ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

মেক্সিকো সিটি থেকে কানকুনের কানেকটিং ফ্লাইট যখন ধরলাম আকাশ পথের দীর্ঘ যাত্রায় আমার তখন ক্লান্ত বিদ্ধস্ত অবস্হা। কত গল্প শুনেছি কানকুনের। নয়নাভিরাম রিসোর্টগুলো সেলিব্রেটিদের অবকাশযাপন কেন্দ্র। তাদের নাকি নিজস্ব ভিলাও আছে এই এক্সপেনসিভ শহরটিতে।কোন এক্সাইটমেন্টই ভ্রমনের অবসাদকে ভুলিয়ে দিতে পারছিল না। তারউপর প্লেনটি যখন ল্যান্ড করছিলো মনে হচ্ছিলো যেন ক্ষেতের মাঝখানে নেমে যাচ্ছি।বেশ ঝাঁকুনি খেলাম। এখানে বুঝি কিম কার্দেশিয়ানের বিমানও নামে? নাকি তাদের জন্য আলাদা এয়ারপোর্ট আছে? নিজেকেই শুধাই আরকি! ট্যাক্সি নিয়ে রওনা হলাম হোটেলের দিকে। খুব সুন্দর শহর, পথের একপাশ দিয়ে বহুতল রিসোর্ট আর ঠিক।   অন্য পাশেই গভীর নীল ক্যারিবিয়ান সমূদ্র। প্রায় সব রিসোর্টগুলোর নিজস্ব বীচ আছে। আর তাতে আছে সানবাথের সুব্যবস্হা ।এ যেন “টাকা যার মুল্লুক তার” অবস্হা! সমূদ্র তটও হোটেলের দখলে!

সাগরের গর্জনের কেমন যেন এক সম্মোহনী শক্তি আছে।আবিষ্ট করে রাখে। সেই মায়াজাল নাকি পথের ক্লান্তি কোনটি যে এতো ভালো ঘুমের সহায়ক হলো বলতে পারবনা।

ছবি ১

ক্যারিবিয়ান সাগর

ভোরের সূর্যোদয়ের নরম আলো মনটাকে  আরো ঝরঝরে করে তুলল। রওনা হলাম পরবর্তী অভিযানের উদ্দেশ্যে, গন্তব্য “চিচেন ইৎসা” ।কানকুন শহর থেকে বেশ দূর ২০০ কিমি, ২.৫ ঘন্টার পথ। ঝা-চকচকে রিসোর্ট আর বীচের শহর কানকুনের বাইরে পথের দুপাশের গ্রামগুলো ঠিক।    যেন বাংলাদেশের আর দশটা গ্রামের মতোই। আবহাওয়া, গাছগাছালি আর ভূপ্রকৃতি অনেকাংশে একইরকম। পথে চোখে পড়ল সবুজ রঙের ‘টুক টুক'( অবিকল আমাদের দেশের সিএনজি!) আর রিক্সার মতো যান। ধনী আর দরিদ্রের পার্থক্যটা চোখ এড়ানোর উপায় নেই। আমার মানসপটে তখন চেগুয়েভারা উকিঝুঁকি দিচ্ছেন-ষাটের দশকে মোটর সাইকেলে করে দক্ষিণ আমেরিকার গ্রামের পর গ্রাম চষে বেড়ানো-শোষিতের অবস্হা স্বচক্ষে দেখা। চেগুয়েভারা আপনাকে বড্ড দরকার ছিলো যে এই সময়ে!

ট্যাক্সী এসে দাঁড়াল হাসিয়েন্দা চিচেন হোটেলের সামনে।১৬০০ শতকের স্হাপনা। আমাদের প্রাচীন জমিদার বাড়ীর সাথে সাদৃশ্য আছে।কলোনিয়াল যুগে স্প্যানীশরা বিশাল জায়গা জুড়ে এস্টেট তৈরী করত যাকে স্প্যানীশ ভাষায় বলা হতো ‘হাসিয়েন্দা’।ব্যবসা বাণিজ্য, চাষবাষ তথা অর্থনীতি নিয়ণ্ত্রিত হতো এসব হাসিয়েন্দা থেকে। সেই সাথে চলত ধর্মীয় প্রচার এবং রাজনীতি পরিচালনা। এই ব্যবস্হা চালু ছিল মূলত মধ্য আর দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশে। আর আমাদের এদিকে ফিলিপিনে। এই হোটেলটিও তেমনই একটা হাসিয়েন্দা ছিল যা ১৯৩০ সালে হোটেলে রুপান্তর করা হয়।

