ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

revolution

জগতের কোন কিছুই স্থির নয়। নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে শুরু করে সৌরজগত এবং তার প্রতিটা গ্রহ সবাই ছুটছে নিজ নিজ সীমানায়। ছুটছে পৃথিবী। ছুটছে তার প্রাণীজগৎ ও বস্তুজগৎ। এক কথায় সবাই ছুটছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে অনন্তের পথে।

জগতের অন্য সবকিছুর মতই ছুটছি আমরা মানব সম্প্রদায় এবং তার সাথে ছুটছে আমাদের  চিন্তা-ভাবনা ও কল্পনা শক্তি। এই চিন্তা-ভাবনা এবং কল্পনা শক্তির উপরে ভর করেই আমরা সেই আদিম তুষার অন্ধকার যুগ থেকে ধাপে ধাপে বর্তমানের এই ঝলমলে আধুনিক ডিজিটাল যুগে এসেছি এবং আরও সামনের দিকে ছুটে চলছি। আমাদের চিন্তা-ভাবনা এবং কল্পনা শক্তির উপর ভর করেই এগিয়ে যাচ্ছে দর্শন, অর্থনীতি, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, টেকনোলজি তথা সব কিছু । সেই সাথে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষের অপরাধ করার মানসিকতা। বাড়ছে অপরাধের নতুন নতুন কৌশল।

একবিংশ শতাব্দীতে মানব সম্প্রদায়ের চাওয়া-পাওয়া গুলির হিসাব করলে দেখা যায় যে, আমাদের চাওয়া-পাওয়াগুলি সেই হিংস্র আদিম যুগের মতই। আমরা এগিয়ে গেছি সত্য, সেটা কেবল বহিরঙ্গে বা বাহ্যিক ভাবে। কিন্তু আমাদের আত্মিক বা মননের কোন পরিবর্তন হয়নি। আগে মানুষ গাছতলায়, গুহায় বসবাস করত। এখন নগর, মহানগর এবং মেগাসিটি তৈরি করে আধুনিক জীবন যাপন করছে। পরিবর্তন শুধু এই বাহ্যিক ভাবে কিন্তু আমাদের চাওয়া-পাওয়া গুলি আগের মতই, কোন পরিবর্তন হয়নি! আগে আমরা পায়ে হেটে বা ঘোড়ায় চড়ে দেশে দেশে ঘুরতাম; সেখানে এখন বিজ্ঞান দিয়েছে উড়োজাহাজ, মটরগাড়ি, ট্রেন ইত্যাদি। পরির্বতন শুধু এইটুকুই।

আমাদের চাওয়া-পাওয়া আগের মত, একই আছে! আমরা নিজেদের স্বার্থে আগেও খুন করতাম এখনও করি। বরং এখন আরও সহজে এবং ভয়ঙ্কর ভাবে করি।

আগে মানুষ লালমাটি-পোড়ামাটি, ছাই দিয়ে নিজেদের হাত পা মুখমণ্ডল পরিষ্কার করতাম। এখন সাবান, ফেইস-ওয়াশ, শ্যাম্পু দিয়ে পরিষ্কার করি। নানা প্রসাধনী দিয়ে নিজেকে সাজাই। কিন্তু আমাদের মনের চিত্র আগের মতই। কোন পরির্বতন হয়নি। আর হয়নি বলেই সারা বিশ্বে চলছে নানা অপরাধ, নানা জুলুম এবং নানা রকমের হত্যাকাণ্ড। ঘটছে নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনাবলি। সারা বিশ্বে হত্যা, ছিনতাই, লুটপাট, গুম, ধর্ষণ এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এমন কোন অপরাধ নাই যা আদিম বিশ্বে ঘটেছে আর এখন আধুনিক বিশ্বে ঘটছেনা। বরং এখন নতুন নতুন কৌশলে আরও বেশি ঘটছে। আগেও চুরি হতো, এখনও হচ্ছে। আগেও যুদ্ধ হতো, এখনও হচ্ছে। বরং আগে যুদ্ধে মরত শুধু যোদ্ধারা আর এখন সাধারণ মানুষই বেশি মরে। আগে মানুষের বড় শত্রু ছিল প্রকৃতি ও প্রানীকুল কিন্তু এখন মানুষের বড় শত্রু মানুষই ।

দেশের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, এমন কোন শ্রেণী নাই যারা অপরাধ করছেনা। যে যার ইচ্ছামত নিজের নিয়মে অনিয়ম করছে। অনিয়ম করায় নিয়ম। আইন সংবিধানের পাতায় শুধু ধারা বদ্ধ। যা এখন গুটি কতক সমাজপতিদের দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে অনরবত।

