ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক আফ্রিকাকে বিশ্ব ব্যাংকের শোষণ থেকে মুক্ত করতে পারে! আফ্রিকায় দারুণ ভাবে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ত এবং সস্তায় দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়ন। ব্রিকস তার সঠিক সমাধান দিতে পারে। আরও পারে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসাবে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন যা আফ্রিকার উল্রেখযোগ্য ভাবে দরকার। ব্রিকস দেশগুলি ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন এবং আফ্রিকা ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংকের প্রর্বতনের চুক্তি করেছে, গত বছর ১৫-১৭ই জুলাই ব্রাজিলের ফোর্তালেজায়।

ব্রিকস ব্যাংক প্রতিদ্বন্দ্বী হবে আমেরিকা এবং ইউরোপিয়ান পরিচালিত বিশ্বব্যাংক এবং ইহার মুদ্রা তহবিল শাখা আই.এফ.এম-এর। ২য় বিশ্ব যুদ্ধের পর থেকে পরিচালিত বিশ্ব ব্যাংক বিশ্ব অর্থনীতির উন্নয়নের নামে একক ভাবে সাড়া বিশ্বে প্রভুত্ব করছে আর উন্নয়নশীল দেশগুলিকে শোষণ করে চলছে নিজস্ব কৌশলে নিত্য নতুন ভাবে। ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক পরিচালিত হবে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বিশ্ব ব্যাংকের বিকল্প হিসাবে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলির আর্থ-সামাজিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে।

ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংকে ১০০ বিলিয়ন কন্টিজেন্টাল রিজার্ভ এ্যারেজমেন্ট (সি.আর.এ) থাকবে যা মোকাবেলা করবে জরুরী বৈদেশিক মূলধন সংকট। ব্রিকস ব্যাংক তহবিলে চীন একা ৪১ বিলিয়ন ডলার প্রদান করছে। রাশিয়া, ব্রাজিল এবং ভারত ১৮ বিলিয়ন ডলার করে এবং আফ্রিকা ৫ বিলিয়ন ডলার প্রদান করবে।

উন্নয়নশীল দেশগুলি ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ব্যর্থ, শিল্পোন্নত জাতি হিসাবে নিজেদেরকে আজও গড়ে তুলতে পারেনি। এই ব্যর্থতার বড় কারণ তারা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিশ্ব ব্যাংক বা আই.এফ.এম- এর দেওয়া রোড ম্যাপ অনুযায়ী, ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলি তাদের দেওয়া রোডম্যাপে সহজে ক্ষতির সন্মখীন হয় (বিশ্বব্যাংকের রোডম্যাপ উন্নত দেশগুলি কখনও প্রয়োগ করেনা)। বিশ্বব্যাংক যা দেয় কৌশলে তার দ্বিগুণ ফেরত নেয় বা ঘাড়ের উপরে বড় মাপের ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়।

নতুন এই ব্যাংকের কন্টিজেনটাল তহবিল দ্বারা প্রথম বাস্তব সম্মত এবং ব্যবহারিক পদক্ষেপ হবে উন্নয়নশীল দেশগুলির মূলধন সৃষ্টিকরা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। দ্বিতীয়ত: বিশ্বব্যাংক এবং আই.এফ.এম এর বিকল্প ব্যবসা নীতি নির্ধারণ এবং মার্কিন ডলারের উপরে প্রভুত্ব সৃষ্টি করা।

ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংকের সৃষ্টি হয়েছে ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্র সুমহের নিজেস্ব পার্লামেন্টে মঞ্জুরীকৃত বা অনুমোদিত হয়ে। আশা করা হয়েছিল যে, অনুমোদনের দুই বৎসর পর ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক তার যাত্রা শুরু করবে। কিন্তু ব্যাংক কোথায় স্থাপিত হবে এই সিদ্ধান্তহীনতা এবং নানা তর্কবিতর্কের কারনে দেরী হয়ে যায় তার কর্মকাণ্ড শুরু হতে। চায়না চেয়ে ছিল চীনে তাদের ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ করতে কিন্তু ইন্ডিয়ার ভয় ছিল পরবর্তীতে চীনের দ্বারা অর্থনৈতিক শোষণ হবার। সাউথ আফ্রিকা চেয়েছিল নিরপেক্ষ ভেনু হিসাবে জোহানসবার্গে তাদের ব্যবস্থাপনায় হতে এবং আফ্রিকায় “অধিকার রক্ষার” প্রধান ব্যাংক হিসাবে কাজ করবে।

“আফ্রিকা অনুভব করে উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হওয়া উচিৎ আফ্রিকাতেই। বাস্তবে অন্য যে কোন মহাদেশ থেকে এই ব্যাংকের বিশেষ ভাবে বেশী প্রয়োজন আফ্রিকা মহাদেশেই ।” -জ্যাকব জুমা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট, ২০১৩-তে আফ্রিকার কেপ টাউন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে এ কথা বলেন। এ বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার যুক্তি জোড়ালো ছিলনা, আপাদত দৃষ্টিতে সংকীর্ণ ছিল; যাইহোক, প্রদর্শিত নথি অনুযায়ী এ ব্যাংক সাংহাইকে ভিত্তি করে তৈরি করা হবে।
আফ্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভাবে প্রয়োজন বিশ্ব ব্যাংক এবং আই.এম.এফ নিয়ন্ত্রণমূলক শর্তহীন, নির্ভরযোগ্য এবং সস্তায় দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন মূলক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। BRICS ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে আফ্রিকার অবকাঠামো উন্নয়নের।

