ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

IMG_0594

‘ফুরায় বেলা, ফুরায় খেলা, সন্ধ্যা হয়ে আসে

কাঁদে তখন আকুল মন, কাঁপে তরাসে

পৃথিবীতে আসার ঘোষণামাত্র অনেক অনিশ্চয়তার মাঝে যা একেবারে নিশ্চিত হয়ে যায় তা হচ্ছে মৃত্যু কিন্তু অনিবার্য এই সত্যটাকে আমরা ভুলে থাকতে চাই এটাই জীবনের ধর্ম অপ্রিয় সত্যটাকে একপাশে সরিয়ে রেখে আমরা জীবনের টানে এগিয়ে চলি চিত্রটা ততক্ষণ পর্যন্ত এরকম থাকে যতক্ষণ আমরা জানি না মৃত্যুটা কবে হবে প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন ঘটে সেই মুহূর্তে যখন আমরা জেনে যাই অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর আনুমানিক দিনক্ষণসপ্তাহ, মাস বা বছর- সমস্ত কর্মচঞ্চলতা থেমে যায়, হয়ে যায় স্থবির। এমন কোন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যে মৃত্যুপথযাত্রী আবিষ্কারের নেশায় মশগুল। এমনকি বিখ্যাত স্টিভেন জব্স প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে জীবনের শেষদিনগুলোতে করে গেছেন পাওয়া না পাওয়ার হিসাব নিকাশ। পরিবর্তন হয়ে যায় প্রায়োরিটি লিস্ট নিজেকে নিয়ে সদা ব্যস্ত মানুষগুলো পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে যায়, ঝুঁকে পড়ে মানবসেবায় অথবা আধ্যাত্মিকতায়। নিজের অস্তিত্ব তখন গৌণ হয়ে যায় হয়তো বা ঐ পরিস্থিতিতে আসন্ন মৃত্যুর চিন্তায় এটাই এক ধরনের coping mechanism

সম্প্রতি প্রশ্ন এবং উত্তরের ওয়েবসাইট ‘কোরা’ (quora)- তে দূরারোগ্যব্যাধিতে আক্রান্ত কিছু মৃত্যুপথযাত্রীর লেখা প্রকাশিত হয়েছেমৃত্যু আসন্ন জানা একজন হিসাবে জীবিতদের প্রতি আপনার উপদেশ কী?’- প্রশ্নটা অনেকটা ছিল এরকম। একজন উত্তরদাতার বর্ণনা

চার বছর আগে আমার ক্যান্সার ধরা পড়ে বয়স ছিল ৩০ এর কোঠায়। চমৎকার কেরিয়ার, দুটো বাচ্চাস্বামী এবং অসীম উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছিল আমার জীবন আর এখন আমার চলাফেরা হুইল চেয়ারে সীমিত দুই সপ্তাহে হয়তো একবার বাগানে যেতে পারি কিন্তু নিজেকে আমার আগের চেয়ে সৌভাগ্যবান মনে হয় কারণ এখন আমাকে আর ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না ছেলে-মেয়েকে নামী স্কুলে ভর্তি করাতে পারলাম কিনা তা নিয়ে রাতের ঘুম হারাম হয় না নেই দামী বাড়ি বা গাড়ী কেনার চিন্তা এইসব আমার কাছে আর কোন অর্থই বহন করে না আমি এখন সকল দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত

তার উপদেশ! – “সময় নষ্ট করো না, হয়তো তোমার জীবনে আগামী বছর, মাস, সপ্তাহ বা দিন নাও আসতে পারে। প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ কর পরিবার পরিজনের সাথে।”

২৭ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান এক তরুণী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় গত সপ্তাহে নিজের জন্য সবসময় নতুন জামা কাপড় না কিনে পরিবার পরিজন আর বন্ধুদের জন্য অর্থ ব্যয় করার পরামর্শ দিয়ে গেছে তার শেষ চিঠিতে

