ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

কাজে নতুন সহকর্মীর আগমন, পর্তুগালের মেয়ে- খুবই চটপটে আর প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। চিকিৎসাবিদ্যা পড়েছে স্লোভাকিয়ায়, প্রাগে তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে পরিচয় আর কাজ করতে চলে এসেছে যুক্তরাজ্যে। ওর সাথে কাজ করে খুব আগ্রহ জাগল ওদের দেশটাকে দেখার। বাৎসরিক ছুটির শেষ পাঁচ দিন মঞ্জুর হয়ে যাওয়ায় গন্তব্য ঠিক করে ফেললাম। পর্তুগাল- ভাস্কো দা গামার দেশ!
.
এলাচ দারুচিনি আর রকমারি মসলার সৌরভে আকৃষ্ট হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে কত বণিকের আগমন। তারই পথ ধরে ১৪৯৭ সালে পর্তুগালের রাজা ম্যানুয়েল-১ ভাস্কো দা গামাকে নতুন পানি পথের সন্ধানে পাঠালেন। লিসবন থেকে যাত্রা শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেইপ অব হোপ, মোজাম্বিক আর কেনিয়ার মোম্বাসা মালিন্দি হয়ে ১৪৯৮ সালের ২০শে মে পৌঁছলেন ভারতের ক্যালিকাট উপকূলে। খুলে গেলো ইউরোপ থেকে সমূদ্র পথে এশিয়ায় বাণিজ্যের দুয়ার।
.
ইতিহাস থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম কেবিন ক্রুর কন্ঠস্বরে। বিমান থেকে রাতের লিসবন অপরূপ দেখাচ্ছে, নানা রঙের আলোয় ঝলমল। সকালে হোটেল থেকে সিটি ট্যুরের টিকেট কিনে নিলাম। কয়েক ধরনের টিকেট আছে- শুধু বাস, বাস এবং ট্রাম অথবা নৌকা করে শহরের বিভিন্ন জায়গা ঘুরার ব্যবস্থা। ৪৮ ঘন্টার টিকেট কিনলাম ৩০ ইউরো দিয়ে। লিসবন আমার দেখা ইউরোপের অন্যতম সবুজ শহর। পথের দু-পাশে উঁচু উঁচু গাছ। আর ছোট বড় কত যে পার্ক! প্রশান্তির একটা আবেশ! পর্যটকে ঠাসা অথচ পুরো শহর বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ঘুরতে ঘুরতে আরেকটি ব্যাপার চোখে পড়ল- বিভিন্ন ধরনের সুউচ্চ মনুমেন্ট। জাদুঘরের সংখ্যাও অবাক করার মতো। ইলেকট্রিসিটি থেকে শুরু করে গ্লাস সবকিছুরই জাদুঘর আছে এখানে। কয়েকটি জাদুঘরের সামনে দেখলাম স্কুলের ইউনিফর্ম পরা বাচ্চাদের ভিড়। পুরো শহরটি উঁচু-নিচু, কোথাও ঢালু হয়ে নেমে গেছে অনেকটা, আবার কখনো বেশ উঁচুতে উঠে গেছে রাস্তা। এতো ব্যস্ত সড়কেও গাড়ির হর্ণ শুনলাম না। লিসবনের বাড়িগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বাড়ির বাইরের দিকে নানান রকমের টাইলসের ব্যবহার। আর যেসব ভবনে টাইলস নেই সেগুলোর দেয়ালও নানা রঙের- কোনটা হলুদ, কোনটা হাল্কা গোলাপি, নীল বা সবুজ- পুরো শহরটিকেই করে তুলেছে রঙিন।
.
