ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বর্তমানে আমরা ইস্যুপ্রবণ জাতিতে পরিণত হয়েছি। প্রতিদিন নতুন নতুন ইস্যুতে আমরা অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের মতামত দিতে পছন্দ করি। টকশোবিদরা সান্ধ্য ও রাত্রিকালীন টকশোতে সেসব ইস্যু নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। নতুন ইস্যু না পেলে আমাদের ভালো লাগেনা। এভাবে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ইস্যু আসে, কালের গর্ভে সেগুলো হারিয়েও যায়। নতুন নতুন ইস্যু নিয়ে কথা বলা কোন সমস্যা না। সমস্যা হলো আমাদের গোল্ডফিশ মেমোরি রোগ। আমরা খুব দ্রুত পুরাতন ইস্যু ভুলে যাই, নতুন ইস্যু নিয়ে মেতে উঠি। আমরা সাধারণত কোন সমস্যার স্থায়ী সমাধান বা কোন অন্যায়ের স্থায়ী প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করিনা। ফলে কিছুদিনের মাঝে পুরাতন ইস্যু গুলো টিস্যু পেপারের রুপ ধারন করে।

অতি সম্প্রতি আমাদের আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে সানি লিওন। কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত এই বলিউড অভিনেত্রীর সম্ভাব্য বাংলাদেশ আগমন উপলক্ষ্যে সরগরম চারদিক। আর দশটা ইস্যুর মতো এটাও কিছুদিন আমাদের মুখরোচক আলোচনার উপলক্ষ্য হয়ে একসময় থিতিয়ে পড়তো। কিন্তু হেফাজতে ইসলাম তা হতে দিলো না। তারা সানি লিওনের আগমন প্রতিরোধে রীতিমতো যুদ্ধের ডাক দিয়ে বসেছেন। সানি লিওনের বাংলাদেশ আগমন প্রতিরোধ করতে তারা ইতোমধ্যে বিমানবন্দর ঘেরাওয়ের কর্মসূচী ঘোষণা করেছে যদিও এখন পর্যন্ত সানি লিওনের বাংলাদেশে ব্যাপারটি নিশ্চিত নয়।

হেফাজতে ইসলাম নামক কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এই সংগঠনটির বিভিন্ন ইস্যুতে এধরনের আন্দোলনের ডাক দেয়াটাই আজকের আলোচনার বিষয়। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি ভীত, সন্ত্রস্ত। এ নিয়ে বিস্তারিত ভাবার সময় হয়েছে। আর তা না হলে এই হেফাজতকে আশ্রয় করে এদেশে অনেক বড় কোন অঘটন ঘটবে। হেফাজতকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্য দেশবিরোধী অপশক্তি যে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে তা গত দুইবছরের বেশ কিছু ঘটনা পর্যবেক্ষন করলেই বুঝা যায়। অতএব এখনই এর লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ভবিষ্যতে অনেক বেশি মূল্য চুকাতে হবে বাংলাদেশকে।

সানি লিওন নীল ছবির নায়িকা ছিলেন। এরপর ভারতে এসে মূলধারার অভিনেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। ভারতে প্রায় ১৮ কোটি মুসলমান বসবাস করেন। সানি লিওনের বলিউডে অভিনয় করা বা ভারতে বাস করায় সেদেশের মুসলমানদের কোন সমস্যা হচ্ছে, ইসলাম ধর্মের কোন ক্ষতিও হচ্ছে না। কিন্তু বাংলাদেশের স্বঘোষিত ইসলাম হেফাজতকারী হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ সানি লিওনের বাংলাদেশ আগমনকে মোটেই মেনে নিতে পারছেন না। তাকে প্রতিরোধ করতে রীতিমতো যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছেন হেফাজতের নেতারা। অথচ সানির লিওন কে, তিনি কি করেছেন এসব তো হেফাজতে ইসলামের জানার কথা না।

