ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আমি একটা বিষয় নিয়ে খুব ভুল ভাবে এগিয়ে ছিলাম। খুব রেগে গিয়েছিলাম। রেগে গেলে মানুষ হেরে যায়। হারতে হারতে আমার মনে হলো, এই যে আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে মানুষকে দুটো কটু কথা শুনিয়ে দিলাম, আমার রাগ বেরিয়ে যাবার একটা পথ পেল। কিন্তু এই আমি শাহাবাগে দাঁড়িয়ে কতশত মানুষকে নিজের চোখে দেশের জন্য কাঁদতে দেখেছি। প্রকাশ্যে, গোপনে, পরস্পকে জড়িয়ে ধরে যেন তাঁরা তাঁদের মায়ের জন্য কাঁদছেন। দেখতে দেখতে আমার নিজের চোখও ভিজেছে। সেটা কেউ আড়াল করার চেষ্টা করেন নি, বড় পবিত্র অশ্রু। তাকে আমি এক বাক্যে অস্বীকার করি কিভাবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে এখন যার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়, তার ভেতরে আমি আমার বাংলাদেশকে আর খুঁজে পাই না।

কিন্তু তাতে তো আর প্রকৃত চেতনা মিথ্যে হয়ে যায় না। আমি এখন আপনাদের একটা গল্প বলবো। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা এক অসীম সাহসী রাখাইন নারীর গল্প। এই গল্প আমাকে শাহাবাগে দাঁড়ানোর দিনগুলোর মতো অনুপ্রেরণা দেয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আমি পলিটিসাইজ করা পথে নয়, এমন সব ঘটনার ভেতরেই খুঁজি। বিশ্বাস করি, এর ভেতরেই আমার বাংলাদেশ রয়েছে।

……………………….

এপ্রিল, ১৯৭১। আটজনের একটা সুইসাইড স্কোয়াড গত তিনদিন ধরে এমভি শাহারুনেচ্ছায় বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত টহল দিচ্ছে। পাকা খবর আছে, পাকিস্তানীদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ভর্তি একটা জাহাজ এই পথে বরিশাল আসবে। দলটার উপর দায়িত্ব পড়েছে সেই জাহাজটা উড়িয়ে দেবার। কিন্তু তিনদিন ঘুরেও সেই জাহাজের টিকি দেখা যায়নি।

আটজনের দলটিতে যারা আছে, তাদের প্রত্যেকেরই বয়স ১৮ থেকে ২২। কারোরই প্রত্যক্ষ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেই। সুইসাইড মিশনে অংশ নেয়ার প্রথম দিকে খুব উত্তেজনা কাজ করলেও, গত তিনদিনে উপকূল জুড়ে ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছাসের রেখে যাওয়া আঘাত দেখতে দেখতে চোখ ক্লান্ত হয়ে গেছে। জানা গেছে কুয়াকাটার কাছেই একটি আশ্রয় ক্যাম্প রয়েছে- যেখানে ঝড়ে আহতদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে। বিদেশী চিকিৎসকরা আহতদের চিকিৎসা করছেন। সীদ্ধান্ত হলো, দলটি ঐ ক্যাম্প ঘুরে দেখবে এবং দুপুরের খাবার খাবে।

ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবেশ করতেই চারিদিকে বেশ সাড়া পড়ে গেল। এখানকার অধিকাংশ মানুষই এর আগে সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা দেখেনি। তারা ভীড় জমাতে শুরু করলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন ছাত্র আছে, তারা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্ত্র হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়েও দেখলো। ক্যাম্পটি পরিচালিত হচ্ছে এক জাপানী দম্পতির তত্ত্বাবধানে। তাঁরা যুদ্ধের প্রতি তাঁদের পূর্ণ সমর্থনের কথা জানালেন। দলটি বিশ্রাম নিচ্ছে এমন সময় দেখা গেল অসম্ভব রূপবতী এক আদবাসী তরুণী খুব দক্ষতার ডাব কেটে দলটির এক এক জন সদস্যদের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। দা চালানোর ব্যাপারে তার অনায়াস ভঙ্গি মুগ্ধ করার মতো।