লিসবোয়ার (পর্তুগীজ ভাষায় লিসবনকে বলে লিসবোয়া) আকাশে ঝকঝকে রোদ আজ। বাস এসে থামল জেরোনিমোস মনাসটেরির সামনে। সাদা পাথরের ১৬শ’ শতকের বিশাল স্থাপনা। অদূরে টেগাস নদী। নির্মাণশৈলী যেমন সুন্দর তেমনি টেকসই। ১৭৭৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে লিসবনের বেশিরভাগ ভবন যেখানে ধসে পড়েছিল সেখানে জেরোনিমোসের তেমন কোন ক্ষতিই হয়নি। এটাও জড়িয়ে আছে ভাস্কো দা গামার ইতিহাসের সাথে। কথিত আছে এখানেই ভাস্কো দা গামা তার ভারত সমূদ্র যাত্রার আগের রাতটি কাটিয়েছিলেন। পর্তুগীজ ডেলিকেসি ‘পাস্তেল দে নাতার’ উদ্ভব এই মনাসটেরিতেই। ডিম ময়দার মিষ্টি জাতীয় খাবারটি আসলেই সুস্বাদু। রাস্তার পাশের দোকান থেকে শুরু করে নামকরা রেস্তোরাঁ সবখানেই এর সহজলভ্যতা। আর ইতিহাসটাও মজার। ১৮শ’ শতকের কিছু আগে মনাসটেরির মঙ্কদের হাতে খাবারটির উদ্ভব হয়। ক্যাথলিক মঙ্করা ডিমের সাদা অংশ ব্যবহার করত পোশাকের স্টার্চিঙের জন্য। রয়ে যাওয়া ডিমের কুসুম থেকেই উদ্ভব হয় খাবারটির। ব্রাজিল এবং অন্যান্য প্রাক্তন পর্তুগীজ ঔপনিবেশ দেশ গুলোতেও মিষ্টান্নটি বেশ জনপ্রিয়। ইউকের গার্ডিয়ান পত্রিকা এটিকে বিশ্বের ১৫তম সুস্বাদু খাবার হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। কোন পর্যটকই বোধহয় পাস্তেল দে নাতার স্বাদ গ্রহণ না করে পর্তুগাল ছাড়ে না।
.
আবার বাসে উঠে পড়লাম। বাস ছুটে চলেছে টেগাস নদীর তীর ধরে। এতো সুন্দর মনোরোম পরিবেশ! কেউ চাইলে জেরোনিমোস থেকে পায়ে হেঁটেও পুরো এলাকাটা ঘুরে দেখতে পারেন। বাস থেকে চোখে পরল বেলেম টাওয়ার। এটাও ১৬শ’ শতকের স্থাপনা, ১৯৮৩ সালে জেরোনিমোস মনাসটেরির সাথে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত হয়। টিকেট কিনতে হয় ভেতরে ঢোকার জন্য। বাসের অনেক যাত্রীই নেমে পরল। হাতে বেশি সময় নেই বলে এখানে না নেমে পরবর্তী স্টপে নামলাম। একটু মন খারাপ হলো বৈকি!
.
‘পাড্রাও দেস কম্ব্রিমেন্তস’- ১৫শ’ এবং ১৬শ’ শতকের পর্তুগীজ আবিষ্কারকে স্মরণ করার মনুমেন্ট। জাহাজের মাস্তুলে সারিবদ্ধ নাবিকগণ। সাদা রঙের মনুমেন্টটির দু-পাশেই মূর্তি- সর্বমোট ৩৩ জন সমুদ্র পথযাত্রীর। ১৭১ ফুট উচ্চতার ভাস্কর্যটি মনে করিয়ে দেয় পর্তুগীজ নাবিকদের দুঃসাহসিক অভিযানের কথা। জায়গাটি অন্যতম পর্যটক আকর্ষণ। দর্শনার্থীদের ভিড়ে মনের মতো ছবি তোলাই মুশকিল। এখান থেকে দেখা যায় ‘পন্তে ২৫ দে আব্রিল’ সেতু, যার নাম জড়িয়ে আছে ১৯৭৪ সালের ২৫শে এপ্রিল হওয়া পর্তুগীজ রেভল্যুশনের সাথে। ব্রিজটি অনেকটা ইউএসএর সানফ্রান্সিসকোর ‘গোল্ডেন গেইট’ ব্রিজের মতো দেখতে। মজার ব্যাপার হচ্ছে নদীর ওপারে অবস্থিত ‘ক্রাইস্ট দ্য কিং’ মূর্তিটি ব্রাজিলের ‘ক্রাইস্ট দ্য রিডীমারের’ আদলে তৈরি। লিসবনে বসে সানফ্রান্সিসকো এবং রিওডেজেনেরিও দুটোই দেখা হয়ে গেল আরকি! শেষ বিকেলের নরম রোদ গায়ে মেখে উঠে পড়লাম বাসে, গন্তব্য হোটেল। আগামীকাল বেড়িয়ে পরব লিসবনের ওল্ড টাউন দেখতে, যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক পুরোনো ক্যাথিড্রাল, ক্যাসেল আর খাবার-দাবারের দোকানপাট।
.
