ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

পশ্চিমাদের মধ্যে  ‘বাকেট লিস্ট ‘ ব্যাপারটা বেশ প্রচলিত। সোজা বাংলায় মৃত্যুর আগে কী কী জিনিস তুমি করতে চাও এই আরকি! এই ধারনাটা বেশ জনপ্রিয়তা পায় একটা ছবি থেকে যার নামই ছিল ‘ দ্য বাকেট লিস্ট’, যেখানে মৃত্যু পথযাত্রী দুজন রোগীর একটি হাসপাতালে দেখা হয় এবং তারা অ্যাডভেন্চারে বের হয়। সেইসব জিনিসগুলো তারা করতে থাকে যা তাদের লিস্টে ছিল কিন্তু আগে কখনো করা হয়ে উঠেনি।

বইয়ের চরিত্রগুলো

ধান ভাঙতে শীবের গীত গাইলাম এতক্ষণ | ‘ ফ্রাঙ্কফুর্ট বুখমেসে ‘ বা ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা ছিল আমার বাকেট লিস্টের অন্যতম। সেই কিশোর বেলা থেকে একুশে বইমেলায় যাতায়াত। আর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হলাম তখন জানতে পারলাম  জার্মানির  ফ্রাঙ্কফুর্ট নামক শহরে বসে পৃথিবীর বৃহত্তম বইমেলা। অক্টোবরের মাঝামাঝিতে ৫ দিনব্যাপী সেই বইমেলায় বিশ্বের নানান দেশ থেকে আসে প্রকাশক, লেখক, দর্শক, পাঠক। এটা মূলত প্রকাশক লেখকদের বই বিকিকিনির আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র। মেলার তারিখটা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যাতে শেষ দুইদিন থাকে  উইকেন্ড এবং ওই দুইদিনই শুধু জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। সদ্য শেষ হওয়া এবারের ২০১৭ এর মেলাতে ১৪০টি দেশের ৭৩০০ প্রদর্শক অংশগ্রহণ করেছে এবং দর্শক সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার।

আগোরা

এবারের আসর বসেছিল ১১-১৫ অক্টোবর, যথারীতি ফ্রাঙ্কফুর্ট ট্রেড ফেয়ার গ্রাউন্ডে, যা পুরোটা হেঁটে দেখতে হলে ৬৫ কিলোমিটার হাঁটতে হবে। অনেক ঝক্কি ঝামেলা করে বেলা ১১ টায় পৌঁছলাম মেলাস্থলে। ভাষা বিভ্রাট, তাই যাতায়াত বিভ্রাট। যেমন ছোট একটা উদাহরণ দেই – কিছুদূর এসে ট্যাক্সি ড্রাইভার ভাঙ্গাভাঙ্গা ইংরেজিতে বলছিল,“সিটি এন্ট্রান্স এ নামিয়ে দেই?” কিছু বুঝতে পারছিলাম না, আমি তো উঠার আগে বলেছিলাম ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট মেসে’ তে যাব। পরে বোঝা গেল মেইন এন্ট্রান্সকে এরা সিটি এন্ট্রান্স বলে।

নীল মঞ্চ

একমাস আগেই অনলাইনে এন্ট্রি টিকেট কিনে রেখেছিলাম, মূল্য জনপ্রতি ১৯ ইউরো। প্রথমে টিকিট চেক, তারপর ব্যাগ চেক। এরপর সবাইকে দেখাদেখি আমিও ভবনটার বাইরে এসে দাঁড়ালাম। আর সবার মত আমিও ছোট একটা শাটল বাসে উঠে পরলাম। এ কি রে বাবা! কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কাজের ব্যস্ততার জন্য ভাল করে জেনে বুঝে আসা হয়নি। বাইরে চলে যাচ্ছি না তো? টিকিট কেনার ওয়েবসাইটে লিখা ছিল – একদিনের জন্য এবং একবার ঢুকতে পারব। বের হয়ে গেলে পুনরায় টিকিট কেটে ঢুকতে হবে। মনে পড়ে গেল কোথায় যেন শুনেছিলাম এক বাংলাদেশি ভাই লন্ডনের মাদাম তুসো  মিউজিয়ামে ঢুকে ভুলক্রমে তেমন কিছু না দেখেই এক্সিট দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিলেন, অগত্যা ফের টিকিট কেনার বিশাল লাইনের শেষ জন হিসাবে দাঁড়াতে হয়েছিল তাকে।

বাংলাদেশের স্টল

বাস এসে থামল আরেকটা ভবনের সামনে। তাড়াতাড়ি হাতের ম্যাপটা খুললাম – প্রতিটা ভবন নাম্বারে চিহ্নিত করা, কোন কোন ভবনে আছে ৪ তলা পর্যন্ত। ভবনের প্রতিটা ফ্লোর আবার অ্যালফাবেটিকাল অর্ডারে বিভক্ত। যেমন আমার সামনের ভবনটা ৬ নম্বর। এই ভবনে ৪টি ফ্লোর, ক্রমানুসারে ৬.০ ,৬.১, ৬.২, ৬.৩ এ বিভক্ত। এই রকম ৪টা বেশ বড় ভবনে পুরো মেলাটা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। একেকটা ভবন থেকে আরেকটা ভবনের বেশ দূরত্ব, তাই শাটল বাসের ব্যবস্থা। তবে কেউ চাইলে হেঁটেও যেতে পারেন। ভবনের ভেতর দিয়েও যাতায়াতের ব্যবস্থা আছে। ভবনগুলোর মাঝখানে খোলা জায়গা যার নাম  ‘আগোরা’, প্রথমে ভেবে বসলাম আমাদের দেশের সুপার মল আগোরার ইন্টারন্যাশনাল ব্রাঞ্চ নাকি! আসলে গ্রিক শব্দ আগোরা শব্দের অর্থই হচ্ছে খোলা স্থান যেখানে জনসমাগম ঘটে এবং মার্কেট আছে। আর এই বইমেলার আগোরাতেও আছে দর্শনার্থীদের বসার ব্যবস্থা, ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান। ছোট ছোট স্টলে লেখকরা ‘বুক সাইন’ করছিল। লম্বা লাইন একেকটা বুক সাইনিং স্টলের সামনে যার বেশির ভাগই অল্প বয়সী ছেলে-মেয়ে। তারুণ্যের জয়!