সুইসাইড স্কোয়াডের আটজনের একজনের নাম সাঈদ। সাংস্কৃতিক কর্মী। যুদ্ধের আগে সে গান লিখে আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছে। মেয়েটিকে দেখার পর থেকে তার বুকের ভেতরে এক ধরনের ধড়ফড় শুরু হয়েছে। সে পুরোটা সময় জুড়েই একটু দূরত্ব বজায় রেখে এই মেয়েটিকে দেখছে। কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারছে না। ইতিমধ্যে সে খোঁজ নিয়ে জেনেছে- মেয়েটি রাখাইন, নাম প্রিনছা খেঁ। ঘূর্ণিঝড়ে সে তার পরিবারকে হারানোর পর এই মেডিকেল টিমটির সাথে নার্সের কাজ করছে। মেয়েটির অসহায়ত্বের কথা কল্পনা করে সাঈদের নিজেকেই বড় অসহায় মনে হতে লাগলো। এই প্রাণোচ্ছল মেয়েটিকে দেখে বুকের মধ্যে বার বার কে যেন বলে উঠছে- আহারে, বড় ভালো মেয়ে, আহারে।

সাঈদদের ফিরে যেতে হবে, কিন্তু প্রিনছার সাথে একবার কথা না বলে সে যায় কি করে। বিকেলের দিকে সাঈদ প্রিনছাকে বলেই বসলো তার অসহায়ত্বের কথা, তার ভালো লাগার ভাষণ। হাসিখুশি মেয়েটির মুখ মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। সে এমনটা আশা করেনি। কিন্তু জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে লড়াই করা এই ছেলেগুলোকেও তার ভালো লেগেছে। অগত্য সে তার প্রেম ও যুদ্ধের দর্শন বুঝিয়ে সাঈদকে বললো, ‘এখনতো তো তুমি যুদ্ধে যাচ্ছ, এই অস্ত্রটার যত্ন নিয়ো। এই অস্ত্রটাই এখন তোমার প্রেয়সী, তোমার প্রিনছা। যুদ্ধ শেষ করে ফিরে এসো, আমি অপেক্ষা করবো।’ সাঈদ হতবাক হয়ে একটা গ্রাম্য মেয়ের কথা শুনলো। যুদ্ধ মানুষকে বড় দার্শনিক করে তুলে।

২.
সুরেন বাবু পাথরঘাটা থানার সাধনা ঔষাধালয়ের স্থানীয় এজেন্ট। দোকানে বসে থেকে থেকে তাঁর শরীর প্রায় ভেঙে এসেছিলো। কৈশরে তিনি মাষ্টারদা সূর্যসেনের সাথে অস্ত্রাগার লুন্ঠনে অংশ নিয়েছিলেন, সেই উজ্জ¦ল স্মৃতি সমুজ্জ্বল। এরপর বহুদিন ইংরেজ পুলিশের নজরবন্দী থাকলেও পাকিস্তান কায়েম হবার পর সেই যন্ত্রনা থেকে মুক্তি মিলেছে। কিন্তু এই ঘূর্ণিঝড়টাই তাঁকে আবার তাঁর তারুণ্যে নিয়ে গেছে। চারিদিকে প্রচুর আর্ত। আয়ুর্বেদ ওষুধ আর ওষুধ বিক্রির টাকা তিনি দেদারছে এদের পেছনেই ঢালছেন। তবে সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হচ্ছে তিনি একটি মেয়েকে আশ্রয় দিয়েছেন। প্রিনছা। বড় ভালো মেয়েটি, অসাধারণ তার রান্নার হাত। সারা দিন দৌঁড়াদৌঁড়ি করে জনসেবা করেন, বাড়িতে ফিরে প্রিনছার রান্না খাবার খান। জীবনটাকে বড় মধুর মনে হয়।

