ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

আমি বাঙ্গালী। আমার স্বভাব কারো কাছে ঋণী না থাকা। সামর্থ্য অনুযায়ী ঋণ শোধ করতে গিয়ে যার জন্য যা উচিত-প্রাপ্য তাকে তা দিতে কার্পণ্য বোধ না করা। কারো কাছ থেকে উচিত-প্রাপ্য নিতেও কার্পণ্যবোধ না করা। বাঙ্গালী জাতি এক-দুই শত বছরের নয়। বহু আগের। তার প্রমান চর্যাপদ। তার আগেও বাঙ্গালী ছিলাম। তবে বাঙ্গালী হিসাবে আমার জনজীবনযাত্রা অন্তত দেড় হাজার বছরের অনুশীলন, গ্রহণ বর্জন ও রুপান্তরের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। বাঙ্গালী হিসাবে আমাকে নিজেস্ব বর্ণে-ভাষায়-সাহিত্যে-দর্শনে-মননে-মাননে-কলা-কৌশলে প্রতিষ্ঠিত এবং স্বীকৃত করেছে চর্যাপদ। ইতিহাস বিশ্লেষণ করে আমি যে বাঙ্গালী আমার এই জাতিবোধের জন্ম আনুষ্ঠানিক ভাবে চর্যাপদ থেকেই। চর্যাপদের শুরু এবং অধিকাংশ পদ রচিত ধর্মপালের শাসন ব্যবস্থায়। সেই হিসাবে আমি বাঙ্গালী আমার জাতীয়তাবোধের প্রথম আনুষ্ঠানিক স্রষ্টা ধর্মপাল। যিনি ছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাঙ্গালী রাজা (অষ্টম শতকের শেষ দিকে)। যার শাসন আমল ভারতবর্ষের অনেক এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সব কিছুর সূক্ষ্র বিশ্লেষণে আমার ধর্মপালকে বাঙ্গালী জাতির আদি পিতা হিসাবে সন্মান করতে ইচ্ছা করে। করিও অ-আনুষ্ঠানিক ভাবে কারণ আমি যে বাঙ্গালী।

আমি বাঙ্গালী। তাই শেখ মজিবুর রহমানের ত্যাগ এবং অবদানকে বিনম্র ভাবে সন্মান করি। সেই সন্মানও পিতার সন্মান। শেখ মজিবুর রহমানই সর্বকালের সর্বশেষ্ট বাঙ্গালী এবং সর্বশেষ্ট পিতা। যার প্রচেষ্টায় এবং প্রত্যক্ষ আনুষ্ঠানিকতায় আমি বাঙ্গালী আজ বিশ্বস্বীকৃত। আমি আরও বিশ্বাস করি জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমানের জন্ম না হলে বাঙ্গালী স্বাধীন সার্বভৌমত্ত রাষ্ট্র পেত না।

আমি বাঙ্গালী। আমার স্বভাব কারো কাছে ঋণী না থাকা। সামর্থ্য অনুযায়ী ঋণ শোধ করতে গিয়ে যার জন্য যা উচিত-প্রাপ্য তাকে তা দিতে কার্পণ্য বোধ না করা। কারো কাছ থেকে উচিত-প্রাপ্য নিতেও কার্পণ্যবোধ না করা। আমি স্বাধীন। আমার স্বাধীনতায় অন্য দেশের প্রত্যেক্ষ অবদান আছে এটা সত্য। এটা স্বীকার করি। তাই তাদের অকৃত্রিম বন্ধু ভাবি। তাদের প্রাপ্য সন্মান দিতে আমি কার্পণ্য বোধ কোন কালেই করিনি এবং করবো না। তার মানে এই না যে আমি আমার অধিকার প্রতিষ্টা করবো না! আমিতো উচিত-প্রাপ্য নিতেও কার্পণ্যবোধ করিনা।

