ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

জাফর ইকবার স্যার তার ‘দুষ্ট ছেলের দল’ শীর্ষক কিশোর উপন্যাসে একজন শিক্ষকের জবানীতে বলেছিলেন, ‘একজন বিখ্যাত মানুষ দিয়ে কী হয়? কিছুই হয় না। কিন্তু একশোজন খাঁটি মানুষ দিয়ে একটি দেশ পালটে যায়।’ প্রথমবার পড়ার পর থেকেই এই লাইনদুটো আমার মাথায় ঢুকে যায়। আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে এই উক্তিটি, খাঁটি মানুষ হবার তাগিদ দেয় মনের ভিতর থেকে। আমার মতো তরুণ প্রজন্মের আরো লাখো প্রতিনিধি জাফর ইকবাল স্যারের লিখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও জীবনবোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার পিছনে জাফর ইকবাল স্যারের অবদান অনস্বীকার্য। ব্যক্তিসত্ত্বার উর্ধ্বে উঠে জাফর স্যার নিজেই একটি আদর্শিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছেন। জাফর স্যারের নূন্যতম অপমানও তাই অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়, প্রতিবাদী করে। জাফর স্যারের একাকি বৃষ্টিতে ভেজার ছবি দেখে তাই চোখ দু’টো নিজে থেকেই ভিজে আসে। চরম আশাবাদী জাফর স্যারের হতাশাজনক যেকোন কথা অন্তরে শেলের মতো বিদ্ধ হয়।

আর দশজনের মত এতোটুকু বলে লিখা শেষ করতে পারলে ভাল লাগতো। কিন্তু ঘটনার পিছনেও ঘটনা থাকে এবং আপনি যখন সেই পিছনের ঘটনা সম্পর্কে জানবেন তখন সমগ্র ব্যাপারটা এতো সরল মনে হবে না। কথায় বলে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। একই কথা সম্মানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আপনি যখন সমাজের একটি বৃহৎ অংশের কাছে সম্মানীয় হবেন তখন সেই সম্মান ধরে রাখার জন্য আপনার প্রতিটা সিদ্ধান্ত অনেক বেশি সুচিন্তনীয় হতে হবে। ব্যাক্তিগত চাওয়া পাওয়ার উর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ তখন আপনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, অনেকের জন্য অনুকরনীয় আদর্শ। হতাশাটা তখনই গ্রাস করে যখন দেখি আমাদের পুজনীয় ব্যাক্তিবর্গ অপ্রয়োজনীয়ভাবে আপাত বিতর্কিত কোনকিছুর সাথে জড়ান। আমরা নিজেরা তখন বিভ্রান্ত হই, তাদের অতীত আর বর্তমানকে মেলাতে পারিনা।

প্রথম প্যারায় বলেছিলাম, জাফর স্যার আমাদের খাঁটি মানুষ হবার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাঁর লেখনী দিয়ে সেই খাঁটি মানুষ হবার কর্মযজ্ঞে লিপ্ত থাকার জন্য প্রতিনিয়ত উদ্বুদ্ধ করে গিয়েছেন। আর খাঁটি মানুষ গড়ার মূল কারিগর হচ্ছেন শিক্ষক সমাজ। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ । কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থাতেই একজন ব্যাক্তির স্বকীয় ব্যাক্তিসত্ত্বা তৈরি হয়, মন ও মননের পরিপূর্ন বিকাশ ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেউ শুধুমাত্র একটা ডিগ্রী অর্জন করে না বরং পরবর্তী জীবন যুদ্ধে জয়ী হবার প্রয়োজনীয় সকল রসদ জোগাড় করে। আর এই রসদ সরবরাহকারী হচ্ছেন আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ। অথচ অবাক হয়ে লক্ষ করতে হচ্ছে , আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিয়ত তাঁদের সেই শ্রদ্ধার অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছেন। স্বীয়স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শ্রেণীকক্ষ ছেড়ে আন্দোলন সংগ্রাম করছেন। খাঁটি মানুষ গড়ার কারিগররা যদি নিজেরা খাঁটি না থাকতে পারেন তাহলে আমরা খাঁটি মানুষ হবো কিভাবে?

