ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

সমুদ্র দেবতা পসাইডনের ছেলে ইউফিমাসকে স্বপ্নে প্রেমিকা নিম্ফ তার জন্যে সাগরে একটি দ্বীপ গড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানাল। দেবচক্ষুর আড়ালে সে যেন তার অনাগত সন্তান জন্ম দিতে পারে। ইউফিমাস সাগরে ছুড়ে দিলেন এক দলা মাটি। সেখান থেকেই জন্ম নিল অপূর্ব সুন্দর এক দ্বীপ- আজকের সান্তরিনি।

গ্রিক মিথলজি যাই বলুক, বিজ্ঞানীরা বলছেন অন্য কথা। লক্ষাধিক বছর আগে ইজিয়ান সাগরে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বৃত্তাকার একটি দ্বীপের সৃষ্টি হয়। সময়ের বিবর্তনে সাধু আইরিনির নামানুসারে এর নাম হয়ে যায় সান্তরিনি। হ্যা, আমি গ্রিক আইল্যান্ড সান্তরিনির কথাই বলছি।

সান্তরিনির একটাই বিমান বন্দর- থিরা। বলতে গেলে বিমান থেকে নেমেই ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়াতে হলো। ইমিগ্রেশেন পার হয়ে বাইরে ট্যাক্সির খোঁজে নামলাম।

ইউরোপের অন্যান্য বিমানবন্দরের ট্যাক্সি স্টপে যাত্রীরা লাইন মেইনটেইন করে। এখানে তা নয়। চালকেরা যাত্রীদের গন্তব্য জিজ্ঞাসা করছে। শুধু দূরের যাত্রীদের নিচ্ছে। তাও আবার একই দিকে গন্তব্য হলে অপরিচিত আরও যাত্রীকে একসঙ্গে তুলছে। অনুমতিও নিতে দেখলাম না।

বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর ভাগ্যদেবী প্রসন্ন হলেন। এক ট্যাক্সি ড্রাইভার যেতে রাজি হলেও সাফ বলে দিল মিটারে যাবে না; নির্দিষ্ট একটা ভাড়া দিতে হবে।

রাজি না হলে হয়ত সারা রাত এখানেই অপেক্ষা করতে হবে। তাই তথাস্তু! মনে হচ্ছে ঢাকার সিএনজি চালকেরা এদের আত্মীয়।

পুরো গ্রীষ্মকাল এখানে পর্যটক মৌসুম। বিশেষ করে জুন থেকে অগাস্ট। বেশিরভাগ হোটেলেরই ভাড়া আকাশ ছোঁয়া। ওয়েবসাইট ঘেঁটে কারতেরাদোস বিচে একটি হোটেল বুকিং দিয়েছিলাম। তুলনামূলক সস্তা। রিভিউতে মোটামুটি সবাই বলেছে হোটেলের লোকজন বেশ আন্তরিক।

ট্যাক্সি থেকে নামতেই একটি মেয়ে আর মধ্য বয়স্ক মহিলা এগিয়ে এলো। পরিচয় দিলাম। একটু বাদেই বয়স্ক একজন ভদ্রলোক এসে করমর্দন করলেন। বাবা-মা আর মেয়ে মিলে হোটেলটি চালাচ্ছেন; পারিবারিক ব্যবসা।

দুঃখ প্রকাশ করলেন প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্ত্বেও বিমানবন্দরে আনতে না যাওয়ার জন্য। একদম সাগরের ধার ঘেঁষে হোটেলটা। বারান্দার দরজা খুলতেই সমুদ্রের নোনা বাতাস এসে মুখে লাগল। সাথে ঢেউয়ের গর্জন।

দ্বীপে রাত্রি যাপন নতুন কিছু নয়। কিন্তু বরাবরই মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন  এই চিন্তাটা মাথায় আসলেই বুকটা কেমন হু হু করে উঠে।

সান্তরিনির প্রধান দুটি শহর- ফিরা আর ইয়া। ট্যাক্সি ছুটে চলেছে ফিরার দিকে। সকালের কড়া রোদ, তার উপর সাদা বাড়ি-ঘর স্মরণ করিয়ে দিল কেন সানগ্লাস আর মাথায় পড়ার হ্যাট এখানে জরুরি। উচ্চ মাত্রার সানস্ক্রিনও খুব জরুরি।

অসংখ্য সিঁড়ি, ক্যালডেরা, নীল ডোমের চার্চ আর সাদা সাদা বাড়ি সান্তরিনির মূল আকর্ষণ। ফিরার বাস স্টপে নেমে মনে হলো ঢাকার গুলিস্তানে আছি। এতো মানুষের ভিড়! যদিও সব বয়সী পর্যটকই আছে তবে তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশি। অনেকেই খুব ছোট বাচ্চা নিয়ে ঘুরছেন। এই কাঠ ফাটা রোদে কেউ প্র্যাম ঠেলে আবার কেউ বাচ্চাকে কাঁধের উপর নিয়ে ঘুরছেন।

