ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

1361195002

২০১৩ সালে গণজাগরণের দিনগুলোতে আমি এদেশের এক সাধারণ নাগরিক হিসেবে, শাহাবাগে প্রতিদিন হাজিরা দেওয়াকে আমার কর্তব্য হিসেবে নিলাম। দেশপ্রেমের কোন তাৎক্ষনিক বুদবুদ এটা ছিলনা। মঞ্চের মাইক থেকে যে স্লোগান বাতাসে ধ্বনিত হতো, তারচেয়ে বড় কোন প্রত্যাশা নিয়ে, টপশটগুলোতে যে লক্ষ মানুষের মাথা দেখা যায়, তাদের একজন হয়ে বসে থাকতাম।

এমনই এক দিনে আমার ড্রয়ার থেকে বাংলাদেশের পতাকাটা বের করলাম। আমার অগোছালো স্বভাব, কাপড়ের ভাজ সেটার মসৃনগায়ে দাগ ফেলেছে। পথেই এক লন্ড্রিতে সেটাকে পেশ করলাম, ইস্ত্রি করার জন্য। ধোপা ছেলেটি তরুন, খুব যতেœ আমার পতাকা নতুন করে দিলেন। আমি তাকে পয়সা দিতে গেলাম, কিছুতেই নিলেন না। ‘পতাকা ইস্ত্রি করে পয়সা নেব ? তাও কি হয় ?’ এই তরুণটি জাগরণের দিনগুলোতে কখনো শাহবাগ যাননি। মুনীর চৌধুরীর লেখা পড়েননি, আলতাফ মাহমুদকে নামেও হয়তো চিনবেন না। কিন্তু লাল সবুজ একটা পতাকা, তার দেশের নিশান। যে পতাকাতে তার সংগ্রাম লেখা আছে।

বলা হয়, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছিলো, ভারতের স্বাধীনতার উপজাত হিসেবে। জিন্নাহ সাহেব একাই কয়েকজন সহযোগিকে নিয়ে রাতারাতি একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতায় চলে আসেন। এ অঞ্চলের মানুষের জন্য পৃথক একটি মুসলিম রাষ্ট্রের ইচ্ছা, কোন বহুদিনের লালিত স্বপ্ন ছিলো না। ফলে প্রস্তুতিও কিছু নেই। কিন্তু দেশভাগ, দাঙ্গা, মৃত্যু, আগুন দুই দেশের হিন্দু মুসলমানদের জীবনকে এতো প্রভাবিত করেছে যে- পৃথক রাষ্ট্রের মতো পৃথক চেতনা সৃষ্টির প্রয়োজনীতা দেখা যাচ্ছে। পকিস্তানের ইতিহাস আর সাহিত্যের বইগুলো নতুন করে লিখতে হবে। সকলে মিলে সেই প্রচেষ্টা শুরু হলো। আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সৃষ্টি নয়, রাষ্ট্র গঠনের পর আদর্শ সৃষ্টি করতে হবে, পাকিস্তানি আদর্শ। যেখানে হিন্দুরা থাকবেন অনুচ্চারিত, কারণ এটা তাদের দেশ নয়।
কিন্তু সমস্যা হলো বাঙালি মুসলমানদেরকে নিয়ে। তারা পাঞ্জাবী মুসলমানদের সাথে যতটা নৈকট্য অনুভব করে, তারচেয়ে বেশি স্বস্তি বোধ করে করে বাঙালি হিন্দুদের কাছাকাছি থাকতে। বস্তুত কলকাতার সাথে পৃথক হওয়াটাকে তারা একই দেহের একটি অংশকে- ধরা যাক, হাতকে তার শরীর থেকে বিভক্ত হয়ে তাকে আলাদাভাবে স্বাধীনতা ভোগের মতো মনে হয়। কেননা এদের ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত, দর্শন, শিক্ষা সবই এক। এ অঞ্চলের মানুষ ধার্মিক হলেও, গোড়া নয় বলে- শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে ভারত থেকে পূর্ব বাংলাকে পৃথক রাখা-পাকিস্তানি নীতি নির্ধারকদের কাছে অসম্ভব মনে হয়। ফলে ভাষাই তাদের প্রধান সন্দেহভাজন ও শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।