বাংলাদেশের এমন কোন সরকারী আধা-সরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাই যেটা দূর্নীতিগ্রস্থ নয়। এখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইমারি স্কুল সর্বত্র চলছে শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য।চার-পাঁচ লক্ষ টাকা ডোনেশান না দিলে প্রাইমারি শিক্ষকও হওয়া যায়না। তাছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-ছাত্রদের নানা অপকর্ম-তো আছেই। শিক্ষক ছাত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক করে আবার ভিডিও প্রকাশ করে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে।পরীক্ষার সময় নকলের যোগান দেয়। প্রাইভেট টিউশানিতে ব্যস্ত থকে। ছাত্র কলমের ব্যবহার যতখানি করে তার চেয়ে বেশি করে চাপাতি, রামদা, পিস্তল, শটগান এবং অন্যান্য অস্ত্রের ব্যবহার ।

রাজনীতিবিদদের কথা না বলায় ভালো। শব্দভাণ্ডারে এমন কোন কুৎসিত বা কদাকার শব্দ নাই যা তাদের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়নি বা হচ্ছেনা।

পুলিশ যাদের অপকর্মের কথা বলে শেষ করা যাবেনা । চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে এমন কোন অপকর্ম নাই যা আমাদের দেশের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা হয়না। এখন পুলিশ আর অপরাধীর সখ্যতা দেখলে মনে হয় পুলিশ সাধারণ জনগণের না। তারা অপরাধীদের মাসতুত ভাই আর রাজনীতিবিদের সন্তান। ইদানীং র‌্যাবও কম না!

বিভিন্ন ধর্মশালাগুলি এখন এক একটা আড্ডাশালা বা সমালোচনার কেন্দ্রস্থল। ধার্মিকের বেশে অধর্ম নিয়ে ব্যস্ত আমরা সবাই। ধর্ম এখন শুধু ধর্মগ্রন্থতে চুমা চামি আর তোতা পাখির মত পতপত করে পাঠ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাস্তব জীবনে যার কোন প্রয়োগ নাই।

ওকালতি একটি সম্মানজনক পেশা।যাদের উপরে সমাজের অনেক গুরুদায়িত্ব থাকে।যারা তাদের মহান পেশার দ্বারা অন্যায় অনিয়মকে নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ বর্তমানে উকিল, যারা টাকার বিনিময়ে তিলকে তাল আর তালকে তিল বানাতে পারে। আজ বিচার ব্যবস্থার চিত্র উল্টা। উকিলদের কারণে টাকা ওয়ালাদের পকেটের মধ্যে থাকে বিচার ব্যবস্থা শুধু উকিল কেন বিচারকরাও কম না। ফলে অন্যায়কারী অন্যায়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে বেশি বেশি। আজ সাধারণ মানুষ কোর্টের নাম শুনলে ভয় পায়।পুলিশ ছুলে আঠারো ঘা কিন্তু উকিল ছুলে, কত ঘা যে খেতে হয় তা কেবল সেই জানে, যে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কোর্ট গ্রাউন্ডে বাদী বা বিবাদী হিসাবে একবার পা রেখেছে।

ডাক্তার, যাদের সব সমাজে সকল পেশার উপরে স্থান দেওয়া হয়। কোন কোন সমাজ ব্যবস্থায় ঈশ্বরের আর এক রূপ হিসাবে ধরা হয়। অথচ ডাক্তার মানে বর্তমানে এক একটা বাটপার। কসায়ের মত রুগী বা রুগিনীদের সাথে টাকার চুক্তি করে তার পরে চিকিৎসা সেবা দেয়। এমনও দেখা যায়, গর্ভবতী মায়ের পেটে যমজ বাচ্চা, একটি সিজার করে বের করে এবং অন্যটির জন্য নতুন করে চুক্তিবদ্ধ হয়। না হলে অপারেশন বন্ধ। ফলাফল মা ও অন্য সন্তানের মৃত্যু। মহান ব্রত ভুলে এই রকম জীবন-মৃত্যু নিয়ে বাণিজ্য করে বর্তমানের ডাক্তাররা।

ব্যবসা একটি মধ্যস্থতাকারী মহৎ পেশা। লাভের বিনিময়ে উৎপাদিত পণ্য বা সেবা, উৎপাদকের নিকট থেকে ভোক্তাদের নিকট পৌঁছানোর মত মহৎ কাজ করেন ব্যবসায়ীরা।কিন্তু নানা অনিয়ম, দুর্নীতিতে আটকে গেছে ব্যবসায়ী সমাজ।নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে হীন কৌশলে তারা ভ্যাজাল দ্রব্য পরিবেশন করছেন ভোক্তাদের কাছে। ফরমালিন এখন মরা লাশের বদলে ফলমূলে, সবজিতে, মাছ-মাংসে মিশে থাকে। এই হল ব্যবসায়ীদের চিন্তা চেতনার উন্নয়ন! চান্স পেলেই দ্রব্য মূল্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।

