ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

অনেকের মতো আমিও মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, জগতে মানব সম্প্রদায় এক জাত। পৃথিবীর সকল মানুষই আনন্দে সুখবোধ করে, বিজয়ে উল্লাস করে আবার দু:খের কারণে কাঁদে বা কষ্টে পায়। অনভুতির বা বোধের বিষয়টি পৃথিবীর সকল মানুষের একই রকম। পৃথিবীর সকল মানুষেরই ক্ষুধা লাগে এবং খাবার খায়। সেই খাবার ভৌগলিক পার্থক্যের জন্য আলাদা হতে পারে। যেমন কেউ গম, কেউ আলু, কেউ আবার চাল প্রধান খাবার হিসাবে ব্যবহার করে। কিন্তু খাবার সবাই খায় এবং মুখ দিয়েই খায়, এটাই সত্য। সভ্য জগতের সকল মানুষই পোশাক-পরিচ্ছদ গ্রহণ করে। ভৌগলিক অবস্থান গত পার্থক্যের জন্য তা আলাদা হতে পারে, যেমন জলাভূমির জন্য এক পোশাক, মরুভূমির জন্য আর এক পোশাক, পাহাড়িদের জন্য অন্য পোশাক এবং শীত প্রধান দেশ গুলির জন্য আলাদা পোশাক। অঞ্চল ভেদে কে কোন পোশাক পড়ল সেটা বড় কথা নয় আসল কথা পোশাক সবায় পড়ে। একটি নির্দিষ্ট বয়স পার হওয়ার পর পৃথিবীর সকল মানুষই সঙ্গীর একান্ত সহচর্য বা সান্নিধ্য উপভোগ করে। সেই সান্নিধ্য বা সাহচর্যে আসার নিয়ম বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় বিভিন্ন রকমের হতে পারে। কিন্তু কে কি ভাবে সাহচর্যে আসল সেটা বড় কথা নয়, আসল কথা একান্ত সাহচর্য ছাড়া কে থাকল! পৃথিবীর সকল মানুষ একই ভাবে মায়ের পেটে যায় এবং পৃথিবীতে আসে। তাহলে আমরা মৌলিক দিক থেকে পৃথিবীর সকল মানুষ এক এবং অভিন্ন। তাই আমি মানুষের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে চাইনা একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল যুগে, যখন পৃথিবীর এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তের দূরত্ব মাত্র দুই সেকেন্ড বা তারও কম।

আমি ভাবনার ডানায় আলোকিত আকাশে উড়তে চাই। নিজেকে নিজে ছোট করতে চাইনা। নিজেকে আর নির্বোধিতার গহ্বরে আটকে রাখতে চাইনা। তাই আমি বিশ্বাস করি পৃথিবীর সকল মানব একই জাত। পুরুষ এবং নারী এই দুই মিলে এক মানব জাত। শুধু পুরুষ নিয়ে যেমন মানব জাত হয়না তেমনি নারী নিয়ে মানব জাত হয়না। তাই নারী এবং পুরুষের উভয়েরই সকল বিষয়ে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার। যা আমরা অনেক পুরুষই মানতে নারাজ । পৃথিবীতে বর্তমানে মোট জনসংখ্যা প্রায় ৭.১৭৪ বিলিয়ন। এই বিপুল জনসংখ্যার অর্ধেক নারী এবং অর্ধেক পুরুষ। মানব সম্প্রদায়ের এই অর্ধেক অংশের সকল স্থানে অংশ গ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে বিশ্ব আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা মুখথুবড়ে পরবে। উত্তর উত্তর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ১৯৯৯ সালে অক্টোবরে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ৬ বিলিয়ন। তার ২০০৬ সালের জন সংখ্যা দাঁড়াল ৬.৫ বিলিয়ন। ২০১২ মার্চ মাসে জনসংখ্যা হয়ে গেল ৭ বিলিয়ন। যে ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে জনসংখ্যা ১০ বিলিয়ন হতে খুব বেশি দিন লাগবেনা। এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসাসহ অন্যান্য বিষয় গুলি নিশ্চিত করতে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও সমান সুযোগ দিতে হবে।

অঞ্চলভেদে ও ভৌগলিক পারিপার্শ্বিক নানা পার্থক্যের কারনে আমাদের জীবন যাত্রা এবং সংস্কৃতি, আচার আচরণ চলাফেরায় পার্থক্য থাকতেই পারে তাই সেই সকল অঞ্চলের সাংস্কৃতিকে সম্মান প্রদর্শন করেই নারীর সম অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। রোধ করতে হবে বাল্য বিবাহ , অল্প বয়সের গর্ভধারণ। এই সকল কাজে প্রধান বাঁধা সামাজিক বা ধর্মীয় দৃষ্টি ভঙ্গি, অশিক্ষা এবং কুসংস্কার। তাই শিক্ষার উপরে জোর দিতে হবে। তা না হলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে মহা প্লাবন তা ধীরে ধীরে সুনামির আকার ধারণ করবে।