জুলাই মাসে পাকিস্তানি আর্মি পাথরঘাটা থানা আক্রমণ করলো। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনে সূর্যসেনের সবচেয়ে কনিষ্ঠ কর্মী সুরেন বাবু তাঁর বাসাতেই মারা পড়লেন। প্রিনছাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো গাবখান খালের মাথায় বাউকাঠি গ্রামের পাকিস্তানী ক্যাম্পে।

৩.
এরপর লুট। একদিন একটা ছেলে রাইফেল সরিয়ে রেখে প্রিনছার হাত ধরতে চেয়েছিল। জন্মভূমির কথা বলে প্রিনছা তাকে সরিয়ে দিয়েছিল। এখন অগনিত রাইফেলের ভেতর তার ছোট্ট শরীরটাকে মনে হয় যেন নিজেরই জন্মভূমি। তার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে শত্রুর ট্যাঙ্ক, গোলা বারুদ ভর্তি গাড়ি। এটাতো যুদ্ধ। এখানে কেউ ভেঙে পড়ে না। অস্ত্রকে যে যত ভালো ব্যবহার করতে জানে, এখানে তার জয়ের সম্ভাবনা ততো প্রবল। প্রিনছা তার অস্ত্র ব্যবহার করা শুরু করলো।

প্রিনছার রান্নার হাত খুব কাজে লেগে গেল। ক্যাম্পে দু জন পাকিস্তানি বাবুর্চি আছে। সে হলো তৃতীয় বাবুর্চি। কিন্তু বাবুর্চি মেটাতে পারে না, সৈন্যদের এমন কিছু প্রয়োজনও সে হাসিমুখে মিটিয়ে থাকে। ফলে নিঃসঙ্গ, যুদ্ধপীড়িত সৈনিকদের ভেতর তার জনপ্রিয়তা দিনকে দিন তুঙ্গে উঠে গেল। দেখা গেল, ক্যাম্পে পাকিস্তানীদের খাবার অভ্যাসই বদলে গেছে। ভাত, মাছের মতো বাঙালি খাবার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আর প্রিনছার ‘প্রেমিকরা’ প্রিনছাকে অবসর সময়ে শেখাচ্ছে অস্ত্র চালানোর নিয়ম।

অক্টোবরের দিকে জানা গেল প্রিনছা অন্তসত্ত্বা। ডাক্তার প্রয়োজন। ক্যাম্প কমান্ডার একজন হাবিলদার, একজন সেপাই ও ক্যাম্পে কাঠ সরবরাহকারী বাবুল মিয়াকে সঙ্গে দিয়ে প্রিনছাকে ঝালকাঠিতে পাঠালো। আলাদা কক্ষে ডাক্তার প্রিনছাকে অনেকটা সময় নিয়ে দেখলেন। দুজনের মধ্যে কথা বেশ কথা হলো। ডাক্তার হাবিলদারকে বলে দিলেন, বাচ্চা বেশ বড় হয়ে গেছে। এখন এ্যাবরশন করানো যাবে না। প্রিনছাকে চারদিন পর পর এখানে আনতে হবে।

ঝালকাঠিতে ডাক্তারের কাছে পাঠাতে প্রথম দিকে পাহারা থাকলেও ক্রমশ পাকিস্তানীদের এই পাহারায় ঢিল পড়তে থাকে। এমন বিশ্বস্ত মেয়ের সাথে প্রতিদিন চর পাঠানোও বিশ্বাসের অমর্যাদা। চতুর্থবার প্রিনছা একাই ঝালকাঠি গেল। সেদিন সে ডাক্তারের কাছে সাহসে ভর দিয়ে একটা দাবী করে বসলো। প্রথমত প্রিনছা কখনই অন্তঃসত্ত্বা ছিল না। তার পরামর্শেই ডাক্তার হাবিলদারকে এই কথা বলেছিলেন। প্রিনছার এখনকার দাবী হচ্ছে- ডাক্তারকে এমন এক বিষ জোগাড় করে দিতে হবে, যার গন্ধ নেই, স্বাদ নেই এবং খাবার পর নিশ্চিত মৃত্যু।