ছবি ২

অভ্যর্থনা কক্ষে চেক- ইনের কাগজ পূরনের সময় সবুজ পানীয় খেতে দিল। পালংশাক আর আনারসের মিশ্রণ। ভয়ে ভয়ে মুখে দিলাম। স্বাদটা ভালই। জিগ্গ্যেষ করতে নাম বলল ‘চায়া’। আলাপে জানলাম এই হোটেলে যারা কাজ করেন সবাই ‘মায়ান’ সম্প্রদায়ের। নির্ধারিত কটেজের দিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল একজন কর্মচারী।বিস্ময়ের পারদ শুধু উপরের দিকে উঠেই চলেছে। বলতে গেলে ঘন ঝোপ জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পীচ ঢালা সরু পথ। ব্যাগের চাকার খসখসে শব্দ এই পরিবেশে কানে বড় বেমানান ঠেকছে। এ কোথায় এলাম! মোবাইল ফোনে দেখি নেটওয়ার্ক নেই। সন্ধ্যা হতেই ঝিঁঝি পোকা আর নানারকম অচেনা শব্দে বুকের ভেতরটায় কেমন কেমন লাগছে। মনের ভিতর বনজঙ্গলে থেকে এডভেন্চার করার যে ইচ্ছেটা এতোদিন ছিল, রাত বাড়ার সাথে সাথে তা মিলিয়ে যেতে থাকল।

ঘুম থেকে উঠে জম্পেশ একটা নাস্তা করলাম। এদের দেশের সকালের নাস্তাটা আমাদের দেশের দুপুরের খাবারের মতো, বেশ কয়েক পদ- ভাত, মুরগী, ডাল, সব্জী, ফলমূল সবই আছে। সব বেলার খাবার শেষে পাকা পেঁপে থাকে।

ছবি ৪

হাসিয়েন্দা

হোটেল থেকে আগের দিন বলে দিয়েছিল বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাকি পিরামিডের এলাকা পর্যটকে ভরে যায়, ভালো ছবি তুলতে চাইলে সাতসকালে গিয়ে হাজির হতে হবে। কাল বিলম্ব না করে  হোটেলের ভেতর দিয়ে শর্টকাট পথে পা বাড়ালাম মায়ান সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের খোঁজে। উত্তেজনায় টের পাইনি কখন এসে দাঁড়িয়েছি মায়ান পিরামিডের সামনে। ছোট বড় কয়েকটি পিরামিড। সবগুলোর গোড়াটা চতুষ্কোণ, উপরের দিকটা মিশরের পিরামিডের মতো চোখা না। ভাবতেই অবাক লাগে সেই ৬০০-৯০০খ্রীষ্টাব্দে তৈরী অথচ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। ভেবেছিলাম জায়গাটা হবে গাছগাছালিতে ভরা। কিন্তু বিরান মাঠের পরিমাণটাই বেশী, কোথাও ঘাসের দেখা পাওয়া যায়, কোথাও খরখরে মাটি। হয়ত দেখার সুবিধার জন্য বেশি গাছ লাগানো হয়নি, ফাঁকা রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় পিরামিডটি হচ্ছে “কুকুলকানের পিরামিড”। লম্বায় ৯৮ফুট,মূলত তৈরী করা হয়েছিল জ্যোতির্বিদ্যার জন্য। ৩৬৫টা সিঁড়ী  নীচ থেকে উপরের দিকে উঠে গেছে। বাৎসরিক দিনপন্জীর মতো, একেকটা সিঁড়ী একেকটা দিনের হিসাবে। একদম চূঁড়ায় মন্দির। দর্শনার্থীদের উপরে উঠার অনুমতি নেই।

