ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

সাম্প্রতিককালে রামু, পটিয়াসহ চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৌদ্ধ ও হিন্দুসম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, ভাঙচুর, জ্বালানো-পোড়ানোর ঘটনা মন্ত্রীসহ সকলে বলছে এ ঘটনা খুবই দুঃখজনক। কিন্তু তাতেই কি শেষ? হয়ত মামলা যাদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে, এ নিয়ে তদন্ত হবে, কিন্তু বাংলাদেশে আদৌ কি প্রকৃত অপরাধী শাস্তি পায়? আইনের ফাঁক-ফোকরে ঠিকই বের হয়ে যায় কোনো না কোনোভাবে।

কিন্তু আসলে এক মুসলিমই “Instant Allah” নামের ফেইসবুক আইডি দিয়ে ফেইসবুক থেকে কক্সবাজারের রামু উপজেলার হাইটুপী গ্রামের উত্তম কুমার বড়ুয়া নামক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর ফেইসবুক প্রোফাইলে আপত্তিকর ছবি ট্যাগ করা হয়। ছবিতে ‘কোরআনের উপর মহিলার দুটি পা’, ‘আল্লাহ শব্দের বিকৃতি’, ‘পবিত্র কাবা শরীফে কেউ নামাজ পড়ছেন, কেউ পূজা করছেন’ এমন দেখানো হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, দোষ কার? উত্তম কুমার বড়ুয়াকে যে ট্যাগ করেছে? নাকি উত্তম কুমার বড়ুয়ার? এর পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দুদের বাড়ি-ঘরেও হামলা হয়েছে। এর দোষ কার?

মুসলিমরা যদি শান্তিপ্রিয় হয়ে থাকে তাহলে অশান্তির কেন এমন কাজ করবে? আর যদি প্রকৃত মুসলিমরা মনে করেন এসব অপকর্ম যারা করেন তার আসলে মুসলিমই নন, তাহলে এদেরকে টার্গেট করে প্রকৃত মুসলিমরা কোনো ব্যবস্থা কেন নিচ্ছে না? মায়ানমারে যখন বৌদ্ধরা মুসলিমদের অত্যাচার করে, তখন বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের মুসলিমরা (সেটা প্রকৃতই হোক আর অপ্রকৃতই হোক) সোচ্চার কন্ঠে এর নিন্দা, প্রতিবাদ, সমাবেশ, নানা কিছু করে। কিন্তু কই, যখন নিজের দেশে বৌদ্ধ-হিন্দুরা নির্যাতিত হয়, তখন বেশীরভাগ মুসলিমই চুপ কেন?

আসলে হুমায়ুন আজাদের একটা কথা মনে পড়ছে —

মসজিদ ভাঙে ধার্মিকেরা, মন্দিরও ভাঙে ধার্মিকেরা, তারপরও তারা দাবী করে তারা ধার্মিক; আর যারা ভাঙাভাঙিতে নেই, তারা অধার্মিক বা নাস্তিক।

এক্ষেত্রে আমার এক বন্ধুর বন্ধু (তাশফি মাহমুদের) ফেইসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জামায়াতের সংস্পর্শের ইঙ্গিত পেলাম —