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক পরিষদ’ এর ব্যানারে বিগত প্রায় পাঁচমাস ধরে উপাচার্য ডঃ আমিনুল হক ভূঁইয়ার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছেন। উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি কারও সাথে কোন কিছু পরামর্শ না করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এছাড়া নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও আনা হয়ে হয়েছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে। আন্দোলনের শুরু হয় গত এপ্রিল মাসে। এরপর থেকে শিক্ষকদের একটি একটি অংশ কর্মবিরতি, ক্লাস বর্জন, প্রশাসনিক কাজ থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি নানা কর্মসূচী পালন করেন। উপাচার্যকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধও করেও রাখা হয়। এই পরিস্থিতিতে গত ১লা মে দুইমাসের ছুটিতে যান উপাচার্য। এরমাঝে শিক্ষামন্ত্রী সমস্যা সমাধানের জন্য মহোদয় আন্দোলনরত শিক্ষকদের সাথে আলোচনাও করেন। ছুটি কাটিয়ে ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে পুনরায় শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে পড়েন উপাচার্য। শিক্ষকদের সাথে যোগ দেয় ছাত্রদের একটি অংশ। এই আন্দোলনের একটি পর্যায়ে গতকাল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। উপাচার্যের পক্ষ নিয়ে ছাত্রদের একটি অংশের হাতে লাঞ্ছিত হয় আন্দোলনকারীরা কয়েকজন শিক্ষক, যারা মাঝে জাফর ইকবাল স্যারে স্ত্রী ডঃ ইয়াসমীন হকও রয়েছেন।

জাফর ইকবাল স্যার নিজেই বলেছেন, আমি শিক্ষকদের আন্দোলনে সাথে সরাসরি জড়িত না থাকলেও এই আন্দোলনে আমার শতভাগ সমর্থন রয়েছে। আন্দোলনের নেতৃত্বও দিচ্ছেন উনার স্ত্রী ডঃ ইয়াসমিন হক। এই আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে চললেও গতকাল থেকে একটা আবারো লাইমলাইটে আসার মূল কারণ ছাত্রলীগের সংপৃক্ততা। সেই চিরায়ত বলির পাঁঠা ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা ভিসির উস্কানীতে আন্দোলনরত শিক্ষকদের উপর হামলা করেছেন-এমনটিই দাবি করেছেন ডঃ ইয়াসমিন হক। মিডিয়ায় প্রচারিত ভিডিও থেকে ব্যানার টানাটানি করা ছাত্রদের জয় বাংলা শ্লোগান দিতে দেখা গিয়েছে। অতএব জেনারালাইজড করে পুরো ঘটনার দায় ছাত্রলীগের উপর চাপিয়ে দেয়া খুবই সহজ এবং এই একটি কারণে শাবিপ্রবির শিক্ষক আন্দোলন আবারো টক অব দ্য কান্ট্রি।

প্রত্যেক মানুষের মূলত দুটি পরিচয় থাকে। একটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়, অন্যটি হলো ব্যাক্তিপরিচয়। একজন মানুষের সমগ্র কাজের দায়ভার প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের উপার কখনোই বর্তায় না। সরকারি চাকুরীজীবীদের কেউ অন্যায় করলে সমগ্র সরকারি চাকুরীজীবীদের দোষারোপ করা যায় না। একজন পরিমলকে দিয়ে যেমন সমগ্র শিক্ষকসমাজকে বিচার করা যায় না তেমনি একজন অপরাধী ছাত্রকে দিয়েও সমগ্র ছাত্রদের বা ছাত্রলীগের কোন কর্মী, সমর্থক বা নেতার অন্যায়ের জন্য সমগ্র ছাত্রলীগকে দোষারোপ করা যায় না। অন্যান্য ক্ষেত্রে সবার ব্যাক্তি পরিচয় দেখা হলেও শুধুমাত্র ছাত্রলীগের ক্ষেত্রে ব্যাক্তির কাজের জন্য সমগ্র ছাত্রলীগকে দোষারোপ করা এদেশের কালচারে পরিণত হয়েছে। ঐ যে বললাম, চিরায়ত বলির পাঁঠা ছাত্রলীগ।