ওসামা সুলেইমান নামের এক তরুণের ২০০৯ সালে ব্রেইন টিউমার ধরা পড়ে কিছুদিনের মধ্যেই তার অনেক দিনের পুরোনো প্রেমিকাকে বিয়ে করার কথা ছিল কিন্তু সে চায়নি মেয়েটি বিধবা হোক তাই বিয়ে ভেঙ্গে দেয় সে সহকর্মীরা কর্মক্ষেত্রে তার জন্য ফ্লেক্সিবল আওয়ার কাজের ব্যবস্থা করে দেয় পুরোনো বন্ধুদের সাথে আবার দেখা সাক্ষাৎ শুরু করে সাথে চলে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরাঘুরি সে এখন অনুতপ্ত পরিবার এবং বন্ধুদের পর্যাপ্ত সময় না দেয়ার জন্য ওসামার উপদেশ?ছোট ছোট বিষয়গুলোর মধ্যে আছে আনন্দের উপাদানপরিবার-পরিজনদের সাথে সময় কাটাও, ভাল বই পড়, গান শোন, সুন্দর একটা সিনেমা দেখ ওসামা এখন নিয়মিত ডায়েরী লিখে, কোন জিনিসগুলো তাকে আনন্দ দেয়।”

লিন ফিশ ব্রেস্ট ক্যান্সার স্টেইজ ভুগছেন ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে তার পুরো শরীরে তার উক্তি –  “আমরা সকলে একদিন মারা যাব। আমি শুধু তোমাদের সবার চেয়ে একটু আগে মারা যাচ্ছিএই আর কি!”

মারা যাওয়ার সময় হলি বুচারের বয়স ছিল ২৬ বছর। ফেইসবুকে রেখে যায় তার নিজস্ব মতামত –  “মৃত্যু নিয়ে কখনই ভাবিনি সবসময় বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে নিজের একটা পরিবারের স্বপ্ন দেখতাম আমি এখনই চলে যেতে চাই না। আমি আমার জীবনকে খুব ভালবাসি কিন্তু কন্ট্রোল আমার হাতের বাইরে রাস্তায় জ্যাম, অফিসে অতিরিক্ত কাজের চাপ, বাচ্চার জন্য রাতে ভাল ঘুম না হওয়া, হেয়ার ড্রেসার চুল বেশী ছোট করে ফেলেছে অথবা পেটে মেদ জমে যাচ্ছেএমনি কত ছোটখাট বিষয় নিয়ে আমরা কতই না অভিযোগ করি কিন্তু আসলে এসব খুবই নগন্য যখন জীবনের দিকে তাকাবে প্রতিদিন আমি আমার শরীরটাকে একটু একটু করে নিস্তেজ হতে দেখছি কিন্তু কিছুই করতে পারছি না ইশ! যদি আর একটা বেশি জন্মদিন বা ক্রিসমাস পরিবারের সাথে কাটাতে পারতাম

সবার উপদেশেই অন্তত একটা জায়গায় মিল পাওয়া যায়জীবনের শেষ কিছুদিন আনন্দে থাকা, উপভোগ করা, জীবনের দৈনন্দিন চিন্তা (দুশ্চিন্তা বলাই ভাল) থেকে মুক্ত থাকা যখন আমরা জানি মৃত্যু আসন্ন তখনই শুধু আমরা আনন্দে থাকার’ মূলনীতি গ্রহণ করতে পারি যতই জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকিনা কেন, আমরা কেউই হয়তো চাইব না মৃত্যুর দিনক্ষণ নির্দিষ্টভাবে জানতে সবকিছুর বেলায় নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করলেও মৃত্যুর দিনক্ষণের বেলায় অনিশ্চয়তাই কি বেশি কাম্য নয়?

‘আজিকে হয়েছে শান্তি, জীবনের ভুলভ্রান্তি

সব গেছে চুকে, রাত্রিদিন ধুকধুক

তরঙ্গিত দুঃখ-সুখ, থামিয়াছে বুকে

যতকিছু ভালমন্দ, যতকিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব

কিছু আর নাই, বলো শান্তি বলো শান্তি

দেহ সাথে সব ক্লান্তি, হয়ে যাক ছাই