রামুতে ধর্মীয় যে সহিংসতা ঘটলো তাতে জড়িয়ে গেছে ফেসবুক। এবং এর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বেশ ক’জন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের মন্তব্য ছিলো যে এটা স্বাভাবিক এবং তেমন কোনো ঘটনা নয় কারণ বার্মাতে বৌদ্ধরা মুসলমানদের উপর নির্মম অত্যাচার করেছে, বাঙালীরা এত নির্দয় না। যে এবং যারা বলেছে তাদের এসব মন্তব্য যে কত নির্দয় তা হয়তো এরা ভেবেও দেখেনি। আর এই নির্মমভাব, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা এদের মধ্যে সিস্টেমেটিকালি ছড়ানো হয়েছে মিথ্যা ছবি দিয়ে মিথ্যা নিউজ দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাইলাই হত্যাকান্ডের ছবি চালানো হয়েছে বার্মায় মুসলমান হত্যা বলে। থাইল্যান্ডের উপকুলে আটক জেলেদের (যাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দাত কেলিয়ে হাসছিলো) চালানো হয়েছে গণহত্যার শিকার বলে। ফেসবুকে যেসব পেইজ এই জঘন্য মিথ্যাচার চালিয়েছে তারা আল্লাহর নামে ইসলামের নামে এই মোনাফেকি এবং কবিরা গুনাহ করে যাচ্ছে সামান্য কিছু পয়সার বিনিময়ে। তাদের স্পনসর জামাতে ইসলামী। রোহিঙ্গাদের তাদের দরকার। কারণ রোহিঙ্গারা থাকলে তাদের দেখিয়ে সাহায্য আনতে পারবে বিদেশ থেকে, বাঙালী পাসপোর্টে বিদেশ পাঠিয়ে বায়তুল মালের চাদা নিশ্চিত করতে পারবে, আর এদের ঘাতক ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তাই ভাইয়েরা। ধর্ম কর্ম করতে ফেসবুকে আসার দরকার নাই। ওইটার জন্য আল্লাহর ঘর আছে, মসজিদ আছে, জায়নামাজ আছে। মোনাফেকদের ফাদে পড়ে মোনাফেক হইয়েন না। কবিরা গুনাহর ভাগীদার হইয়েন না। বর্জন করেন এইসব ছাগু পেইজ। আর প্রতিহত করেন এই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিরে। উস্টার উপর রাখেন, রাস্তায় পাইলে রাস্তায়, ফেসবুকে পাইলে ফেসবুকে। এদের বন্ধু বানাইছেন তো আমার বন্ধুত্ব হারাইছেন। খিয়াল কইরা…

এই প্রশ্নটা সত্যিই খুব গুরুত্বপূর্ণ যে- ইসলামের কোন তরিকানুযায়ী বা কোরআনের কোন আয়াতে বলা হয়েছে অন্যের ঘরবাড়িতে অগ্নিসঙযোগ কিঙবা লুটপাট করার কথা? যদি তা না হয়- তবে কেনো এই নীরবতা? কিছুদিন আগেও যারা জিহাদি জোশে নানা পন্থায় রোহিঙ্গাদের এদেশে আশ্রয় দেবার বিষয়ে উচ্চকিত ছিলেন তাদের তো কোনো দেখা পাই না, ভুল ছবি-ভুল তথ্য দিয়ে যারা বার্মার ঘটনাকে বাঙলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ের সাথে সঙশ্লিষ্ট করার অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন রামুর ঘটনায় তাদের কোনো রা নেই। একেই বলে সভ্যতা!

অন্য দেশের ‘মুসলিম’ আক্রান্তের ঘটনায় মুমিন মুসলমানরা যতোটা সোচ্চার হয়েছিলেন, নিজের দেশের ‘মানুষ’ আক্রান্তের ঘটনায় তাদের এই বিভৎস নীরবতা সত্যিই সন্দেহজনক। যারা শুধু ‘মুসলমান’ চেনেন কিন্তু ‘মানুষ’ চেনেন না- তাদের আসলে রিটায়ার্ড করার টাইম চলে আসছে।

রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ নিয়ে তৎকালীন সময়েই নানা জনে নানা জিহাদি বক্তব্য দিয়েছে, রামুতে বৌদ্ধ বসতি আক্রান্ত হবার ঘটনায় তাদের প্রচ্ছন্ন মদদ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক যে নয় তার দুটো কারণের একটি হলো- ওইসব জিহাদি স্ট্যাটাসধারীদের নীরবতা, আর অন্যটি হলো- রোহিঙ্গাদের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে সরকার ‘একটি বিশেষ গোষ্ঠী’র কূটচালের বাড়া ভাতে ছাই ছুড়ে দিলো। রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে ‘একটি বিশেষ গোষ্ঠী’ সারাদেশে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ায়, মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালি শ্রমিকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবঙ সবশেষে ‘দাড়িপাল্লা’ ভারি করে।

সেই ‘একটি বিশেষ গোষ্ঠী’র নাম জামায়াতে ইসলাম। অনলাইন গণমাধ্যম পুলিশের বরাত দিয়ে জানিয়েছে-

“জামায়াতের লোকজন হামলার জন্য আবার জড়ো হওয়া চেষ্টা করছে।”
অতএব সাধু সাবধান!

মূলপোস্ট