ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

প্রাচীন বাঙালী প্রবাদগুলো বোধহয় সেকালের বয়োঃজ্যেষ্ঠরা সময়ের সাথে সাথে নানান অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জেনেই চিরন্তন বাক্যগুলো বলে গিয়েছিলেন। নইলে কয়জনায় আমরা নিজের ঘরে সদাইপত্র আছে নাকি না দেখে অন্যের ঘরের খবর নিব। আর শুধু খবরই নেব না, প্রয়োজনে নিজের সময়-অর্থ ব্যয় করে অন্যের সদাইপত্র এনে দেব। উদার মানসিকতার লক্ষণ হতে পারে এসব। কিন্তু নিজের ঘরের শিশুটা না খেয়ে কাঁদলেও আমার কান অব্দি তা আসবে না বা আসলেও আমি কোনো কিছুই করব না – এমনটাই বোধহয় বাঙালীদের চরিত্র।

প্রসঙ্গত, গত ক’দিন যাবত ফেইসবুক, টুইটার তথা অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়া এবং নিউজ মিডিয়াগুলো ফলাও করে প্রচার করছে গাজাতে ইসরাইলী হামলার নানান দুর্বিষহ ছবি, ভিডিও। ফলে স্বভাবতঃই আমাদের বাঙালী হৃদয়ে ক্রন্দন চলে আসছে। আর ফলে কেউবা অনন্ত জলিলের মতো অর্থ পাঠাচ্ছেন। কেউবা হেফাজতে ইসলামীর মতো বাংলাদেশে ইসরাইলী দূতাবাস ঘেরাওয়ের কর্মসূচী করছে। আর যারা একেবারেই কোনোভাবে সাহায্য করতে পারছেন না, তারা নিজ নিজ ফেইসবুক, টুইটারগুলোতে hashtag – “#SupportGAZA” বা এমনতর কিছু দিয়ে সেইসব দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।

এবারে দেখি অন্য দৃশ্যটুকু। খোদ বাংলাদেশে গত ক’দিনে কী সব ঘটেছে, আমরা ক’জনায় জ্ঞাত আছি? ক’জনে আমরা জানি উপজাতীয় শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না গুলি খেয়ে মরে যাবে বলে? ক’জনায় জানি স্বাধীন দেশ বাংলাদেশে সেসব শিশুদের স্কুল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে? ক’জনায় জানি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ফেইসবুকে ইসলাম অবমাননার দায় দিয়ে হিন্দু বাড়ি-ঘরগুলোতে হামলা হয়েছে? সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে ইদানীংকালে যে হারে হিন্দুপল্লীগুলোতে ফেইসবুকে ধর্ম অবমাননার অজুহাত তুলে দিয়ে কত নিরীহ মানুষজনের জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে – তা ক’জনায় জানেন? কিংবা স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধারা অর্থের অভাবে প্রাণ হারান, কিন্তু সাহায্যের জন্য আমাদের গাজায় ঠিকই অর্থ পাঠানোর সামর্থ্য থাকে, দেশের বীরসেনাদের জন্য না – সেখবরই বা ক’জনায় রাখেন?

আর যদি বলেন প্রকৃত মানবতার জন্যই আপনাদের এই সুশীল সমাজের লড়াই, তাহলে অন্যান্য যেসব দেশগুলোতে গাজার চেয়েও গুরুতর মানবতার হানি হচ্ছে, সেব্যাপারে কতটা সোচ্চার আছে আপনাদের কন্ঠস্বর? শুধুমাত্র গত সপ্তাহেই সিরিয়াতে ১,৭০০-র অধিক মানুষ মারা গেছে, যার মধ্যে দু’দিনেই ৭০০-র বেশী। এ নিয়ে কেন নীরব মানবতা? নাইজেরিয়াতে বোকো হারামের গ্রুপ শতাধিক মানুষ (বিশেষ করে নারী) মারছে, তখন কোথায় আপনাদের মানবতা? কিংবা যখন ISIS নামক সংগঠন হযরত ইউনুস আঃ এর মাজার ধ্বংস করে দেয়, তখন মুমিন মুসলমানরা কোথায় থাকে?

আমরা আজ সকলেই নিরীহ ফিলিস্তিনীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদের জন্য ইসরাইলকে দোষারোপ করছি। একবার নিজের দিকে দেখুন তো! ইসরাইল ১৯৪৮ সাল থেকে যে পরিমাণে আগ্রাসী হয়ে ফিলিস্তিনীদের জমি দখলে নিয়েছে, খোদ বাংলাদেশে ১৯৭১ এর পর থেকে ৩৩% থেকে ৮% এ নেমে আসা হিন্দু জনসংখ্যার জমিগুলো কাদের হাতে গেছে? পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ভূমি থেকে বিতাড়িত করে তাদের জমি দখল করে নিয়েছে কারা?

রক্তের বন্যা বইয়ে দেবার জন্য অন্যকে দোষারোপের আগে একবার নিজের হাতে দেখুন তো, নিজের হাতখানা রক্তময় কিনা? অন্যের দেশের আদিবাসীদের জন্য সহানুভূতি না দেখিয়ে নিজের দেশের আদিবাসীদের জন্য কি করেছেন, প্রশ্ন করুন তো নিজেকে? আপনি নিজে যা করতে পারছেন না, তা অন্যকে বলার আগে নিজে করে দেখুন তো পারেন কিনা? হযরত মোহাম্মদ সঃ একটা গল্প ছোটবেলায় ক্লাসে পড়েছিলাম এক শিশুকে মিষ্টি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলার আগে নিজে নিজের মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস বদলে তারপর সেই শিশুর মায়ের সামনে সেই শিশুকে মিষ্টি খাওয়ায় বারণ করেছিলেন। প্রকৃত ধর্মপ্রাণ হোন আর তথাকথিত নাস্তিকবাদী, মানবতাবাদীই হোন না কেন – নিজেকে হাস্যকর কৌতুকের পাত্র বানাবেন না। যদি সেই সাহস থাকে তবে আগে নিজে করে দেখান পরে অন্যকে বলবেন। আর সুবিধাবাদী একপেশে খবরের উপর ভিত্তি না করে, চারদিকে কী ঘটছে না ঘটছে সেদিকটাতে একটু মনযোগী হবেন। এতে গাজার মতো সিরিয়ার কিংবা নাইজেরিয়ার হাজারো মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টার জন্য নিজেকে অন্তত নিজের মন তৃপ্ত মনে হবে।

[পূর্বপ্রকাশিত]