উত্তর উত্তর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বিশ্ব পরিবেশ হুমকির মুখে পরছে। ক্ষতি গ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বের নিম্ন আয়ের দেশ বিশেষ করে এশিয়া এবং আফ্রিকার অনুন্নত দেশগুলি। বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যার চাপে জীবন যাত্রার মান এবং পরিবেশ কোনটি ঠিক থাকেনা। বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যার মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি। ফলে নানা রকমের অশান্তি আটকে যাচ্ছে । জনসংখ্যা সমস্যার কারণে জীবন যাত্রার মান কমে যায়। সীমিত সম্পদের উপর চাপ পরে ফলে সম্পদের সুষম বণ্টন হয়না। এতে নানা প্রকার অনিয়ম আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়। দারিদ্র বিমোচনও সম্ভব হয়ে ওঠেনা । বিশ্বব্যাপী বাড়ছে দারিদ্র , বেকারত্ব , বাসস্থান সংকট, খাদ্য সমস্যা, অপরাধ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অপুষ্টিসহ আরও নানা অনৈতিক কাজ। সার্বজনীন শিক্ষা , বিশেষ গুরুত্ব সহকারে নারী শিক্ষার প্রসার, বাল্যবিবাহ এবং অল্প বয়সে গর্ভধারণ রোধ, নারী পুরুষের সমতা আনয়ন করে আধুনিক আলোকিত জীবন যাপনের মাধ্যমে বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানো সম্ভব । জন্ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু নারীদের উপরে চাপিয়ে দিলে চলবেনা পুরুষদেরও সমান সচেতন হতে হবে। বিশ্বে যে দেশগুলি এই বিষয়ে যত সচেতন সেই দেশগুলির জন্মহার তত কম। জন্মহার বেশী এমন ৩৯টি দেশ আফ্রিকা মহাদেশে। নাইজেরিয়া, কঙ্গো, সুদান, কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, ইত্যাদি আফ্রিকা মহাদেশের দেশগুলিতে জন্মের হার অনেক বেশী। তারা বিশ্বের সবচেয়ে অনুন্নত কুসংস্কারাচ্ছন্নতায় ভরা একটি মহাদেশ । এখানে এখনও নারীদের মধ্যযুগীয় কায়দায় খৎনা করা হয় । এখানে চলে অবাধ যৌনতা। এইডসের মত ভয়ানক ব্যাধিতে আক্রান্ত অনেক মানুষ । নেই আধুনিক জীবন যাত্রা। নানা রকমের অপরাধ, লুটপাট, দাঙ্গা ও জঙ্গিবাদে ভরা এই মহাদেশ।

জনসংখ্যাতাত্বিক ও অর্থনীতিবিদ থমাস ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ব আমরা প্রায় সবায় জানি , তিনি ১৭৯৮ সালে তার বিখ্যাত An Easy on the Principal of Population গ্রন্থে প্রকাশ করেন ‘‘জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে আর খাদ্য বৃদ্ধিপায় গাণিতিক হারে। আমরা নিজেরা যদি এই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার না কমাতে পারি তাহলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এমন অবস্থায় পৌঁছাবে তখন খাদ্য ঘাটতি সহ নানা সমস্যা দেখা দিবে। যার ফলে দুর্ভিক্ষ মহামারী যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ বা অন্য কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিবে । এতে জনসংখ্যার বাড়তি অংশ এমনি এমনি প্রাকৃতিক উপায়ে নিয়ন্ত্রণ হয়ে যাবে।
কিন্তু আমরা থমাস ম্যালথাসের মতে প্রাকৃতিক উপায়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ চাই না। তাই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে বিশ্বের অনুন্নত দেশে মহিলাদের সার্বিক উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। তাদের শিক্ষার উপরে বেশি বেশি করে গুরুত্ব দিতে হবে। আর্থিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অধিক হারে সম্পৃত্ত করতে হবে। মহিলাদের কর্মজীবী হওয়ার জন্য বেশি বেশি করে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।সমাজের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নারীরা আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হলে, শিক্ষার মান উন্নত হবে, বাল্যবিবাহ রোধ হবে, অল্প বয়সে গর্ভধারণ হ্রাস পাবে, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, এক কথায় সামাজিক অর্থনৈতিক সহ সকল ক্ষেত্রের শ্রী দিন দিন বৃদ্ধি পাবে। বিশ্ব-জনসংখ্যার অগ্রগতির লক্ষে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের বয়ঃসন্ধিকালীন ও বিভিন্ন অধিকার রক্ষা করে একটি ভালো, নিরাপদ ও টেকসই সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়তে হবে। নারী পুরুষ বৈষম্য রোধ করে, সক্ষম ব্যক্তি তথা তরুণদের নতুন নতুন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে বেশি বেশি করে উৎসাহিত করতে হবে। এই জন্য বিশ্বব্যাপি একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সুশীল, প্রাণবন্ত, শান্তিময় ও টেকসই ভবিষ্যতের পথ সৃষ্টি করে শিক্ষা , ব্যক্তিগত মর্যাদা ও মানবাধিকার। সারা বিশ্বময় এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করে আগামীর পৃথিবী ভারসাম্যময়, সুন্দর ও শান্তিময় হোক।

-মশিউর রহমান