অবকাঠামো মূলক সমস্যার কারণে আফ্রিকায় বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এ জন্য আফ্রিকা ভিত্তিক BRICS ব্যাংকের কঠিন ভাবে প্রয়োজন ছিল তারপরেও কিন্তু এটা আফ্রিকার উৎপাদন খাত প্রসারিত করার জন্য যথেষ্ট সহযোগিতা এবং অর্থ প্রদান করতে পারে। যদি এ মহাদেশ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করে নানা বৈষম্য ও দারিদ্র্য হ্রাস করতে একান্ত সচেষ্ট হয়। আশাকরা যায় BRICS ব্যাংকের কেবল মাত্র উপস্থিতিই আফ্রিকান সরকারের হাত জোরদার হতে পারে।
BRICS উন্নয়ন ব্যাংক নিরাপদ বিনিয়োগ করার জন্য বহুপাক্ষিক ব্যাংক এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ঐতিহ্যগত আফ্রিকানদের সাহায্য করতে পারে। BRICS ব্যাংক যা বিশ্ব ব্যাংক ও আই.এম.এফ এর কাঠামোগত দর্শন সূমহগুলি সমন্বয় করে চলবে না। অধিক স্বতন্ত্র উৎপাদন এবং উন্নয়ন নীতির উপরে নির্ভর করে ঐতিহ্যগত ঋণ পদ্ধতির প্রয়োগের দ্বারা দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অন্যান্য অনুন্নত দেশগুলির অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধনে সচেষ্ট হবে।
তবে সন্দেহবাদী দৃষ্টিতে কিছু কথা থেকেই যায় যে ভবিষ্যততে BRICS ব্যাংকও কি বিশ্ব ব্যাংক বা অন্যান্য উন্নয়ন ব্যাংকের মত কাজ করবে! বা এটা সমগ্র আফ্রিকান অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও অবকাঠামো নীতির চেয়ে বরং BRICS নিজেদের অর্থনীতির অগ্রাধিকার প্রাধান্য দিবে? তাছাড়া অন্যান্য উন্নয়নমূলক ব্যাংকের চেয়ে BRICS ব্যাংক আরো উন্নয়ন ভিত্তিক হবে তার কোন যথার্থ গ্যারান্টি নেই। যদি বিশ্ব-অবকাঠামোগত উন্নয়নই ব্রিকস ব্যাংকের মুল কথা হয়, তাহলে ‘‘ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক’’ সদস্য রাষ্ট্রসূমহের মধ্যে সব থেকে কম উন্নয়নশীল দেশকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উচিত ছিল। কিন্তু সব তর্ক সব আলোচনার অবসান ঘটিয়ে হল চীনের সাংহাই ভিত্তিক!

তবে যে যাই বলুক, BRICS ব্যাংকের সঙ্গে স্মার্ট অংশীদারিত্ব তৈরি করতে হবে সমগ্র আফ্রিকান অর্থনীতির। যেমন আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংক, বেসরকারী খাত, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগ সূমহে । ভাল কর্পোরেট ব্যাংকিং নীতিমালা ও শাসন ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে উভয় পক্ষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট হতে হবে। উভয় পক্ষের স্বার্থ টেকসই হয় এমন ঋণ ব্যবস্থার অন্বেষণ করতে হবে । যার ফলে আফ্রিকায় যেন ব্যাপক ভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং উন্নয়ন হয়। এ জন্য দরকার সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আফ্রিকার প্রতিটি খাতের সৃষ্ট বাধা গুলিকে অতিক্রম করা। আমরা আশাকরি BRICS ব্যাংকের সঙ্গে স্মার্ট অংশীদারিত্বে দক্ষিণ আফ্রিকাসহ সমগ্র আফ্রিকা সকল বাধা গুলি অতিক্রম করে উন্নয়নের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছাবে।
ইতি মধ্যেই লাতিন আমেরিকার দেশ গুলির মধ্যে ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংকের চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে যেমন আর্জেনটিনা, বলিভিয়া, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, গায়না, প্যরাগুয়ে, পেরু, উরুগুয়ে, ভেনজুলিয়া এবং সুরিনাম। গত বছর ব্রিকস সন্সেলনে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতি এই কথা বলে দেয়। এশিয়ার দেশ বাংলাদেশও ব্রিকস ব্যাংকের সদস্য হতে চায়। শুধু আফ্রিকা নয় তৃতীয় বিশ্বের আফ্রো-এশীয় ও লাতিন আমেরিকার দেশ গুলি, ২য় বিশ্ব যুদ্ধের পর হতে বিশ্ব ব্যাংক এবং আই.এফ.এম-এর নতুন নতুন পুঁজিবাদি ষ্ট্রাটেজির দ্বারা শোষনের শিকলে বাঁধা পড়ে আছে। তা হতে মুক্ত হওয়ার নতুন আশার আলো হতে পারে এই ব্রিকস উন্নয়ন ব্যাংক।

–মশিউর রহমান
তথ্য সুত্র: উইকিপিডিয়া এবং বিদেশী জার্নাল