দিকে দিকে পাকিস্তানি চেতনার সৃষ্টি ও চর্চার প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ১৯৪৭ সাল থেকেই এদেশের যেসকল তরুণরা বাঙালি সংস্কৃতিকে আরো বেশি আকড়ে ধরেছিলেন, তারা সকলেই যে আওয়ামীলীগ ছিলেন এমনটাও নয়। বরং এদের অধিকাংশই ছিলেন সমাজতন্ত্রে দিক্ষিত তরুণ, যারা চেয়ে ছিলেন পাকিস্তানি পুলিশদের বোধ শক্তির অতীত একটি ন্যায় ভিত্তিক ও শোষণহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ৭১ সালের মধ্যে সেই সকল তরুণদের অধিকাংশই স্ব স্ব ক্ষেত্রে সুনামের সাথে পরিণত হয়েছেন বরেণ্য বুদ্ধিজীবিতে। তাঁদের সৃষ্ট চেতনা দ্বারা, যা পকিস্তানি আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত- আপামর মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে তাড়িত করছে। স্বভাবতই ৪৭ থেকে ৭১ পর্যন্ত তাঁদের প্রত্যেকের রয়েছে একটি দীর্ঘ ট্রাক রেকর্ড। শুধু ১৪ ডিসেম্বর নয়, পুরো একাত্তর সাল জুড়ে এই সকল মানুষদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হয়েছে। লাড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান।

আজকে অনেকে বলেন, ৭১ এ কি হয়েছে ভুলে গিয়ে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। ইতিহাসের উপর এতোটাই কুয়াশা তৈরি করা হয়েছে যে, তা সামনের দিকটাও ঢেকে দিয়েছে। বাংলাদেশ কেন সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা না জানলে আপনি আমি সামনে এগিয়ে কোথায় পৌঁছুতে পারি ?
শহীদ বুদ্ধিজীবিদের স্মৃতি রক্ষার্থে ১৯৮৮ সালে বাংলা একাডেমি একটি অসাধারণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। স্মৃতি : ১৯৭১ নামে একটি গ্রন্থ তারা প্রকাশ করা শুরু করে, যেখানে ১৯৭১ সাল জুড়ে আমাদের যে সকল বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করা হয়েছে- তাঁদের প্রতি তাঁদের নিকত্মাতীয়দের স্মৃতির সংকলন প্রকাশ করা হচ্ছিল। সংখ্যায় তাঁরা নিতান্ত কম নন। বাংলা একাডেমি ২০০১ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ১৩টি খন্ড প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ২০০১ সালে যখন খালেদা জিয়ার সাথে জামাত জোটবদ্ধ অবস্থায় বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় আসে, তখন এই অমূল্য প্রকাশনাটি বন্ধ হয়ে যায়। অনেকটা নিরবে। প্রকাশিত বইগুলোও আর ২০০১ সালের পর রিপ্রিন্ট হয় নি।

অনেক ক্ষতি কাগজে লেখা থাকে না। পাকিস্তানি আদর্শ বাস্তবায়নের প্রবল ইচ্ছা, আমাদের অনেক ইতিহাস প্রকল্পকে এমনি ভাবেই রুদ্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু মুক্তির লড়াইকে কেউ কখনো কেউ রুদ্ধ করতে পারে না। কারণ পাকিস্তান আর বাংলাদেশ সৃষ্টির কারণগত সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি হচ্ছে- একটি আদর্শ জন্ম নেবার পর- সেই আদর্শই আমাদেরকে মুক্তির দিকে ধাবিত করেছে। কিছুতেই হঠাৎ পাওয়া এ নয়। লন্ড্রির সেই তরুণটির ইতিহাস জানা না থাকলেও- লাল সবুজ পতাকার দিকে তাকিয়ে তিনি সেটা অনুভব করতে পারেন। করে চলবেন। এ আবেগও পাকিস্তানপন্থীদের বোধ ক্ষমতার অতীত।

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৫ সালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে আমি আশা করছি- স্মৃতি: ১৯৭১ প্রকল্পটি আবার চালু হবে।

আমার ফেসবুক প্রোফাইল