স্বাধীনতার স্বপ্ন তখন মানুষকে পেয়ে বসেছে। ডাক্তারের এক ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছে। ডাক্তার তাই প্রিনছার জন্য এই বিষ জোগাড় করে দিলেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রিনছা এই বিষ খাবারের সাথে মিশিয়ে সৈন্যদের খুব যতœ করে খাওয়ালেন। সকলেই অচেতন হয়ে পড়লো। প্রিনছা পালিয়ে বরিশাল চলে আসলেন। বরিশালে এসে শোনেন, ক্যাম্পের ৪২ জন সৈন্যের ভেতর ১৪ জন সেনা মারা গেছে। বাকিদেরকে চিকিৎসার জন্য ঢাকাতে পাঠানো হয়েছে এবং প্রিনছাকে পাকিস্তানীরা পাগলের মতো খুঁজছে।

মাত্র ১৪ জন মারা গেছে শুনে রাগে ফেটে পড়লেন প্রিনছা। বেঈমান ডাক্তার, ভেজাল বিষ দিয়েছে। প্রিনছা সীদ্ধান্ত নিলেন ঝালকাঠি ফিরে গিয়ে ডাক্তারকে হত্যা করবেন। কিন্তু ততোদিনে বরিশালসহ ঐ অঞ্চল তার জন্য খুব বিপদজনক হয়ে পড়েছে। ফলে তিনি বোরকা পরে ঢাকার দিকে চলে আসেন।

৪.
১৯৭২ সালে প্রিনছার সাথে সাঈদের দেখা হয় বরিশালে। প্রিনছা সাঈদকে কি বলেছিলেন জানেন। তিনি বলেছিলেন, ‘একদিন নিশ্চয়ই আমার বিয়ে হবে, কেন হবে না ? আমি কি খারাপ মেয়ে ? আমিতো যুদ্ধ করেছি, পাকিস্তানি শত্রু মেরেছি।

সাঈদ সেদিনও নির্বাক ছিলেন। কি বলবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। একটা পুরনো জমিদার বাড়ির উঠোনের একপাশে বসে ছিলেন দুজন।

একটু থেমে প্রিনছা আবার বলেন, ‘এখন বলতো, আমার এই দেহটা সুতীক্ষ্ণ হাতিয়ার নয়, শত্রু হননে ? এ হাতিয়ার ব্যবহৃত হয়েছে লক্ষ কোটি মানুষের মুক্তির জন্য, মুক্তিযুদ্ধের জন্য। জানো সাঈদ, আমার এই দেহ, এই রূপ লাবন্যের জন্য আমি গর্বিত। মুক্তিযুদ্ধের এমন হাতিয়ার আর দেখেছ ? তুমিই বলো, যুদ্ধের সময় তোমার হাতে যে অস্ত্র ছিল, সেটা আর আমার এই দেহ কি আলাদা আলাদা অস্ত্র। এমন একটা মুক্তিযুদ্ধ না এলে কি করে জানতাম, আমি একজন প্রিনছা-একটি সুতীক্ষ্ণ আবেগময় হাতিয়ার।’

……………………….

বন্ধুরা প্রিনছাকে শুধু স্যালুট দিয়ে চলে যাবেন না। একটু ভাবুন, ভাবার চেষ্টা করুন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কী? আপনি কি প্রিনছার বাংলাদেশকে কোথাও দেখতে পান ? একবার ভাবুন আদিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের ভূমিকা নিপীড়কের কেন ? কেন সংবিধানে তাদেরকে আদিবাসী’র মর্যাদা থেকে উপজাতিতে নামানো হয়েছে। যদিও বলা হচ্ছে না- তারা কিসের উপ।

আর রাখাইনদের কথা জানতে চান, তাদের নারীরা এখনো ধর্ষিত হন। বরগুনা, পটুয়াখালী অঞ্চলে তারাই সবচেয়ে নির্যাতিত জাতি। প্রশ্ন করুন প্রিনছার বাংলাদেশ কোথায় হারালো?

এই দেশ, নিরুদ্দেশ।

(তথ্যসূত্র ও যথাযথ কৃতজ্ঞতা : মেজর কামরুল হাসান ভুঁইয়া, জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা)

আমার ফেসবুক প্রেফাইল