ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

টিপি ডেগ্রে সম্বন্ধে প্রথম জানতে পারি বেশ কয়েক বছর আগে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় একটি লেখা পড়ে। শিরোনাম ছিল- ‘বাস্তব জীবনের মোগলি’ যে আফ্রিকার বন্য জীবজন্তুর সাথে বড় হয়েছে। তার ভাই ছিল একটি হাতি, সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু লেপার্ড আর খেলার মাঠ ছিল আফ্রিকার ঝোপ-জঙ্গল।

টিপির জন্ম নামিবিয়ায়। বাবা মা দুজনেই ফরাসি, ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার। তার লেখা বই পড়ে আফ্রিকাকে জানার  স্বপ্নের শুরু। তারপর হঠাৎ করেই মিলে গেল তানজানিয়া যাওয়ার সুযোগ।

দার এস সালামের জুলিয়াস ন্যেরেরে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ইমিপ্রেশন যখন পার হলাম ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে গেছে মধ্যরাত। খুব সাদামাটা বিমানবন্দর।ট্যাক্সি নিয়ে নিরাপদেই হোটেলে পৌঁছালাম। রিসেপশনের লোকগুলো বেশ আন্তরিক। ২৪ ঘন্টার উপরে জেগে আছি জেনে ওরাই পরামর্শ দিল- নাস্তা সার্ভ করতে আর ঘন্টাখানেক বাকি, তাই ব্রেকফাস্ট সেরে একেবারে রেস্ট নেওয়া ভাল।

ব্রেকফাস্টের আয়োজন দেখে মনে হলো মহাযজ্ঞ। খাবারে ভারতীয় ঘরানার আধিক্য। এমন কি পরোটা ডাল পর্যন্ত আছে। হোটেলের প্রধান কর্মকর্তাও এশিয়ান।তার কাছ থেকে দার এস সালামের ঘোরাঘুরির টিপস নিলাম।

পাবলিক ট্রান্সপোর্টের অবস্হা ভাল না। ঘুরতে চাইলে ট্যাক্সি নেওয়াই নাকি উত্তম। হোটেল থেকেই ব্যবস্হা করে দেবে। ভরপেট খাবার আর দীর্ঘ যাত্রাপথের ক্লান্তি আমাকে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ঘুমের মহাদেশে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মাথায় বেজে চলেছে ভূপেন হাজারিকার গান- ‘কৃষ্ণকায়া আফ্রিকা মোর কৃষ্ণকলি মা’।

ড্রাইভার ওয়াগা অমায়িক, ইংরেজিও ভালো বলে। শহরের মূল আকর্ষণগুলো দেখানোর দায়িত্ব ওয়াগার হাতেই ছেড়ে দিলাম। রাস্তার দুপাশের দোকানগুলো আমাদের জেলা শহরের মূল বাজারের কথা মনে করিয়ে দেয়। রকমারি প্লাস্টিকের পণ্যের সমাহার। রাস্তাঘাটও আমাদের মতোই ধূলায় ধূসরিত। গাড়ি এসে থামল ভিলেজ মিউজিয়ামের  সামনে। ওপেন এয়ার মিউজিয়ামের ধারণাটা আমার খুব ভালো লাগে। জীবনে প্রথম এ ধরনের জাদুঘর দেখেছি নরওয়েতে- নরস্ক ফোলকে মিউজিয়াম।

তানজানিয়াতে প্রায় একশ বিশটি গোত্র আছে, এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি-  মাসাই, চাগা, সুকুমা, মাকুন্দে, হাদজাবে। প্রতিটি গোত্রেরই নিজস্ব সংস্কৃতি, জীবন ধারণ এমনকি ঘর বানানোর ধরনও আলাদা। বিশাল এলাকা জুড়ে জাদুঘরটিতে বিভিন্ন গোত্রের বাড়ি-ঘরের রেপ্লিকা  তৈরি করা। প্রতিটা ঘরের সামনে সেই গোত্রের পরিচিতিমূলক বর্ণনা দেওয়া আছে।

প্রচুর পোকামাকড় এখানে। ভুলেই গিয়েছিলাম এসব স্হানে গাঢ় বা কালো রঙের পোশাক পরতে নেই। সিসি মাছি আকর্ষিত হয়।

হস্তশিল্পের মার্কেট ঘুরিয়ে ওয়াগা নিয়ে চলল ‘স্লিপওয়ে’ শপিং সেন্টার।‘মাসানিবে’ এর তীর ঘেঁষা মার্কেটটিতে আছে অনেক খাবারের দোকান, বাচ্চাদের খেলার জায়গা। পর্যটকরা এখানে বসে ইন্ডিয়ান সাগরের বুকে সূর্যাস্ত উপভোগ করে।

আমি এক প্লেট ‘বিফপিলাও’ নিয়ে বসে পড়লাম। স্বাদ একদম তেহারির মতো। খাওয়া শেষে অর্ডার দিলাম এক কাপ  ‘মাসালা  চা’।