সানি লিওনের কৃতকর্মের ব্যাপারে যদি হেফাজত ওয়াকিবহাল হয় তাহলে কিম কার্দেশিয়ানের নাম ও কর্মের ব্যাপারেও হেফাজতের সম্যক ধারনা থাকার কথা। অথচ হলিউডের এই অভিনেত্রীকে একরাত পাবার জন্য কিছুদিন আগে ১ মিলিয়ন ডলার অফার করেছেন এক সৌদি যুবরাজ। এতে করে সৌদি আরবের ইসলামের কোন ক্ষতি হয়নি। সারাবিশ্বের মতো আমাদের দেশেও অনেক পতিতালয় আছে, শারীরিক চাহিদা মেটাতে এসব স্থানে নিত্য হাজিরাও দেয় হাজারো মানুষ। এসব পতিতালয়ের কারনে এদেশের ইসলাম ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি, ভবিষ্যতেও হবেও না। তাহলে একজন সানি লিওন কিভাবে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর ইসলামী মূল্যবোধে আঘাত দেয়ার ক্ষমতা রাখে? এর সদুত্তর হেফাজতে ইসলামের নীতি নির্ধারকরা কখনোই দিতে পারবেন না।

পবিত্র হাদীস শরীফে আছে, ‘সর্বোত্তম জিহাদ হলো আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে নিজের অন্তরের সাথে জিহাদ করা।’ অর্থাৎ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে চারপাশে ভুলপথে যাবার বা ভুল করার মতো নানা উপকরণের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও তা থেকে নিজেকে বিরত রেখে ইসলামের বিধান মেনে চলাই একজন মুসলমানের বড় দায়িত্ব, এটাই আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়। ইসলাম শান্তির ধর্ম। মহানবী (সঃ) সম্পূর্ন প্রতিকূল পরিস্থিতে থেকেই আরবে ইসলাম কায়েম করেছিলেন, সাম্যতা ও ন্যায় ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছিলেন। সেই শিক্ষার কতটুকু হেফাজতের নেতারা মন এবং মননে ধারণ করেন?

হেফাজতে ইসলাম সর্বক্ষেত্রে ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে। তাদের বক্তব্য অনুসারে তারা ইসলাম রক্ষার জন্য সংগ্রাম করেন। অথচ তাদের আত্মপ্রকাশের আগেও এদেশে ইসলাম ছিলো, তারা না থাকলেও থাকবে। ইসলাম ধর্মকে হেফাজত করার জন্য কোন সুনির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের এই ব্যবহার শুরু করেছে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলাম। একাধিকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে জামায়াতের দোসর বিএনপি ব্যাপারটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছে। রাজনৈতিক ভাবে এ দুটি দলই যখন দেউলিয়া হয়ে যাবার পর্যায়ে আছে সে মুহুর্তে ইসলাম হেফাজতের নামে হেফাজতি ইসলামের আত্মপ্রকাশ চিন্তার উদ্রেক করে বৈকি।

কিছু সাম্প্রতিক অতীত ঘটনার দিকে আলোকপাত করি। ২০১৩ সালের ৫ই মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মধ্যযুগীয় ১৩ দফার বাস্তবায়ের দাবিতে ঢাকা ঘেরাও কর্মসুচীতে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিলো। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে এধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরল একটি ঘটনা। আলু পোড়া খাবার লোভে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার দলের নেতাকর্মীদের উদাত্ত আহবান জানিয়েছিলো হেফাজতের পাশে থাকার জন্য। আর জামায়াতের কর্মীরা তো সর্বাগ্রেই ছিলো এই কর্মসূচীর, সন্দেহ নেই যে মূল ধ্বংসযজ্ঞ তারা করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সময়োপযোগী ও কার্যকর সিদ্ধান্তে এক অবশ্যম্ভাবী বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছিলো বাংলাদেশ, তখনকার মতো ঘরে ফিরেছিলো হেফাজত।

কিন্তু হেফাজতের এই ঘরে ফেরা, শেষ ঘরে ফেরা ছিলো না। অদৃশ্য শক্তির ইশারাতে আবারো নানান ইস্যুতে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে হেফাজতে ইসলাম। যার বলি হতে হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা লতিফ সিদ্দিকীকে। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে হজ্ব নিয়ে মন্তব্য করার জের ধরে তার বিরুদ্ধে মাঠে নামে হেফাজত। ফলশ্রুতিতে পদ পদবী সব হারিয়ে চৌদ্দ শিকের ভিতর ঢুকতে হয় লতিফ সিদ্দিকীকে। কিছুদিন আগে প্রথিতযশা সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরীর বিরুদ্ধেও আন্দোলনে নামে হেফাজত। সর্বশেষ তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু সানি লিওন। অবস্থা এমন যে কে এই দেশে থাকতে পারবে, কে আসতে পারবে, কে আসতে পারবে এসবের নিয়ন্ত্রনকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তারা। ভবিষ্যতের জন্য যা এক অশনী সংকেত।