শহরের পাদদেশ থেকে উপর পর্যন্ত ৫৮৮টা সিঁড়ি। যদিও বেশ নীচু তারপরেও এতোগুলো সিঁড়ি ভেঙ্গে উপরে ওঠা-নামা আমার কাছে মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের মতো ব্যাপার।

তবে কেউ চাইলে অন্য ভাবেও উঠতে পারেন। ট্রান্সপোর্টের জন্য গাধার ব্যবহার এখানে জনপ্রিয়। যদিও গাধার ব্যবহার নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে। অনেকেই মনে করেন এটা অমানবিক, নিষ্ঠুরতা। আমার কাছে অবশ্য নিজের নিরাপত্তাটাই বড় মনে হলো।

গাধাগুলো দেখতে বেশ রুগ্ন। এদের পিঠে চড়ে এতো উঁচুতে উঠা মোটেও নিরাপদ লাগছে না। আরেকটি উপায় হচ্ছে কেবল কার। মাত্র তিন মিনিটেই নামা বা উঠা সম্ভব। কিন্তু অনেক লম্বা লাইন।

অগত্যা নিজের পায়ের উপরই ভরসা। সিঁড়ি পথের দুই পাশে রকমারি দোকানপাট আর থাকার হোটেল আর ছোটবড় অসংখ্য রেস্তোরাঁ।

আবার ছুটলাম বাস স্টপের দিকে। পরবর্তী গন্তব্য ইয়া। একটু বিকেলের দিকে যাচ্ছি যেন সূর্যাস্তটা দেখতে পারি। শুধু সূর্যাস্ত দেখার জন্য আলাদা ট্যুরের ব্যবস্হা আছে।

সান্তরিনি সেইলরদের কাছে খুব জনপ্রিয়। সেইলিং করার জন্য নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। কেউ হেঁটে ঘুরে দেখতে চাইলে তারও বন্দোবস্ত আছে- গাইডেড ওয়াকিং ট্যুর। বাইকও ভাড়া পাওয়া যায়। আর আছে চার চাকার কোয়াড বাইক- অল টেরেইন ভেহিকেল, সংক্ষেপে এটিভি। এই বাহনটি উঠতি বয়সী পর্যটকদের খুব প্রিয়।

পাবলিক বাস সার্ভিসও বেশ ভাল। প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর অন্তর বাস চলছে এক শহর থেকে আরেক শহরে। ভাড়াও কম। বাসেও এতো ভিড় যে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া মুশকিল ছিল। সব যাত্রী ওঠানোর পর কন্ডাক্টর ভাড়া উঠানো শুরু করল। পাশ্চাত্যের কোনও দেশে যে এখনো বাসে এভাবে হেলপার থাকে জানা ছিল না।

বাস থেকে নেমে বুঝতে পারছিনা কোনদিকে যাব। আসা অবধি এই একটা জিনিসের অভাব বোধ করছি- পর্যাপ্ত দিক নির্দেশনার অভাব। বেশিরভাগ মানুষকে বামে যেতে দেখে আমিও তাদের পিছু নিলাম।

কবোলস্টোনে বাঁধানো সরু পথ, নীল ডোমের চার্চ , ক্যাসেলের ধ্বংসাবশেষ আর মিউজিয়াম – অনেকটা ফিরার মতোই, শুধু ভিড়টা একটু কম।

কেন আইল্যান্ডের সব বাড়ি-ঘর সাদা তার দুটো ব্যখ্যা প্রচলিত। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে গ্রিক আইল্যান্ডগুলোতে যুদ্ধবিগ্রহ আর কলেরা প্লেগের মহামারি দেখা দেয়। হোয়াইটওয়াশ ছিল দামে সস্তা এবং ভাল জীবানুরোধক। আর তাই এর ব্যবহার বাড়তে থাকে ব্যপকহারে।

দ্বিতীয় কারণটি অবশ্য রাজনৈতিক। ১৯৬৭-১৯৭৪ এই সময়টাতে গ্রিসের ক্ষমতায় ছিল সামরিক সরকার। রাজনৈতিক কারনে তারা নিয়ম করে দেয় যে বাড়ি হবে সাদা রঙের আর চার্চের ডোম হবে নীল রঙের। এই কম্বিনেশনটা গ্রিসের পতাকার সাথে মিলে যায়।

কারণ যাই হোক সাদা আর নীল রঙটাই হচ্ছে এখন সান্তরিনির ট্রেড মার্ক।

ছবিতে দেখা বিখ্যাত সেই তিন নীল গম্বুজের খোঁজে থাকলেও দেখা পাচ্ছিলাম না। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে লাভ হলো না। এতো অলিগলি আর সিঁড়ি সবকিছু গোলকধাঁধার মতো লাগছে। চারপাশের লোকজনকে দেখে মনে হলো মনের সুখে হেঁটে চলেছে, গন্তব্য অনির্ধারিত। আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ- রবি ঠাকুর কি সান্তরিনিতে এসে গানটি লিখেছিলেন?

