ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

ট্রাফিক জ্যাম! নগরবাসীদের জীবনে এক মূর্তিমান আতংকের নাম। দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাফিক জ্যামের কারনে নগরবাসীদের ভুক্তভোগী হতে হচ্ছে । নাগরিক জীবনে কর্মস্থলে যাতায়াতের সময়টা যেন রীতিমত নরক যন্ত্রনায় পরিনত হয়েছে। বিগত কিছুদিনে এই ট্রাফিক জ্যামের তীব্রতা অতীতের সকল মাত্রা বিশ মিনিটের রাস্তা যেতে সময় লেগেছে দেড় কিংবা দুই ঘন্টা, ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি। শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকা শহর নয় চট্রগ্রাম, সিলেট সহ অন্যান্য বিভাগীয় এমনকি বড় জেলা শহর গুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে ট্রাফিক জ্যাম।

ট্রাফিক জ্যামের কারণে প্রতিদিন যে পরিমান কর্মঘন্টা নস্ট হচ্ছে তা হিসাব করলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ পাওয়া যাবে বিশাল। দিনের গুরুত্বপূর্ন সময়ে বিশ্বের আর কোথাও মনে হয় এতোবেশি সময় নস্ট হয় না। ট্রাফিক জ্যামের কারনে পরিকল্পনামাফিক কাজ করা যাচ্ছে না, নষ্ট হচ্ছে জীবনীশক্তি। অসুস্থ রোগী পরিবহনের মতো জরুরী পরিবহনের ক্ষেত্রে ট্রাফিক জ্যাম তো রীতিমত অভিশাপ। মাঝে মাঝে এর তীব্রতা এতো বেশি থাকে যে চাইলেও এম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকে পর্যন্ত চলার সুযোগ করে দেয়া যায় না।

ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিরসনের জন্য নানা চেষ্টা করা হচ্ছে। নিয়মিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ন সড়কে ফ্লাইওভার নির্মিত হচ্ছে। শহরের মূল সড়ক গুলোতে ইউটার্ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সীমিত করা হয়েছে রিকশা চলাচল। কিছুদিন পূর্বে অটোসিগন্যালিং প্রসেস চালু করে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রনের ব্যর্থ চেস্টা করা হয়েছে। কিন্তু তবুও ট্রাফিক জ্যাম নামক পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।

ঢাকা শহরের যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার দীর্ঘমেয়াদী বেশকিছু পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। এর মাঝে রয়েছে মেট্রোরেল সার্ভিস ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আলাদা বিশেষ লেনে আর্টিকুলেটেড বাস সার্ভিস চালু। কিন্তু এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন বেশ সময়সাপেক্ষ। এসব প্রকল্পের সুফল পেতে নগরবাসীদের বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। অথচ যে হারে ট্রাফিক জ্যামের তীব্রতা দিনকে দিন বাড়ছে, এর আশু সমাধান করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা শহরে চলাচল রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ট্রাফিক জ্যাম সৃস্টির কারণগুলোর দিকে দৃস্টি দেয়া যাক। কিছু কারন তো সহজেই অনুমেয়। অপ্রশস্থ রাস্তা, পর্যাপ্ত পার্কিং প্লেসের অভাব, রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের অপ্রতুলতা, চালক ও যাত্রী উভয়ের ট্রাফিক নিয়ম মানার অনীহা ইত্যাদি। এসব সমস্যা আগেও ছিলো, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের মতো ট্রাফিক জ্যামের এতো তীব্রতা আগে ছিলো না। আমার দৃষ্টিতেট্রাফিক জ্যামের এই ক্রমবর্ধমান তীব্রতার মূল কারণ হলো রাস্তায় ব্যাক্তিগত গাড়ির আধিক্য। রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা এখন আগের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যক্তিগত গাড়ির চাহিদা বাড়ছে প্রতিনিয়ত।  প্রতিদিন রাস্তায়নামছে নতুন নতুন ব্যক্তিগত গাড়ি । গাড়িক্রয়ের উপর উচ্চ কর ধার্য করেও ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয়কে নিরুৎসাহিত করা যাচ্ছে না। একই অবকাঠামোতে এই মাত্রাতিরিক্ত ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাই ট্রাফিক জ্যাম কে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলছে।

ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে থেমে থাকা যানবাহনের দিকে একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে থেমে থাকা গাড়ির ৯০ শতাংশই ব্যাক্তিগত পরিবহন অর্থাৎ প্রাইভেট কার, জীপ ও মাইক্রোবাস। পাবলিক পরিবহনের সংখ্যা হাতে গোনা। একটা সহজ হিসাব করা যাক। ১০০ জন যাত্রী পরিবহন করতে তিনটি পাবলিক বাসই যথেষ্ট। অথচ সমপরিমান যাত্রী পরিবহন করতে প্রাইভেট কার বা জীপ লাগবে ২৫ টি, মাইক্রোবাস অন্ততপক্ষে ১২। অর্থাৎ ব্যাক্তিগত গাড়ি দিয়ে খুব কম সংখ্যক যাত্রী পরিবহন হয়, কিন্তু দিনের গুরুত্বপুর্নসময়ে রাস্তার বেশিরভাগ অংশ দখল করে রাখেব্যাক্তিগত পরিবহনগুলো । ঢাকায় মোট জনসংখ্যার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ মানুষের ব্যাক্তিগত গাড়ি রয়েছে। অর্থাৎ, এই ৫ শতাংশ মানুষের জন্য ৯৫ শতাংশ মানুষকে প্রতিদিন ট্রাফিক জ্যামের যন্ত্রনায় ভুগতে হচ্ছে। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই নির্মম সত্য।