মূদ্রার অপর পিঠটাও এবার দেখতে হবে। হেফাজতের বিরুদ্ধে বিষেদাগার করা এই লিখার আলোচ্য বিষয় না। হেফাজতে ইসলামের নামে মূলত কতিপয় ব্যক্তিবর্গই তাদের মতামত বা কর্মসূচী প্রকাশ করে। কিন্তু কিসের জোরে তারা দেশের প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে এভাবে কর্মসূচী ঘোষণা করতে পারে? সময় এসেছে এদের নিজেদের শক্তির উৎসের দিকে খেয়াল করার। তাদের মূল শক্তির জায়গা হলো কওমি মাদ্রাসার আপাত নিরীহ ছাত্ররা। দেশে আনুমানিক ৪৫ হাজার কওমি মাদ্রাসায় প্রায় ১০ লক্ষাধিক ছাত্র পড়াশোনা করে। এই ছাত্ররাই হলো হেফাজতে ইসলামের মূল চালিকা শক্তি বা পাওয়ার হাউজ। যেকোন সময় এদের রাজপথে নামাতে পারে হেফাজতে ইসলাম, ৫ই মের শাপলা চত্বরের সমাবেশই তার প্রমাণ।

কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের প্রায় পুরো অংশটাই দেশের দরিদ্রতম শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে। কওমি মাদ্রাসায় এসে এরা খেয়ে পড়ে বাঁচার সুযোগ পায়। নির্মম বাস্তবতা হলেও এটাই সত্য। এদের শিক্ষা কারিকুলামে যুগোপযগী কিছু নেই। এরা আধুনিক সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এদের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আলো নেই। এদের বর্তমানটাও সুখকর না। আগের প্যারায় এদের আপাত নিরীহ বলার কারন হলো দেশ কিংবা সমাজের ব্যাপারে এদের জানার সুযোগ নেই। এরা নিজেদের বিচারবুদ্ধির প্রয়োগ করতে শিখে না। তাই তাদের মোটিভেট করা সহজ। বড় হুজুরের কথার বাইরে যাবার সুযোগ এদের নেই। এদের কাছে তাদের মাদ্রাসার হুজুরদের কথাই শিরোধার্য। তাই তারা বারবার তাদের বড় হুজুর তথা হেফাজতি ইসলামের নেতাদের ডাকে রাজপথে নামে। কি দাবি আদায়ে নামে, কেন নামে এটাই তারা জানে না। এরা সানি লিওন চিনে না, এদের কাছে ব্লগার মানে নাস্তিক, এদের ধারনা ব্লগ দিয়ে ইন্টারনেট চালায়। অতএব এদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।

সমাজের অবহেলিত এই অংশের দিকে এবার সরকারের নজর দেবার সময় এসেছে। কওমি মাদ্রাসা গুলোর ব্যাপারে সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মাথা ব্যাথার কারণে মাথা কেটে ফেলে দেয়া কোন সমাধান না। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কারিকুলাম, ছাত্রদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধার দিকে নজর দেবার সময় হয়েছে। কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের দেশ ও সমাজ সম্পর্কে সম্যক ধারনা দেবার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা নিজেদের বিচার বুদ্ধির প্রয়োগ করতে শিখে। তাহলে তারা সহজে অন্যের ক্রীড়ানকে পরিণত হবে না। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের মতো কওমি মাদ্রাসা গুলোতে প্রয়োজনীয় নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে যেন সেগুলো মৌলবাদ বা জঙ্গীবাদের আখড়ায় পরিণত না হয়। সর্বোপরি হেফাজতে ইসলামের ব্যাপারে সরকারের কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়া এখন সময়ের দাবি।

এই ব্যাপারে সরকারের আশু ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় এরা ধীরে ধীরে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়ে দেশের প্রচলিত আইন আদালত, নিয়মকানুন কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ধর্মের নাম ব্যবহার করে নিত্য নতুন ফতোয়া দিবে। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভুতিকে কাজে লাগিয়ে দেশে অস্থিতিশীল অবস্থার তৈরি করবে। ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। আমিও ভয় পাচ্ছি। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা নিত্য দেখি সেই স্বপ্নকে তো কোনভাবেই ধূলিস্যাৎ হতে দেয়া যায় না।