হাঁটতে হাঁটতে দ্বীপের আরেক মাথায় চলে এসেছি। নীচে আমৌদি বিচ। ৩০০টা সিঁড়ি নামতে হবে নীচে পৌঁছতে হলে। উপর থেকেই সৌন্দর্য দেখে তৃপ্ত হওয়া ছাড়া আমার মতো অলস ভ্রমনকারীর আর কোন উপায় নেই এখানে।

গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার। তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি। তারপরেও মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম খাদের ধারে । দ্বীপের ভূপ্রকৃতি রুক্ষ, গাছপালা তেমন একটা নেই। ফুলের মধ্যে শুধু বোগেনভিলিয়ার ঝাড় চোখে পড়ে। কিন্তু আছে অদ্ভুত নীল সাগর আর অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট ক্যালডেরা। ইয়াতে সূর্যাস্ত দেখার জন্য শত শত পর্যটক ভিড় করে।

এখান থেকে ফিরাতে যাওয়ার শেষ বাস রাত সাড়ে এগারোটায়। পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা সরু রাস্তা আর সাংঘাতিক সব বাঁক । অন্ধকারে ওই পথে যাওয়ার কথা ভাবতেই ভয় লাগে। সূর্যাস্ত দেখার চিন্তা বাদ দিলাম তাই।

ফিরায় বাস থেকে নেমে আবার একই ট্যাক্সি বিড়ম্বনা। আমার মতোই বিপদে পড়েছে আরও কিছু যাত্রী। অস্ট্রেলিয়া থেকে ঘুরতে আসা এক মেয়ে তো রেগে আগুন। সে রীতিমত ঝগড়া করছে ড্রাইভারের সাথে।

আমি মাটিতে বসে পড়লাম, দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার শক্তি নেই। অবশেষে এক ট্যাক্সি চালক রাজি হলেন, কিন্তু ভাড়া বেশি দিতে হবে। যস্মিন দেশে যদাচার”- দ্বিতীয় চিন্তা না করে উঠে পড়লাম।

হোটেলের ব্যালকনিতে চা নিয়ে বসে আছি। এখানে সন্ধ্যাটা খুব অল্প সময় থাকে। সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কড়া রোদ। তারপরে সূর্যটা ঝুপ করে সাগরে নেমে পড়ে।

দামি হোটেলগুলোর বারান্দায় জাকুয্যি নামের ছোট এক ধরনের বাথটাব থাকে। গরম পানি প্রবাহের ব্যবস্হাও থাকে। জাকুয্যিতে গা ডুবিয়ে সূর্যাস্ত উপভোগ করা পর্যটকদের খুব পছন্দের।

সূর্যকে বিদায় জানিয়ে রুমে চলে এলাম।খুব ভালো ঘুম দরকার। আগামী কালের অভিযানে ক্লান্ত হওয়া চলবে না।


গ্রিক খাবারের নাম ডাক সারা বিশ্ব জুড়ে। বিশেষ করে দই আর ফেতা চিজ। দুপুরের খাবার খেলাম পিরগস শহরে, দোলমাদেস- ভাইন পাতার ভিতরে ভাত। মাছের দাম বেশি, কারণ এখানে মাছের দাম হয় ওজন হিসাবে।

পিরগস ছোট শহর। দু’একটা চার্চ ছাড়া আকর্ষণীয় তেমন কিছু চোখে পড়ল না। বাসে করে আবার ফিরায় চলে এলাম।

এটাই সান্তরিনির প্রধান শহর, সবসময় জমজমাট। কিছু বয়স্কলোক ওয়াকিং এইড ব্যবহার করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেছেন। দেখে খুব ভালো লাগল। আসলেই ভ্রমণটা বয়সের সীমারেখায় বাধা উচিৎ না।

নীচের ইজিয়ান সাগরের নীল পানিটা এখন কালচে দেখাচ্ছে। হাল্কা ঠাণ্ডা বাতাস। চারপাশের সবাই যেন ধ্যান মগ্ন। সূর্যকে পশ্চিমে যাত্রা শুরু করতে দেখে তাড়াতাড়ি কফি নিয়ে এক রেস্তোরাঁয় বসে গেলাম। আগামীকাল যাব আক্রোতিরি আর ইমেরোগভিলিতে। কিন্তু এখনকার সময়টা শুধু সূর্যাস্ত দেখার জন্য।