ওয়াগার খুব ইচ্ছা আমাকে আরও কিছু জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবে। কিন্তু আমার আবার হোটেলে ফেরার তাড়া। খুব ভোরে সেরেঙ্গেতির ফ্লাইট ধরতে হবে।

ভোর ৪টায় ওয়াগাই নামিয়ে দিয়ে গেল ডমেস্টিক এয়ারপোর্টের সামনে। মনে হচ্ছে দেশের ছোট কোনো ট্রেন স্টেশন। সেসনা প্লেনে এই প্রথম ভ্রমণ করছি।সাইজ দেখে দুশ্চিন্তার মাত্রা বেড়ে গেছে- এতো খেলনা বিমান।  মোটমাট আমরা পাঁচজন যাত্রী। যদিও ধারণ ক্ষমতা বারো জনের। ভেতরে জায়গা এতো কম যে, মোটামুটি নিজের ঘাড় মচকে, এর পা মাড়িয়ে, ওকে কুনুইয়ের গুতো দিয়ে সিটে এসে বসলাম।

পঁয়ত্রিশ মিনিট পরে নির্বিঘ্নেই পৌঁছলাম জানজিবারে। উপর থেকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কেন হলিডে মেকারদের  কাছে এতো প্রিয় এই দ্বীপ। সাগরের স্বচ্ছ নীল পানি যেন কবির ভাষায় স্ফটিকজল।

আমি বাদে বাকি যাত্রীরা নেমে গেল। পাইলট দুজন রানওয়েতে দাঁড়িয়ে গল্প করছেন। অপেক্ষা করছেন পরবর্তী পাইলটের জন্য যে বিমানটিকে উড়িয়ে নিয়ে যাবেন সেরোনেরাতে। আমিও নেমে যোগ দিলাম। দুজনই বেশ হাসিখুশি। জিজ্ঞেস করলাম- প্লেনের কোন অংশে কম ঝাঁকুনি লাগে? হেসে উওর দিল-অবশ্যই সামনের অংশে, আর এজন্যেই বিজনেস ক্লাস প্লেনের সামনের দিকে থাকে।

বেশ কিছু যাত্রী উঠল এবার। এখানে সিট নির্ধারিত না। তাই তাড়াতাড়ি সামনের সিটে এসে বসলাম, এক্কেবারে পাইলটের ঘাড়ের পিছনে।

পাইলটের সাথে পরিচয় পর্ব শেষ হয়েছে। নাম স্টিভ, বড় হয়েছেন তানজানিয়ায়, বাপ দাদা আমেরিকার কলোরাডোর।

যাত্রীদের মধ্যে একজন বয়স্ক মেটেরিওলজিস্ট আছেন, আয়ারল্যান্ডের বাসিন্দা।এসেছেন ৩.২ বিলিয়ন বছরের জীবাশ্ম লুসির পায়ের ছাপ দেখবেন বলে। তাকে দেখে বুঝলাম অ্যাডভেন্চারের জন্য মনের বয়সটাই আসল। প্লেন এসে পৌঁছলো আরুশাতে। কিলিমান্জারো পর্বতে উঠতে হয় এখান থেকেই।

আবার যাত্রা শুরু হলো। পরের যাত্রা বিরতি কিলিতে। যখন টিকেট কিনেছিলাম তখন বলা হয়নি এতোগুলো স্টপ। স্টিভ বলল- ‘তোমার দূর্ভাগ্য। সচরাচর আমরা এত জায়গায় থামি না। কিন্তু আজকে যাত্রীর খুব চাপ’।

স্টিভ অনর্গল স্হানীয় ভাষা সোয়াহিলি বলছে। নিজেই যাত্রীদের জন্য দরজা খুলে দিচ্ছে। মালামাল টেনে বের করছে।

প্লেন মানিয়ারা হয়ে গ্রোমেটির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। আরুশা পর্যন্ত রানওয়েগুলো পিচঢালা, তারপর সব মাটির। খাড়া পাহাড়ের উপর ছোট্ট মাটির রানওয়ে।

স্টিভ রানওয়ে মিস করল। মনে হলো আমিও একটা হার্টবিট মিস করলাম।খুব দক্ষতার সাথে দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় ল্যান্ড করালো। নাহ, এই লোকের এলেম আছে।

পরের স্টপটি সেরোনেরা- আমার নামার পালা। শেষের দিকে ফ্লাইটটা খুব বাম্পি ছিল, শেষ রক্ষা হলো না, নেমেই শুরু হলো বমি।

হোটেল থেকে নিতে এসেছে, জিপ ছুটে চলেছে মাটির পথ ধরে। ড্রাইভার সাহেব গাইড হিসাবে  পুরো পথ বিভিন্ন বিভিন্ন প্রাণি আর পাখি পর্যন্ত দেখাতে দেখাতে নিয়ে চললেন। সেরেঙ্গেতি ন্যাশনাল পার্ককে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম  সপ্তাশ্চর্য।

