ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা


চান্নির চক এল সি স্কুল মাঠ

সকাল ৯টা বাজতে না বাজতেই সবাই মাঠে চলে এসেছে। আজ আকাশটা একটু মেঘলা। ভোর রাতে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার হাতিয়ার ডাংগা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম মাঠের সবুজ ঘাসে এখনো বৃষ্টির দুয়েক ফোঁটা পানি রয়ে গেছে। গতকাল বিকালের ঘোষনা অনুযায়ী আজ থেকে টেস্ট ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।  দুই দল দুই বার করে আউট না হওয়া পর্যন্ত খেলা চলতে থাকবে।

ছোট মাঠটাতে শুধু মাত্র চার মারা যাবে। সীমানার উপর দিয়ে মারলে অর্থাৎ ছয় হয়ে গেলে তা আউট হিসাবে ধরা হবে। রান বলতে ওই চার রান; দৌড় দিয়ে কোনো রান নেওয়া নেই।

এক জন করে ব্যাটসম্যান ব্যাট করতে পারবে। নয়টা ইট দিয়ে স্টাম্প রেডি করা হয়েছে। দুই দলে ভাগ হয়ে টিমও গঠন করা শেষ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এলাকার ভাইদের নিয়ে সিনিয়র টিম। আর স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের নিয়ে জুনিয়র টিম।

টস করে খেলা শুরু হয়েছে। তুমুল উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে খেলা এগিয়ে চলেছে। ব্যাটসম্যান একটা করে চার মারে আর করতালি, চিৎকার, চেঁচামেচিতে চারিদিকে আলোড়ন শুরু হয়।

ভালো খেলতে থাকা আমাদের ব্যাটিং লাইনে সহসা ধস নামলো। পর পর দুই বলে দুই জন ব্যাটসম্যান আউট হয়ে গেলো। বিপক্ষ শিবিরে তখন উল্লাস। নতুন ব্যাটসম্যান ক্রিজে আসতেই তাকে নিয়ে ফিল্ডাররা স্লেজিং এ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। উদ্দেশ্য মনোনিবেশ করতে দেওয়ার আগেই তাকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠানো। প্যাভিলিয়ন বলতে মাঠের পাশেই ভাঙা মন্দির।

আমাদের এই ব্যাটসম্যান  সকল বাধা পেরিয়ে ভালোই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ইতোমধ্যে মূল্যবান ৫০ রান তুলে নিয়েছে। আমরা করতালি, চিৎকার করে তাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি। এরমধ্যেই মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। খেলা সাময়িকভাবে বন্ধ।

এভাবে আরো ১০-১৫ মিনিট কেটে গেছে।  বৃষ্টির পরিমান একটু কমেছে কিন্তু একেবারে থেমে যায়নি। ওইদিকে বৃষ্টির পানিতে পিচের অবস্থা খুব খারাপ। কিন্তু আমরাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নই। তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত হল এই বৃষ্টির মধ্যেও খেলা হবে। তাই মাঠের পাশের মন্দিরের কাছে সংরক্ষিত স্থান থেকে ভূষি এনে পিচটা কোন মতে শুকানো হল। তারপর আবার খেলা শুরু।

এবার আমাদের পঞ্চাশোর্ধ  রান করা ব্যাটসম্যানটি খুব বেশি সুবিধা করতে পারছে না। বলতে গেলে ব্যাটে-বলে ঠিক মত করতেই পারছে না। বৃষ্টিভেজা পিচে টিকে থাকাটাই তখন সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিকূল আবহাওয়ায় যা হওয়ার তাই হল। আমাদের সেরা ব্যাটসম্যানটি আর টিকতে পারলো না; আউট হয়ে গেলো।

ওই দিকে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে গেল। আর এর মধ্যে আমাকে ব্যাটিং করতে পাঠানো হল। সবাই বার বার করে বলছে, রানের কোনো দরকার নেই। হাত, পা, মাথা দিয়ে কোনো রকমে পিচে টিকে থাকতে হবে।

যেহেতু এলবিডব্লিউ আউট নাই তাই শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে বল ঠেকানো যাবে। ব্যাট নিয়ে মাঠে নামছি আর ডারউইনের কথা মনে পড়ছে  -অনলি দ্যা ফিটেস্ট ক্যান সারভাইভ।

এই মুষলধারে বৃষ্টিতে পিচে টিকে থাকার গুরুদায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে। প্রথম বলটা কোন দিক দিয়ে গেলো বুঝতে পারলাম না। বৃষ্টির পানি, ভূষি আর ভিজা ঘাসে লেগে বল যেভাবে ইনসুইং – আউটসুইং করছে তাতে অতি পরিচিত ছোট ভাইয়ের বলটাকে মনে হচ্ছে সুইং রাজা ওয়াসিম আকরামের বল খেলছি।

বল কোনোটা নিচু, আবার কোনোটা উঁচু বাউন্সার। একটা বল মাথার উপর দিয়ে চলে গেলো। মনে হচ্ছে এই বুঝি ডেল স্টেইন বাউন্সটা দিলো। আমার অবশ্য ওয়াসিম আকরাম, ডেল স্টেইন কারো দিকে তাকানোর সময় নেই। আমার টার্গেট একটাই, কোনোমতে পিচে টিকে থাকতে হবে।

এভাবে তিন-চার ওভার কাটিয়ে দিলাম। ব্যাটের কোনায় লেগে দুটো চারও হয়ে গেছে। যদিও তাতে আমার ব্যাটিং এর খুব বেশি অবদান ছিল না। অবদান একটাই এই প্রতিকূল পরিবেশে আমি এখনো পিচে টিকে আছি।

এবার বল করতে আসলো সদ্য স্কুল পেরিয়ে কলেজে ওঠা এলাকার অতি পরিচিত প্রতিবেশি ছোট ভাইটি। প্রথম বলটি অফ স্টাম্পের বেশ বাইরে। যেহেতু টেস্ট খেলা চলছে তাই একটু ভাব নিয়ে ব্যাট উঁচিয়ে বলটি ছেড়ে দিতেই শুনি চারিদিকে চিৎকার। পিছনে তাকিয়ে দেখি ইট দিয়ে বানানো স্টাম্প ভূপাতিত।

বিপক্ষ টিমের প্লেয়ারদের চিৎকার, চেঁচামেচিতে ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠলাম। দেখি অফিস বাসটি খামারবাড়ি, ফার্মগেট এলাকায় জ্যামে আটকিয়ে আছে। পরে বুঝলাম ঘুমের মধ্যে সেই ছেলেবেলার স্মৃতি জেগে উঠেছিল।

ফিরে এলাম ২০০৭ থেকে ২০১৮ সালে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি খামারবাড়ির উল্টো দিকের মাঠটাতে  আজও কিছু ছেলে ক্রিকেট খেলছে।

প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় দেখি ছেলেগুলো খেলাতে মেতে থাকে। ইটের খাঁচার এই শহরের ছকে বাঁধা এই জীবনে ওদের দেখলে ছেলেবেলার  অনেক স্মৃতি চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে উঠে।