প্রাসা দো কমার্সিওর সামনে থেকে ট্রামে উঠলাম, এখান থেকেই ওল্ড টাউনের যাত্রা শুরু। খুবই ধীর গতি। ট্রামটি শুধু টুরিস্টদের জন্য, ধারণক্ষমতাও কম। প্রতিটি স্টপে প্রচুর টুরিস্ট ট্রামের অপেক্ষায়। কয়েকজন দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর জায়গা না পেয়ে চালকের সাথে ঝগড়া শুরু করে দিল। ওল্ড টাউনটা আর দশটা পুরনো শহরের মতোই- খুবই সরু রাস্তা, দু-পাশে সুউচ্চ ভবন। সেইন্ট জর্জ ক্যাসেলের কাছে নেমে পরলাম। জায়গাটা বেশ উঁচু। নিচের গোলাপি রঙের টালির ছাদ দেয়া ভবনগুলো পর্যটকদের ছবি তোলার অন্যতম আকর্ষণ। কাছেই পেয়ে গেলাম টুকটুক।পুরো ওল্ড টাউনটা ঘুরিয়ে দেখার চুক্তিতে উঠলাম, গুনতে হবে ২০ ইউরো। উঠতেই চালকের জিজ্ঞাসা ‘দেশ কোথায়?’ বাংলাদেশের কথা জানাতেই চালকের মুখে কথার খই ফুটল। ঢাকা তার চেনা, কাজের সুবাদে তিন মাস ছিল বাংলাদেশে। নিজেই বিভিন্ন জায়গায় টুকটুক থামিয়ে ছবি তুলে দিল। তার কাছ থেকে অথেনটিক পর্তুগীজ কুইজিন কোথায় পাওয়া যাবে জেনে নিয়ে নেমে পরলাম সাউথ জর্জ ক্যাসেলের সামনে।
.
ক্যাসেলটি বেশ উঁচুতে, পাহাড়ের চূড়ায়। পুরো পথটাই কবোল স্টোনে (cobble stone) তৈরি। ঘুরোঘুরি শেষে যে এলাকায় এসে পৌঁছলাম দেখে মনে হলো আবাসিক এলাকা। খুবই ঘিঞ্জি, সরু পথের দু-পাশে কোথাও খাবারের দোকান, কোথাও টুরিস্টদের জন্য স্যুভেনিরের দোকান। হঠাৎ কানে আসল সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা। প্রথমে ভাবলাম অডিটরি হ্যালুসিনেশনে ভুগছি নাতো! লিসবনে তো বেশি বাংলাদেশি থাকার কথা না। কেউ একজন ফোনে কথা বলছেন। অভদ্রতা হবে ভেবে দোকানের ভেতরে উঁকি দিলাম না। এদিকে পেটে শুরু হয়ে গেছে ছুঁচোর ডন। তড়িঘড়ি করে বসে পরলাম এক দোকানের বাইরে। বসেই বুঝলাম কি ভুল করেছি! আমি বুঝি না পর্তুগীজ, দোকানি বুঝেনা ইংরেজি। আমার ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশ ব্যবহারেও কোন ফল পাওয়া গেল না। শেষে দোকানি কোত্থেকে এক মহিলাকে ধরে নিয়ে এলো যে কিনা একটু-আধটু ইংরেজি বলতে পারে।
.
খাবারের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছি, আবার মনে হলো কেউ বাংলায় কথা বলছে। ভাল করে খেয়াল করতেই দেখলাম রাস্তার ওপারের দোকানে কয়েকজন নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। দেখে মনে হলো ওনারা এখানেই কাজ করেন। উঠে গিয়ে কথা বলব কিনা ভাবতে ভাবতেই বুড়ো দোকানি খাবার নিয়ে হাজির। সাথে জুড়ে দিলো গপ্পো। সে বলছে আর মহিলা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করে দিচ্ছে। রাত আটটার পর আসার নিমন্ত্রণ জানাল। রাতে রেস্টুরেন্টগুলোতে টুরিস্টদের জন্য বসে ঐতিহ্যবাহী পর্তুগীজ সঙ্গীত ‘ফাদো’র (Fado) আসর। ১৯শ’ শতকে লিসবনে এর উৎপত্তি। অনেকটা আমাদের পল্লীগীতির মতো। ‘পারলে আসবো’ জানিয়ে খাবারের দাম মিটিয়ে হাঁটতে লাগলাম ট্রাম ধরব বলে।
বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। পড়ন্ত বিকেলের ওল্ড টাউনের কবোল স্টোনের পিচ্ছিল সরু পথগুলো কেন যেন সুদূর অতীতকে টেনে আনে। ইতিহাসের পাতাগুলো উকিঝুঁকি করে মানসপটে- দুঃসাহসিক অভিযাত্রা, অজানা রোগে (স্কার্ভি) নাবিকদের মৃত্যুবরণ, আর ইতিহাসে কম আলোচিত (উপেক্ষিত বলাই ভাল) যাত্রাপথে ভাস্কো দা গামার নির্মম হত্যাযজ্ঞ। ট্রামের ঘন্টাধ্বনি মনে করিয়ে দিল ঘরে ফেরার কথা। ভাল থেকো লিসবোয়া চাও। বিদায়!