তুরস্কের শিল্পীদের পরিবেশনা

বাংলাদেশ থেকে চারটি প্রকাশনী সংস্থা অংশগ্রহণ করেছে । ৫ নম্বর ভবনে পেলাম আগামী প্রকাশনীর স্টল। প্রকাশনীর তিসমা আপা শুনে অবাক হলেন যে শুধু বইমেলা দেখব বলে অন্যদেশ থেকে এতদূর এসেছি  তিসমা আপার কাছে খবর পেলাম ড্যান  ব্রাউন (দ্য ভিঞ্চি কোডের লেখক) আসবেন আজকে, আসর বসবে সন্ধ্যা ৭টা থেকে। টিকিট কিনে ব্রাউন সাহেবের অটোগ্রাফ নিতে এতক্ষণ বসে থাকতে মন চাইল না।

পা বাড়ালাম বাংলাদেশের অন্য স্টলগুলো দেখার জন্য। সবাই শুধু ঘুরে ঘুরে দেখছে, বই কিনছে খুব কম লোকই। কিছু কিছু দেশের স্টলগুলো এতো সুন্দর করে সাজানো। চলছে ছোট ছোট গ্রুপে আলোচনা। তুরস্কের স্টলে তো দেখলাম সুন্দর গান পরিবেশনা হচ্ছে। বাংলাদেশের বাকি ৩টা স্টল ৪ নম্বর ভবনে। ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গেলাম সেখানে।

একাডেমিক এন্ড ক্রিয়েটিভ পাবলিকেশন্সের স্টলে গিয়ে মনে হল মেলাতে আসা স্বার্থক। গোল টেবিলের চারপাশে বসে আছেন বেশ ক’জন গুণী লেখক। আনন্দে আটখানা হয়ে সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম স্যরের কাছে গিয়ে বিনীত স্বরে বললাম – ‘স্যার একটা ছবি তুলতে পারি আপনার সাথে?’  স্যার  সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলেন। স্টলের বাইরে এসে বেশ কয়েকটা ছবি তুললেন এবং কিছু গল্পও করলেন। এতো সুন্দর করে গুছিয়ে কিভাবে যে কথা বলেন স্যার!

কয়েক পা এগিয়ে দাঁড়ালাম বাংলাদেশ পাবলিশার্স এন্ড বুক এসোসিয়েশন স্টলের সামনে। স্টলে বসা এক ভাই জিজ্ঞাসা করলেন – ‘বাংলাদেশি?’ বললাম ‘হ্যাঁ’। সাদরে ভেতরে বসতে দিলেন। একে একে পরিচয় হল সম্মানিত সব আয়োজকদের সাথে। একসময় আসলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক স্যার; জার্মান প্রবাসী লেখক সবার প্রিয় পিয়ারী আপা। সবার সাথে ভাগাভাগি করে চা খেলাম  – ঠিক যেন একুশের বইমেলার স্বাদ! বইও উপহার পেলাম। আলাপকালে জানলাম একক প্ল্যাটফর্মে আবেদন করা হয়নি বলে বাংলাদেশের একটা বড় প্যাভিলিয়ন নেই, স্টলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে। পাশেই চায়নার একটা বিশাল প্যাভিলিয়ন যার ভেতর বিভিন্ন প্রকাশনী সংস্থা। আর সময় স্বল্পতার জন্য ডেকোরেশনও জাঁকজমক হয়নি। ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলায় আমার নিজের দেশের স্টলে লেখকদের আড্ডা দেখে এমনিতেই আমি আবেগে আপ্লুত, ছোটখাটো শর্টকামিংগুলো আর পাত্তা পাচ্ছিল না। বলাই বাহুল্য এখানেও চললো কয়েক প্রস্থ ছবি তোলা। অবশেষে সবাইকে শেষ বারের মত ধন্যবাদ জানিয়ে চললাম আগোরার দিকে। বইয়ের বিভিন্ন চরিত্রের পোশাক পড়ে অনেকেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। খুব বর্ণিল লাগছিল চারপাশ।

মেলার আরেকটা দিক হল ‘গেস্ট অভ অনার’, সেই ১৯৭৬ সাল থেকে চলে আসছে এই প্রথা। বিশেষ প্রদর্শনী হলের ব্যবস্থা থাকে ‘গেস্ট অভ অনার’ দেশের জন্য। এবারের দেশ ফ্রান্স। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতও দুবার এই মর্যাদা পেয়েছে। মেলা থেকে বের হওয়ার জন্য শাটল বাসে উঠে বসলাম। বিদায় ফ্রাঙ্কফুর্ট বুখমেসে। শীঘ্রই আবার দেখা হবে যখন বাংলাদেশ হবে আসরের ‘গেস্ট অভ অনার’ দেশ!