হোটেলের কর্মচারী সবাই বেশ আন্তরিক। নিয়মকানুন বলে দিল-যেহেতু এই লজটা ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে, তাই চারপাশে কোনো দেয়াল নেই। অন্য কোনো জন্তু তেমন না ঘেঁষলেও বুনো ষাঁড় হরহামেশাই চলে আসে। তাই নির্দিষ্ট একটা সীমানার বাইরে যাওয়া বারণ।

খাবারের জায়গাটা মূল থাকার স্হান থেকে একটু দূরে। ম্যানেজার পইপই করে বলে দিলেন, রাতে যেন একা খেতে বের না হই। ফোন করলে ওদের গার্ড এসে এসকর্ট করে নিয়ে যাবে।


লজের সামনে আমি

থাকার ঘরগুলো অদ্ভুত সুন্দর। বাইরে থেকে দেখতে অনেকটা ছনের ঘরের মতো, কিন্তু ভেতরে পাঁচতারা হোটেলের সুবন্দোবস্তো। আমার রুমটা দোতালায়।বারান্দার দরজা খুলে যেন রূপকথার রাজ্যে প্রবেশ করলাম। যত দূর চোখ যায় শুধু বিস্তীর্ন ঘাসের প্রান্তর যাকে বলে ‘সাভানা’। দূরের আবছা পাহাড় সৌন্দর্য্যকে দিয়েছে পূর্ণতা। সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে যাওয়ার সময় কর্মচারীটি সাবধান করে গেল-সন্ধ্যার পর বারান্দার দরজাটা যেন খোলা না রাখি, বেবুন চলে আসতে পারে।

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়তে হলো। আজকে গেইম ড্রাইভ সাফারিতে যাবো। ড্রাইভার কাম গাইড গডসান ভীষণ চটপটে। হোটেল থেকে দুপুরের লাঞ্চ প্যাক দিয়ে দিয়েছে।

কিছুদূর আসতেই মনে পড়ল বাইনোকিউলার রেখে এসেছি। এ যন্ত্রটি ছাড়া সাফারিতে যাওয়া বৃথা। গডসান তার বাইনোকিউলারটি সানন্দে এগিয়ে দিল।এইলোকের দৃষ্টিশক্তি এতোটাই প্রখর, বাইনোকিউলার দিয়ে দূরের যে জন্তু দেখতে কষ্ট হয় তা সে খালি চোখেই সবার আগে চিহ্নিত করে ফেলে।

রোদ তেতে উঠেছে। এতো কাছ থেকে খোলা প্রান্তরে চিরিয়াখানার জীবজন্তু দেখতে পেয়ে এড্রেনালিন রাশে কারণে রোদ বা পোকামাকড়ের উৎপাত কোনো কিছুই টের পাচ্ছি না। সৌভাগ্যবশত আফ্রিকার ‘বিগফাইভ’- সিংহ, লেপার্ড, রাইনো, হাতি আর কেইপ বাফেলার দর্শন পেলাম।

সাফারির গাড়িতে চলতে চলতে ক্যামেরায় আটকে ফেললাম দৃশ্যটা

ফিরতি পথে দেখা মিলল একজোড়া চিতার। মাইগ্রেশনের মৌসুম না হওয়াতে উইল্ডেবিস্ট দেখা হলো না। গডসানের কাছ থেকে জানলাম সিংহ আছে বলে তানজানিয়ায় গরিলা নেই।

 


সাফারির গাড়ি থেকে টেলিফটো লেন্স দিয়ে তোলা

সন্ধ্যা নেমে এসেছে,হোটেলের পথ ধরল জিপ। পরদিন সকালে বেলুন সাফারির পর গরঙগরো ক্রেটার আর মাসাইদের গ্রাম দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।

সারাদিনের উত্তেজনা আর ঘোরাঘুরির ধকলে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি বলতে পারব না। হঠাৎ গুলির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। রিসেপশনে মেয়েটি ফোনে জানাল ভয়ের কিছু নেই। বুনো ষাঁড়ের  আক্রমণ হয়েছে, রেন্জাররা ফাঁকা গুলি ছুড়ে তাড়াচ্ছে।

বারান্দার কাঁচের দরজার পর্দা সরাতেই এক অপার্থিব দৃশ্য-রাতের কালো আকাশ জুড়ে লক্ষ তারার ঝিকিমিকি। যেন মণিমুক্তা খচিত কালো  চাদর ঝুলছে। নীচের উপত্যকার দূরের ঝোপঝাড় আর গাছপালাতে অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। আফ্রিকার রাত আসলেই রহস্যময়।


ভিলেজ ম্যুজিয়ামে স্থানীয়দের সাথে

একদিনেই কেমন মায়া পড়ে গেছে। আমাদের মতোই এখানকার মানুষগুলো সবাইকে আপন করে নেয়। গায়ের বর্ণ আর ভাষাটাই যা আলাদা। তাছাড়া সবকিছুতেই আমাদের সাথে তানজানিয়ানদের অনেক মিল। ভূপেন হাজারিকার গানটা আবার গুন গুন করে উঠি।

মন্তব্য ০ পঠিত