ক্যাটেগরিঃ কৃষি

বর্তমান ধারণা অনুসারে ভারতের মোট জনসংখ্যা ২০২৮ সালে হবে ১.৪৫ বিলিয়ন যা চীনের সমতুল্য এবং ২০৫০ সালে হবে ১.৭০ বিলিয়ন যা চীন এবং মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের মিলিত জনসংখ্যার প্রায় সমপরিমাণ। ইতিমধ্যে ভারত তার উত্তর উত্তর বৃদ্ধি প্রাপ্ত জনসাধারণের খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য সংগ্রাম করছে। ভারতের খাদ্য সংকট গত কয়েক দশক ধরে যা ছিল তার চেয়ে ভবিষ্যতে আরও খারাপ হতে পারে।
গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (GHI) ২০১৩ অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে খাদ্য ঘাটতির ৭৮টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ৬৩তম যা প্রতিবেশী দেশগুলির তুলনায় অত্যন্ত খারাপ যেমন শ্রীলংকার অবস্থান ৪৩ তম নেপালের ৪৯ তম পাকিস্তান ৫৭ তম এবং বাংলাদেশ ৫৮ তম। গত ২৫ বৎসরে যথেষ্ট উন্নতি শর্তেও ভারতে (GHI) রেটিং ১৯৯০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ২১.৩ থেকে বেড়ে মাত্র ৩২.৬ হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য এবং কৃষি সংস্থা বিশ্বাস করে যে ভারতের ১৭% মানুষ এখনও উৎপাদনশীল পুষ্টিকর সাস্থ্যসন্মত জীবনযাপন করতে অসামর্থ্য। বস্তত: বিশ্বে অপুষ্টিকর মানুষের এক-চতুর্থাংশ ভারতে যা সাব-সাহারা আফ্রিকার চেয়েও বেশি।
আরও পীড়াদায়ক যে বিশ্বের অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের এক তৃতীয়াংশ বসবাস করে ভারতে। ইউনিসেফের মতে, ভারতীয় শিশুদের ৪৭% কম ওজনের হয় এবং তিন বছর বয়সের ৪৬% শিশুরা বয়সের তুলনায় কম বাড়ে। প্রকৃত পক্ষে ভারতের শিশু মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক অংশকে অপুষ্টিজনিত কারণে হয় বলে দাবী করা যেতে পারে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ভারতের এই বিষয়কে “জাতীয় লজ্জা” হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন।
দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রকৃত কারণ কি? সাম্প্রতিক বছর গুলিতে নতুন রেকর্ড ধরা হয়েছে ২০০৫-৬ সালে কৃষি পণ্যের উৎপাদন ছিল ২০৮ মিলিয়ন টন, যা হতে বেড়ে ২০১৩-১৪ সালে উৎপাদিত হয় ২৬৩ মিলিয়ন টন। কিন্তু ভারতে প্রতি বৎসর খাদ্য দরকার ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন টন। তাই বলা যায় খাদ্য ঘাটতির প্রধান সমস্যা জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা উৎপাদন সমস্যা নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং সঠিক বণ্টনের অভাবে ভারতে উৎপাদিত খাদ্যের বেশি ভাগ তাদের নিজের দেশের ভোক্তাদের নিকট পৌছায়না। সাবেক কৃষিমন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন, ভারতে ৮৩ বিলিয়ন ডলার খাদ্য শস্য উৎপাদন হয় এবং মোট উৎপাদিত মূল্যের প্রায় ৪০% খাদ্য নষ্ট হয়ে যায়।
এই তথ্যে পুরা ভারতের আসল চিত্র ফুটে ওঠেনা তাই আরও কিছু তথ্য জানা দরকার যেমন মাংসর হিসাবে, ভারতের ৪% খাদ্য অপচয় হয় যার উৎপাদন খরচ ২০%, ফল এবং সবজি ৭০% নষ্ট হয় যার উৎপাদন মূল্য ৪০%। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম দুধ উৎপাদন কারী দেশ। সবজি এবং ফল উৎপাদনে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ (চীনের পরে)। কিন্তু ভারতের উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য খুব সহজে নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে ফল ও সবজির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায় এবং দুধের দাম ৫০% বেশী হয় যা হওয়া উচিৎ তার থেকে।
আনুমানিক ২১ মিলিয়ন টন গম যা পোকামাকড় খেয়ে ফেলে, অপর্যাপ্ত গুদাম এবং ভারত সরকার পরিচালিত ফুড কর্পোরেশন (FIC)এর দারিদ্র ব্যবস্থাপনায় নষ্ট হয়ে যায়। যে পরিমাণ খাদ্য শস্য নষ্ট হয়ে যায় তা অস্ট্রেলিয়ার সমগ্র বার্ষিক উৎপাদিত ফসলের প্রায় সমতুল্য। খাদ্যমূল্যের মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিক ভাবে ১০% এর উপরে হয়েছে ( শুধু মাত্র ৬.২% ছিল ২০১০-১০১১)। এর ফলাফল দরিদ্ররা সবচেয়ে বেশি ভোগ করে। তাদের মুদি বিল বা খুচরা দৈনন্দিন বিল ৩১% বেড়ে যায়।
আরও কিছু কারণ আছে যার ফলে অনেক খাবার পচে যায়। যেমন আধুনিক ভাবে খাদ্যের সুষম বণ্টন বা খাদ্য বিতরণের যুগপোযুগী ব্যবস্থাপনার অভাব, নুন্যতম মানের অল্প খাদ্য শস্য গুদামজাত কেন্দ্র, হিমাগারের অভাব, অনুন্নত পরিবহন ব্যবস্থা, অনিশ্চিত বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিনিয়োগের অভাব, ইনসেন্টিভের অভাবসহ অনেক রকমের সমস্যা চিহ্নিত করা যায়। ইন্ডিয়া ইনষ্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট অফ কলকাতা তথ্য অনুসারে, হিমাগারের সুবিধা পাওয়া যায় মাত্র ১০% উৎপাদিত পণ্যের জন্য বাঁকি ৩৭০ মিলিয়ন টন উৎপাদিত খাদ্য শস্য থাকে ঝুঁকির ভিতরে, পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার।
(FIC) ১৯৬৪ সালে প্রধান খাদ্য শস্য হিসাবে চাল এবং গমের জাতীয় বণ্টনের সুবিধার্থে চালু করেছিল প্রাইস সাপোর্ট সিস্টেম কিন্তু অব্যবস্থাপনা, অদূরদর্শিতা, ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি (যা জিডিপির ১%) প্রধান অন্তরায়। ভারতে যথেষ্ট আবাদি জমি, সেচ বা অন্যান্য শক্তি প্রয়োজন মত নাই, যা ভবিষ্যৎ ১.৭ বিলিয়ন মানুষের স্বাস্থ্য সম্মত পুষ্টিকর খাদ্য প্রদান করতে পারে। তাই মোদী সরকারের ভারতের খাদ্য সংকট সমাধানে বিকল্প উপায় বিবেচনা করা উচিত।

-মশিউর রহমান

তথ্য সুত্র: উইকিপিডিয়া এবং বিদেশী জার্নাল