হত্যাকান্ডে জড়িত অপর ছয় আসামি আলী, ময়না, দুলাল, পাভেল, শামীম ও ইউসুফকে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এদিকে বসে নেই অপরাধীদের পরিবার। রাজনের মাইক্রোবাস চালক পিতা আজিজুর রহমানকে মামলা তুলে নেয়ার জন্য ত্রিশ লাখ টাকার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলে জানা যায়, এমনকি জীবননাশের হুমকিও দেয়া হচ্ছে। কিন্তু রাজনের বাবা ও মা লুবনা আক্তার খুনীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে অটল রয়েছে। এলাকাবাসীও এই ব্যাপারে উচ্চকিত। দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির মাধ্যমেই এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব। সম্ভব আমাদের পাশবিক মানসিকতাকে দমিয়ে রাখা। আর কোন রাজনের আর্তনাদ যেন আমাদের শুনতে না হয়। )