নিয়ম এখন প্রতি পদে পদে ধর্ষিত হচ্ছে আমাদের দ্বারা। আমরা ধর্ষণ করছি অনবরত। আমাদের চারপাশের পরিবেশ, সামাজিকতা, সমাজব্যবস্থাকে। পিতামাতা খুন হয় সন্তানের দ্বারা। সন্তান খুন হয় পিতামাতার দ্বারা। আঁতুড় ঘরের সন্তানকে ফেলে দেওয়া হয় ডাস্টবিনে। বেশি লাভের আশায় ৬ তলার যায়গাতে তৈরি হয় ১২ তলা । বিল্ডিং ধসে হাজার হাজার মানুষ মরে । বেশী লাভের আশায় হাজার হাজার মানুষ পুড়ে মরে। যায়গা দখলের উদ্দেশ্যে দখলদারদের আগুনে ঘুমন্ত মানুষরা পুড়ে মরে। কোটি টাকার লোভে খুনের উৎসব হয়। আবার মহান সংসদের হর্তা-কর্তারা খুনিদের, গডফাদারদের সাফায় গায়। ভোট কেন্দ্র দখল না করতে পেরে হুমকি ধুমকি মারে। ব্যাংক জালিয়াতি করে, জনগণের টাকা মেরে, কোটি কোটি টাকার পাহাড় বিদেশে পাচার করে ।

জগতে দুই জাত। ভালো এবং মন্দ। কোন কালেই পৃথিবীর সকল মানুষ ভালো ছিলনা আর ভালো হয়ে যাবেও না। আর কেউ যদি ভাবে, সবাই ভালো হয়ে যাবে তাহলে সে ভুল করবে। ভালো-খারাপ মিলেই পৃথিবী। ভালোরা ভালো কাজ করে এবং করবে। খারাপরা খারাপ কাজ করার চেষ্টা করবে এবং সুযোগ পেলেই করবে। তাই তাদের সুযোগ দেওয়া যাবেনা, খারাপ বা মন্দ কাজ করার। সেই জন্য যুগোপযোগী আইনের সৃষ্টি করতে হবে। শুধু সৃষ্টি করলে হবেনা তার সঠিক ব্যবহার বা প্রয়োগ থাকতে হবে। দু:খের বিষয় আমাদের দেশে আইন আছে, বিশিষ্ট আইনবিদ আছে, আইন প্রণেতাও আছে কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগ নাই। তাই মন্দরা উল্লাস করে মন্দ বা অপরাধমূলক কাজ ঘটাচ্ছে। আর সর্বত্র নিষ্পেষিত হচ্ছে নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষ। কিন্তু আর কত?

পরির্বতন আনতে হবে সমাজ ব্যবস্থার। শুধু মুখে বললে হবেনা আগে নিজেকে বদলাতে হবে তার পর অন্যকে বদলানোর কথা বলতে হবে। তা না হলে “বদলে যাও, বদলে দাও” শ্লোগান শুধু শ্লোগানই হয়ে থাকবে আর কিছু দিন পর পর জাতির কাছে মাফ চাইতে হবে!

নিয়ম এখন অনিয়মের চোরাবালিতে ধীরে ধীরে তলায়ে যাচ্ছে।নিয়মকে টেনে তুলে আনতে হবে আর এই জন্য বিপ্লব দরকার। কোন সশস্ত্র বিপ্লব নয়, দরকার নীরব বিপ্লব। সশস্ত্র বিপ্লব দিয়ে এক পক্ষকে মেরে ফেলার মধ্যে কোন বাহাদুরি নাই। বেঁচে থাকার অধিকার ভালো-মন্দ সবার আছে। কিন্তু মন্দদের নিয়ন্ত্রিত বা শৃঙ্খলিত করে রাখতে হবে। যাতে মন্দ ভালোর উপরে প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে। তাই বিল্পব দরকার আমাদের চিন্তায়, বিপ্লব দরকার আমাদের চেতনায়, বিপ্লব দরকার আমাদের মননে এবং মানসিকতায়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হউক সমাজের প্রতিটি শাখায়। “ শুদ্ধ হউক বাঙলা, শুদ্ধ হউক পৃথিবী।”

-মশিউর রহমান