ফিরে আসি শাবিপ্রবির ঘটনায়। আগেই উল্লেখ করেছি, আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সাথে ছাত্রদের একটি অংশ একাত্মতা ঘোষণা করে উনাদের কর্মসূচীতে যোগ দিয়েছিলো। মিডিয়ায় প্রকাশিত ছবি দেখে বুঝা যায় এদের সংখ্যা মোট ছাত্রসংখ্যার তুলনায় খুবই নগণ্য। এটা মোটেই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহন নয় বরং শিক্ষকদের প্ররোচনাতেই তারা এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। শিক্ষকদের দাবি দাওয়ার কোনটাই একাডেমিক নয়, সবই প্রশাসনিক এবং এতে লাভের ভাগিদার শুধু শিক্ষকরাই হবেন। তাই ছাত্রদের এই আন্দোলনে যোগ দেয়ার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। তাছাড়া স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলনের জোয়ার কত তীব্র হয় তার অসংখ্য নজির আমাদের এই বাংলাদেশেই আছে। আন্দোলনকারীরা শিক্ষকরা যখন তাঁদের আন্দোলনের জন্য ছাত্রদের ব্যবহার করলেন, তখন উপাচার্যও এই পথই অনুসরন করলেন। উনিও তাঁর অনুসারী ছাত্রদের উনার পক্ষে মাঠে নামালেন। যে কাজ আন্দোলনকারী শিক্ষকরা করছেন সেই একই কাজ ভিসিও করলেন। দোষ দুইপক্ষেরই আছে। শুধু ভিসিকে দোষ দিলে তো হবে না, এক যাত্রায় দুই নিয়ম চলতে পারেনা। নিজেদের স্বার্থে ছাত্রদের ব্যবহার করার এমন নজির শিক্ষকরা সাম্প্রতিক অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও তৈরি করেছেন।

এবার ছাত্রলীগের ভূমিকার ব্যাপারে আসা যাক। শাবিপ্রবির আন্দোলনকারী শিক্ষকদের উপর হামলা করলো ছাত্রলীগ- এমন শিরোনামে মিডিয়া সয়লাব। ছাত্রলীগ কি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিসির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলো নাকি যারা ভিসির অনুসারী তারা নিজেদের ছাত্রলীগ দাবি করছে? দুটি প্রশ্নের উত্তরই না। শাবিপ্রবিতে ছাত্রলীগের কমিটি রয়েছে। তারা স্পষ্টতই বলেছে যারা ভিসির পক্ষ নিয়ে মাঠে নেমেছে তার নিজ দায়িত্বে গিয়েছে। একজন ছাত্রলীগ কর্মীর যাবতীয় কাজের দায়ভার তো ছাত্রলীগ নিতে পারেনা। কেউ ব্যাক্তি উদ্যোগে যদি কোন আন্দোলনে যায় তার দায়ভার একান্তই তার, সংগঠনের নয়। সেটা যখনই সংগঠনের স্বার্থের পরিপন্থী হবে বা শৃংখলাবিরোধী হবে তখন সংগঠন থেকে তার বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এটাই যথাযথ প্রক্রিয়া। কথা উঠেছে যে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে ঘটনাস্থল থেকে বিশ হাত দূরে দেখা গিয়েছে অথচ তারা কোন ভূমিকা নেয়নি। হাস্যকর কথা। ছাত্রলীগের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক গতকাল সকালে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সাথে দেখা করে বলে এসেছে যে এই আন্দোলনের ব্যাপারে ছাত্রলীগের কোন বক্তব্য নেই, এবং কোন পক্ষেই তাদের অংশগ্রহন নেই। তাহলে কেন এই আন্দোলন বিষয়ক কোন কিছুতে তারা ভূমিকা নিবে? বাকি থাকে জয় বাংলা শ্লোগান। হ্যাঁ, এই ব্যাপারে ছাত্রলীগের আরো উদ্যোগী হতে হবে। চোখ কান খোলা রাখতে হবে যেন সংগঠনের নাম ভাঙ্গিয়ে কেউ কোন অন্যায় না করে। আর এই ঘটনায় ব্যাক্তি উদ্যোগে যারা ভিসির পক্ষ নিয়েছে বা শিক্ষক লাঞ্ছনা করেছে তাদের মাঝে ছাত্রলীগের যারা জড়িত আছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে ইতোমধ্যেই এমন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