এবার আসা যাক সমাধানের বাপারে। যা হতে হবে বর্তমান অবকাঠামো, বর্তমান পরিস্থিতি ও সব শ্রেণির মানুষের কথা মাথায় রেখে এবং অতি অবশ্যই বাস্তবসম্মত। জায়গার অভাবে চাইলেও রাস্তাগুলোর প্রশস্থতা বাড়ানো কিংবা পর্যাপ্ত পার্কিং প্লেসের ব্যবস্থা করা সম্ভব না। সব রাস্তায় ফ্লাইওভার নির্মাণ সম্ভব নয়। মেট্রোরেলের সুবিধা পেতেও আমাদের অপেক্ষা করতে হবে বেশ কয়েক বছর। তাছাড়া এসব প্রকল্প অনেক ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় দ্রুত বাস্তবায় যোগ্য নয়। তাই ট্রাফিক জ্যামের তীব্রতা একটু সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর উপর নিয়ন্ত্রন আরোপ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই।

বিশ্বের অনেক ব্যস্ত শহরেই ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর উপর নিয়ন্ত্রন আরোপ করা হয়। একটা জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো জোড় ও বিজোড় নাম্বার প্লেটের গাড়ির জন্য আলাদা আলাদা দিন ঠিক করে দেয়া। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ব্যতীত সপ্তাহের তিনদিন শুধু জোড় নাম্বার প্লেটের গাড়ি চলে, বাকি তিনদিন চলে বিজোড় নম্বরের গাড়ি। ফলে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির পরিমান সবসময় মোট গাড়ির অর্ধেক থাকে। এতে করে স্বভাবতই ট্রাফিক জ্যামের পরিমান অনেক কমে আসে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে এটা খুব একটা কার্যকর হবে না। কারন আমাদের নিয়ম মানার অনীহা এবং অপ্রতুল ট্রাফিক পুলিশের কারনে মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতা। তাই আমাদের অন্যকোন উপায় খুঁজে নিতে হবে।

ঢাকা শহরে ট্রাফিক জ্যামের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি থাকে অফিস বা স্কুল কলেজ শুরুর পূর্বের দুইঘন্টাঅর্থাৎ সকাল ৮টা থেকে ১০টাএবং অফিস ছুটির পরবর্তী তিনঘন্টাঅর্থাৎ বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টা। এই পাঁচঘন্টার ট্রাফিক জ্যাম কমাতে পারলে পরিস্থিত অনেকটাই সহনীয় হয়ে যাবে। এটা করার একমাত্র কার্যকর ও বাস্তবসম্মত উপায় হলো এই সময়ে রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়িচালানোর উপর নিয়ন্ত্রন আরোপ।

সকাল ৭ টা থেকে ৯ টা পর্যন্ত ব্যাক্তিগত গাড়ির চলাচল সম্পূর্ন বন্ধ করে দিলে রাস্তায় মোট গাড়ির পরিমান শতকরা ৯০ শতাংশ কমে যাবে। এই সময়ে পাবলিক পরিবহন ব্যবহার করে ঢাকার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে খুব সহজে নিজস্ব গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারবে নগরবাসী। যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে তারা ৯ টায় যাত্রা শুরু করেও সাড়ে ৯ টার মাঝে ঢাকার যেকোন প্রান্তে পৌছে যেতে পারবে যদি জ্যাম কম থাকে। একইভাবে বিকাল ৫ টা থেকে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত ব্যক্তিগত পরিবহন বন্ধ থাকলে অফিস ফেরত অধিকাংশ মানুষ পাবলিক পরিবহন ব্যবহার করে অনেক নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারবে। সন্ধ্যা ৭ টা থেকে আবার রাস্তায় নামতে পারবে ব্যাক্তিগত গাড়ি। ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর উপর এই নিয়ন্ত্রন আরোপের পাশাপাশি অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সময়সূচী একটু সমন্বয় করে নিতে পারলে যানযটের প্রকোপ নিঃসন্দেহে অনেকাংশে কমে যাবে।

অনেকে বলতে পারেন যে ঢাকায় গণপরিবহনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম, যথেস্ট পরিমান গণপরিবন ছাড়া এই পদ্ধতি চালু করা যাবে না। বাস্তবতা হলো এখনো কিন্তু যাত্রীদের ৯০ শতাংশ এই অপ্রতুল গনপরিবহন দিয়েই চলাচল করে। তাছাড়া যে পরিমান পাবলিক বাস বর্তমানে রয়েছে তার সবগুলোও জ্যামের কারনে রাস্তায় নামতে পারে না। বেসরকারি পরিবহন মালিকরাও ট্রাফিক জ্যামের তীব্রতার কারনেই রাস্তায় নতুন পাবলিক বাস নামানোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখান না। ট্রাফিক জ্যামের তীব্রতা সহনীয় পর্যায়ে চলে আসলে বেসরকারী উদ্যোগেই রাস্তায় অনেক ভালো পাবলিক বাস সার্ভিস চালু হবে।

এই পদ্ধতি চালুকরলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীদের কিছুটা সমস্যা হবে। প্রথমদিকে মানিয়ে নিতে একটু সমস্যা হলেও সময়ের সাথে সাথে অভ্যস্ত হওয়া খুব একটা কঠিন হবে না। কিন্তু এর ফলে উপকৃত হবে সকলে। বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর স্বার্থের বিসর্জন তো দেয়াই যায়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো এই পদ্ধতি চালু করার জন্য আলাদা কোন খরচ নেই। চাইলে কাল থেকেই শুরু করা যায়। পরীক্ষামূলক ভাবে ব্যক্তিগত গাড়ির উপর নিয়ন্ত্রন আরোপের এই পদ্ধতি চালু করে দেখাই যাক না কি হয়। ট্রাফিক জ্যামের এখন যে অবস্থা তার থেকে খারাপ তো অন্তত হবে না!

কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখবেন কি??