আমি বাঙ্গালী বহু আগে থেকেই স্বাধীন। নয়তো বিদ্রোহী বীর। ইতিহাস তাই বলে। ভাগীরথী-পদ্মা-মেঘনা-যুমনা অববাহিকায় আমি আর্য সভ্যতার আগে থেকে স্বাধীন এবং সভ্য ছিলাম। বলেই এই অঞ্চলে আমার উপরে আর্যরা তাদের প্রভুত্ব বিস্তার করতে পেরেছিলনা। বলেই তাদের দৃষ্টিতে আমি বাঙ্গালী আমি অনার্য আমি অশূর ছিলাম। দীর্ঘ নাটকীয়তার পর বাংলায় আর্য ভাষা এবং সাংস্কৃতি দৃঢ হয়েছিল বটে খ্রীষ্টিয় চতুর্থ এবং পঞ্চম শতাব্দীতে গুপ্ত যুগে। তাও মাত্র কিছু সময়ের জন্য। তারপর রাজা শশাংক এর আমলে আমি প্রথম স্বাধীন সার্বভৌমত্তের সাধ পেলাম। তারপর পাল যুগ থেকে আমি আমাকে পুনুরায় প্রতিষ্টিত করতে লাগলাম আমার নিজেস্ব স্বকীয়তায়। আমি আমাকে ধারণ করতে লাগলাম স্বকীয় বর্ণে-ভাষায়-সাহিত্যে-দর্শনে-মননে-মাননে-কলা-কৌশলে। আমায় বাঙ্গালী স্বকীয়তায় প্রতিষ্ঠিত এবং স্বীকৃত করল চর্যাপদ। আমার স্বাধীনতা গৃীক বীর আলেকজান্ডারও হরণ করতে পেরেছিলনা। আমি বাঙ্গালী আমি বহু আগে থেকেই স্বাধীন। নয়তো বিদ্রোহী বীর। বিদ্রোহী এবং বীরের মতই মৃত্যুকে হাসি মুখে বরণ করেছিলাম বহুবার। তবু আমি পরাধীনতার কাছে নত স্বীকার করে ছিলাম না। আমি বিদ্রোহ করেছিলাম মোঘলদের বিরুদ্ধে। আমি বিদ্রোহ করেছিলাম ইংরেজদের বিরুদ্ধে। আমি বিদ্রোহ করেছিলাম সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে। আমি বিদ্রোহ করেছিলাম বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে। আমি বিদ্রোহ করেছি বঙ্গভঙ্গে। আমি বিদ্রোহ করেছি ৫২ সালে। আমি বিদ্রোহ করেছি ৭১ সালে। আমি পরাধীনতার সকল শৃঙ্খল ভেঙ্গেছি। স্বাধীন হয়েছি। বিশ্ব মানচিত্রে নিজের মাথা উন্নত করেছি। স্বাধীনতা পরর্বতীতেও আমি বিদ্রোহী। আমি বিদ্রোহী কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। আমি বিদ্রোহী সাম্প্রদায়ীকতার বিরুদ্ধে। আমি বিদ্রোহী কুসংস্কারের বিরুদ্ধে……………।

আমি বাংলাদেশ। আমি স্বাধীন এবং স্বদেশীয় বাঙ্গালী। আমার জয়ে বাঙ্গালীর জয় হয়। বিশ্ব দরবারে বাঙ্গালীর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আমি যখন ভিনদেশী বাঙ্গালী। আমার জয়ে তখন অন্য কোন ভিনদেশের জয় হয়।

আমি নিজেকে সব সময় স্বাধীন স্বদেশীয় বাঙ্গালী ভাবতে চাই। বর্ণ-ভাষা আবেগ-অনুভূতি আচার-আচারণ প্রথা-নিয়ম সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং জাতীয়তাবোধ সব কিছুতে আমি এক। তারপরেও আলাদা ভিনদেশীয় জাতীয়তাবাদের একটা ক্ষুদ্র অংশ হিসাবে নিজের বৃহত্তর অংশকে ভিনদেশী করে রেখেছি। আমি বাঙ্গালী, এই ক্ষেত্রেই আমার সব চেয়ে বড় অজ্ঞতা। সবচেয়ে বড় বার্থ্যতা। আমার কপালে এই অজ্ঞতা এবং বার্থ্যতার কুলুপ বা তিলক আঁটে দিয়েছিল আমার ধর্মীয় গোঁড়ামী। আমার উগ্র গোঁড়া ধর্মীয় বিশ্বাস আমাকে ভিন্ন ধর্মাবলীদের, ভিন্ন মানবিক মতবাদীদের আকর্ষণ করার চেয়ে বিকর্ষণ করেছিল। কিন্তু আমি আমার এই অজ্ঞতা এবং বার্থ্যতার দায় ভার নিয়ে চরম লজ্জিত। আমি ভিনদেশী বাঙ্গালীতে সন্তষ্ট থাকতে পারিনা। নানা চূড়ায় উতরায় পেরিয়ে আমার ধর্মীয় বিশ্বাস এখন অনেক নমনীয় এবং উদার। যে নমনীয়তা, যে উদারতা আমাকে সকল ধর্ম এবং সকল মানবিক মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলছে। সুদর ভবিষতে আমি বাঙ্গালী সকল অজ্ঞতা সকল বার্থ্যতার দায়ভার ঝেড়ে ফেলে শুধুই মানবতার জয়ে গাইবো শুধু বিশ্বজয়ের গান। এমন স্বপ্ন দেখতেই পারি। এমন স্বপ্ন দেখার অধিকার আমার আছে। এমন স্বপ্ন দেখে আমি তৃপ্ত হতেই পারি এবং তৃপ্ত হওয়ার অধিকারও আমার আছে। জয় বাংলা। বিশ্ব বাংলা।

-মশিউর রহমান
(আমার নিজেস্ব মত। আমার নিজেস্ব বিশ্বাস। এই জন্য কেউ দায়ী নয়।)