গতকাল শ্রদ্ধেয় ইয়াসমিন ম্যামকে দেখলাম মিডিয়াতে বলছেন, ‘আমরা সকাল থেকে অফিস অবরুদ্ধ করে রেখেছি। আমরা ভিসিকে একাডেমিক কাউন্সিলে বসতে দিব না। উনি জোর করে অফিসে ঢুকেছেন ছাত্রলীগের ছেলেদের নিয়ে।’ ঠিক এই পর্যায়ে এসে ব্যক্তি ইয়াসমিন হক কিংবা ব্যাক্তি জাফর ইকবাল স্যার তাঁদের পর্বতসম মর্যাদার স্থান থেকে নেমে আর দশজন আন্দোলনকারী শিক্ষকের মতোই হয়ে যান। একজন শিক্ষক হয়ে উনি কিভাবে বলেন, উপাচার্যকে অফিসে ঢুকতে দিবেন না? উপাচার্য নিয়োগ দেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। একটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এমন প্রকাশ্যে বিরুদ্ধচারণ করা একজন শিক্ষকের মুখে কিভাবে শোভা পায়? আন্দোলনকারী শিক্ষকরা তাঁদের সংগঠনের নাম দিয়েছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক পরিষদ। অথচ উনাদের দাবি দাওয়া সবই ব্যাক্তিস্বার্থ কেন্দ্রিক। তাহলে এর মাঝে কেন মুক্তিযুদ্ধকে টেনে আনা? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এমন অনেক শিক্ষকই আছেন যারা এই আন্দোলনের যোগ দেননি। তাহলে এই ব্যানার ব্যবহার করে তাঁরা কি বুঝাতে চাচ্ছেন? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়নের যেকোন আন্দোলনে বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত ছাত্র অংশগ্রহন হয়। অথচ এক্ষেত্রে নিজেদের ব্যাক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তারা মুক্তিযুদ্ধ নামটা ব্যবহার করছেন, ব্যবহার করছেন কতিপয় ছাত্রদের। এটাও কি অন্যায় নয়?

একটু পুরাতন কাসুন্দি ঘাটতে চাই। সরাসরি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই কিছু কথা বলবো। বুয়েট শিক্ষক সমিতির ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলনের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। কি ছিলো সেই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট? ২০১১ সালে শিক্ষকদের বয়স বৃদ্ধির দাবিতে প্রথম আন্দোলনে নামে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। কর্মবিরতি ও অন্যান্য কিছু কর্মসূচী পালন করে। অথচ সমগ্র বিষয়টিই ছিলো সরকারী সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এক্ষেত্রে বুয়েট কর্তৃপক্ষের কিছু করার ছিল না। এরপর আস্তে আস্তে তাদের দাবি বাড়তে থাকে। উপাচার্যের বিরুদ্ধে দূর্নীতি, নিয়োগের ক্ষেত্রে জ্যাষ্ঠতা লঙ্ঘন, প্রশাসনে দলীয়করণ ইত্যাদি ১৬ টি অভিযোগ এনে উপাচার্য ও উপ উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলন করতে থাকে বুয়েটের শিক্ষক সমিতি। স্ককালরশীপ, পরীক্ষায় ভালো নাম্বার দেয়া ইত্যাদি নানা প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের এই আন্দোলনে জড়ানো হয়। হুজুগে মেতে অংশ নেয় অনেক ছাত্র ছাত্রী। এই আন্দোলনের রুপ কতটা নোংরা ছিল তা বলে বুঝানোর মত নয়। শিক্ষকরা উপ উপাচার্যকে তাঁর রুমে অবরুদ্ধ করে রাখে, তাঁকে অশালীন ভাষায় আক্রমন করেন। উপাচার্যের রুম ভেঙ্গে তাঁর চেয়ারে জুতা রেখে দেয়া হয়। তাঁর ছবি নামিয়ে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে মাড়ানো হয়। এই কাজগুলো শিক্ষকরাই করেছেন। কোথায় ছিলো তখন শিক্ষকের মর্যাদা? এসব ঘটনা নিজের চোখে দেখা। চোখে না দেখলে হয়তো নিজেও বিশ্বাস করতাম না যে স্বার্থের মোহে অন্ধ হয় শিক্ষকরা কত নিচে নামতে পারেন। ছাত্রদের রক্তে ক্লাসরুমের মেঝে রাঙিয়ে আন্দোলনকারীরা রক্ত শপথ নেন যেন কোন অবস্থাতেই তৎকালীন উপাচার্যের অধীনে তারা ক্লাসে ফিরে যাবেন না। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাধ্য হয়ে উপ উপাচার্যকে অপসারণ করে। শিক্ষকরাও তাঁদের রক্তশপথ ভুলে হালুয়া রুটির ভাগ বুঝে নিয়ে ক্লাসে ফিরে যান।