ছবি ৩

পিরামিড

ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম আরেক পাশে। সারি দেয়া লম্বা অনেক গুলো কলাম- টেম্পল অব ওয়ারিয়র। সূয্যি মামাকেই তো আমার এখন বড় যুদ্ধবাজ মনে হচ্ছে।প্রচন্ড গরমে ত্রাহি ত্রাহি দশা। একে একে দেখলাম ‘ গ্রেইট বল কোর্ট’, ‘সমপান্ত লি(শত্রু পক্ষের নিহত যোদ্ধাদের মাথার খুলি প্রদর্শনের স্হান)’ , ‘কারাকোল মানমন্দির(অনেকটা শামুকাকৃতির)’। ফিরে চললাম পিরামিড অভ কুকুলকানের কাছে। স্হাপনাগুলো ঘিরে স্হানীয় লোকেরা পন্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে। হাতে খোদাই করা কাঠের, লাইম স্টোনের মায়ানদের দেবী, ক্যালেন্ডার আরও কত কি। আমাদের দেশের মতোই ডেকে ডেকে পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। আমিও দস্তুর দামাদামি করে মায়ান দেবীর ছোট একটা মূর্তি কিনে ফেললাম। ভাবছি বৃষ্টির দেবীর মূর্তি নাতো আবার!

ছবি ৪

মায়ান হস্তশিল্প

চিচেনিৎসার পানির ব্যবস্হা হতো কতগুলো কুয়া (পবিত্র সিনোটি)থেকে। স্প্যানীশ রেকর্ড থেকে জানা যায় সবচেয়ে বড় কুয়াটাতে যুবতী মেয়েদের জীবন্ত নিক্ষেপ করা হতো বৃষ্টির দেবীর সন্তুষ্টির জন্য।প্রত্নতত্ত্ববিদরা খননকাজের সময় অনেক হাড়গোড় আর অলংকার পেয়েছেন।মনে করা হয় এসব দামী জিনিসপত্র তারা  শেষ সময়ে পরা ছিল। কি নির্মম! সভ্যতার শুরু থেকেই মেয়েরা সমাজ, সংস্কৃতি আর ধর্মের বলি!

সর্প দেবতা কুকুলকানের পিরামিডের সামনে কাঠের বেন্চীতে এসে বসলাম। বসন্তের সময় সূর্য যখন বিষুব রেখার উপরে থাকে, এই টেম্পলের উপর সূর্যের ছায়াটা সাপের মতো দেখায়। পৃথিবীর দূরদূরান্ত থেকে লোকজন  এসে ভীড় করে এটা দেখার জন্য। মায়ানদের জ্যোতির্বিদ্যায় দক্ষতা এতোটাই উন্নতমানের ছিল যে তারা সূর্যগ্রহণ কবে হবে তা নির্ণয় করতে পারত। ভাবতে অবাক লাগে এতো সমৃদ্ধশালী শহরটা রহস্যজনকভাবে শেষ হয়ে যায়। ১৪০০ সালের দিকে শহরের অধিবাসীরা জঙ্গলে চলে যায় আর পিছনে ফেলে যায় তাদের অমর কীর্তি। পর্যটকদের বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তোলা দেখছিলাম। বয়স্কদের হাতেও দেখা যাচ্ছে সেল্ফি স্টিক।   । হঠাৎ খেয়াল হলো পায়ের কাছে একটি কুকুর শুয়ে আছে। বেচারা এতোটাই ক্লান্ত যে চারপাশের শব্দেও চোখ মেলছে না।

ছবি ৫

কুকুল্কান পিরামিড

পরিশ্রান্ত পা দুটিকে বলা চলে একরকম টেনে নিয়ে চললাম হোটেলের দিকে। রাতে আবার আসতে হবে এখানে লাইট শো দেখার জন্য। তার আগে চাই একটু বিশ্রাম। সন্ধ্যায় নামল ঝুম বৃষ্টি। কটেজের বারান্দায় বসে মশার কামড় খাচ্ছি  আর বৃষ্টি দেখছি। বিশাল বিশাল গাছগুলোর ঢাউস সাইজের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা অন্যরকম এক শব্দের দ্যোতনা তৈরী করছে। নাকে আসছে ভেজা মাটির ঘ্রান। চারপাশটায় কেমন ঘোর লাগানো বিষন্নতা। আচ্ছা চারদিকে এই যে এতো হানাহানি আর আধিপত্যবাদ, সবকিছু ছেড়ে আমাদেরও কি বনজঙ্গলে যাওয়ার সময় চলে এসেছে?