আচ্ছা, কেউ কি এর পরে বুয়েটে কি হয়েছে সে ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন? উপ উপাচার্যকে সরিয়ে দেয়ার পর আন্দোলনের সমাপ্তি টানেন শিক্ষকরা। এটা দৃশ্যমান ফলাফল। পর্দার অন্তরালে হয়েছে জঘন্যতম নোংরামি। জ্যাষ্ঠতা লঙ্ঘনের প্রতিবাদে আন্দোলন করলেও জ্যাষ্ঠতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের পদ বাগিয়ে নেন জ্যাষ্ঠতায় অনেক পিছিয়ে থাকা এক বিপ্লবী আন্দোলনকারী শিক্ষক। এখনো তিনি সে পদে বহাল আছেন। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, ছাত্র কল্যাণ পরিচালক সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদেও বসেন আন্দোলনকারী শিক্ষক নেতারা। বাকি যারা প্রশাসনিক পদ পাননি, তাঁরা বড় বড় প্রজেক্টে কনসাল্টেন্সির সুযোগ পান। উপাচার্য ডঃ এ এস এম নজরুল হক নূন্যতম ক্ষমতা ছাড়া তাঁর বাকি মেয়াদ পার করেন। তাঁকে কোন একাডেমিক কাউন্সিল বা সিন্ডিকেটের সভায় বসতে দেন নি শিক্ষকরা। যে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ শিক্ষকরা করেছিলেন নিজেরা দায়িত্বপূর্ন পদে বসেও সেসবের ব্যাপারে তাঁদের টু শব্দ উচ্চারণ করতে দেখা যায়নি। ভোজবাজির মতো সব যেন ঠিক হয়ে গেল! আর ইমোশনাল ব্লেকমেল করে যে ছাত্রদের আন্দোলনে নামানো হয়েছিলো তারা পেল লবডঙ্কা। তাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেল গুরুত্বপূর্ন সময়, টিস্যু পেপারের মত তাদের ব্যবহার করে ছুড়ে ফেলে দেয়া হলো।

একইভাবে শিক্ষকরা আন্দোলন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজনীতির নোংরাতম রূপ তাঁরা দেখিয়ে চলেছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁদের সকল আন্দোলনের লক্ষ্য কেবল এবং কেবল মাত্র ‘মসনদে’ যাওয়া বা ‘মসনদের’ উপর নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করা। ভিসিদের অবস্থা এখন এমন হয়েছে যে তাদেরকে হয় শিক্ষকদের হাতের পুতুল হয়ে থাকতে হবে না হয় চেয়ার ছেড়ে পালাতে হবে।প্রতিটি ক্ষেত্রেই শিক্ষকরা নিজেদের খেয়াল খুশী মতো ছাত্রদের ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ছাত্রদের দাবি দাওয়া, সুবিধা অসুবিধা ইত্যাদি নিয়ে কখনোই শিক্ষকদের উচ্চকিত হতে দেখা যায় না। অথচ তাঁদের আন্দোলনের নির্মম বলি হয় ছাত্ররাই। এখন পর্যন্ত একজন শিক্ষককেও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট বসানোর বিরুদ্ধে একটি কথা বলতে দেখলাম না অথচ নিজেদের ব্যাংক ব্যালান্স বাড়ানোর জন্য তো ঠিকই তারা নিয়মিত হাজিরা দেন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

আজ শিক্ষক লাঞ্চিত হয়েছে বলে সবাই গেল গেল রব তুলেছেন, কিন্তু পিছনের কাহিনী কি ভেবে দেখেছেন? কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে? কিভাবে ছাত্ররা এই দুঃসাহস পাচ্ছে? উত্তর হলো, এই দুঃসাহস শিক্ষকরাই দিচ্ছেন। একজন শিক্ষক যখন প্রকাশ্যে অন্য শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন, তাঁকে অপমান অপদস্থ করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অন্য ছাত্রদের লেলিয়ে দেন তখনই আসলে শিক্ষকের মর্যাদা নামক কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়ে যায়। আপনাদের কাছ থেকেই ছাত্ররা এসব শিখেছে। আপনারা নিজেদের সমস্যা যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে ছাত্রদের শিক্ষাজীবনকে পুঁজি করে ক্লাসরুম ছেড়ে যখন আন্দোলনের পথে নেমে আসেন তখনই আসলে নিজেদের অপদস্থ হবার পথ সুগম করে ফেলেন। যখন আপনাদের উচিৎ ছিলো ছাত্রদের থিসিস, পেপার, নিত্য নতুন গবেষণা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকা তখন আপনারা উপাচার্য কে হবে তা নিয়ে মেতে থাকেন। পেস্কেলে মর্যাদা বৃদ্ধির ব্যাপারে আপনাদের যত আগ্রহ তাঁর কিয়দাংশও যদি একাডেমিক বিষয়ে থাকতো তাহলে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বছরে ডজন ডজন ডক্টরেট বের হতো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটিবার ভেবে দেখুন তো একজন শিক্ষক হিসেবে অর্পিত দায়িত্বের কতটুকু আপনারা পালন করছেন? আপনাদের বিবেক ভুল উত্তর দিবে না।

শিরোনামে ফিরে যাই। জাফর ইকবাল স্যারের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, তবে এই জাফর ইকবাল স্যার ব্যক্তি জাফর ইকবাল যিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে আমাদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। যিনি মৌলবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। যিনি দেশের ভালো ভালো বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু যে জাফর ইকবাল স্যার আর দশজন স্বার্থন্বেষী শিক্ষকের মতো ক্লাস বর্জন করে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করেন সেই জাফর ইকবাল স্যারকে আমি চিনি না। চিনতেও চাই না। এমন আন্দোলন তো বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য শিক্ষক করছেন, কতজনকে চিনবো?

সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ, আপনাদের কাছ থেকে নৈতিকতা শেখা এখন অনেক দুরস্থ বিষয়। দয়া করে ছাত্রদের শিক্ষাজীবনকে পুঁজি করে আন্দোলনে নামার ঐতিহ্য থেকে বের হয়ে আসুন। আপনারা যদি ‘মসনদ’ দখলের হীন উদ্দেশ্যে একজন শিক্ষকের (ভিসিও একজন শিক্ষক) অফিস কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দিতে পারেন, তাকে অপমান করতে পারেন, তার কুশপুত্তলিকা দাহ করতে পারেন – তাহলে ন্যায্য দাবী আদায়ের জন্য শিক্ষার্থীরা কি এর চেয়ে বেশী কিছু করার অধিকার রাখে না? আপনাদের প্রদর্শিত পথে যদি দেশের লাখো লাখো শিক্ষার্থী আপনাদের মত করেই ন্যায়-নীতি (?) প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করে তাতে কি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চলবে? প্রশ্ন রেখে গেলাম আপনাদের কাছে। একটি কথা মনে রাখবেন, নগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও কিন্তু রক্ষা পায় না!