ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

হাফিজ (পরিবর্তিত নাম) আমাদের অফিসের এক টি বয়। সে কেমন, তার আচার ব্যাবহার কেমন সেটা আমার লেখার বিষয় নয়। তবে অফিসের অনেকেই তাকে একটু চতুর প্রকৃতির বলেই জানে।

তো সেই চতুর প্রকৃতির হাফিজ তার ভাইকে সৌদি আনতে যার পর নাই ব্যস্ত। ভিসার জন্য নানা যায়গায় ঘুরিয়া ফিরিয়া পেরেশান। একলোক একবার তাকে একটা জাল ভিসা দিয়ে প্রায় দশ হাজার রিয়াল মেরে দিয়েছিল। তার ভাষ্য ছিল ভিসা যে ভাবে পেয়েছি সে ভাবেই দিয়েছি – “ভিসা তো আর আমি নিজে বের করিনি”। এই নিয়ে দেন দরবারের কারণে কিছুটা জেনেছিলাম।
সেই ঘটনার মাস কয়েক পর আচমকা একদিন শুনি যে ওর ভাই চলে এসেছে। এখন তার বাসাতেই আছে। সাথে পাসপোর্ট নিয়ে এসেছে আমাদের দেখাতে। আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম এত তাড়াতাড়ি কিভাবে ভিসা যোগাড় করলে? কে দিল ভিসা? কতটাকা খরচ করলে? (ভাবলাম টাকা যাই খরচ করুক প্রকৃত একটা ভিসা পেয়ে যে চলে এসেছে এটাই অনেক, ওর অনেক দিনের আশা পূরণ হয়েছে।)

তো আমার এমনি নানা প্রশ্নের জবাবে একটা তৃপ্তির হাসি হেসে বলল ভাই বেশি দিয়েছি ঠিকই বিনিময়ে জব্বর একটা ভিসা পেয়েছি বলেই পাসপোর্টটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। তার তৃপ্তি মাখা হাসি দেখলাম. আর দেখলাম কতটা পরিতৃপ্তি নিয়ে পাসপোর্টটা আমার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে. হাত বাড়িয়ে পাসপোর্টটা নিয়ে ভিসার পাতাটা খুলে দেখলাম প্রফেশন: সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বেশ ভাল! বাহবা দিতে যাব এমন সময় পাতা ঘুরাতে ঘুরাতে তার ছবির পাতাটা চোখের সামনে। একি! আমি এ কি দেখছি! পাসপোর্টের নিচে তার স্বাক্ষর দেখে হঠাত্‍ই মনে হল আমর ছোট্ট মেয়েটা যেভাবে সাদা কাগজে পেন্সিলের দাগকেটে খুশিতে গদগদ হয়ে দেখায় আর বলে “”আমি এটা আর্ট করেছি, ওটা আর্ট করেছি”” ঠিক তেমনিই কৌশলে তার নামটা লেখা।

পাঠক বোন ও ভাইয়েরা আপনারাই বলুন, একটা ব-ক-ল-ম ছেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসনের ভিসায় কি করে বিদেশে আসার দু:সাহস দেখায়? আর আমাদের প্রবাসী কল্যাণ ও শ্রম মন্ত্রণালয় কিভাবে এর ছারপত্র দিল এটাই বড় প্রশ্ন?

সৌদি আরবে বর্তমানে যেসব প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার আছেন তারা সকলেই জানেন যে তাদের সবাইকেই এস.সি.ই (SCE – Saudi Council of Engineers ) এর মেম্বার হওয়া বাধ্যতামূলক করেছে সৌদি সরকার। এই মেম্বারশিপ নম্বর ছাড়া ইঞ্জিনিয়ারদের আকামা (রেসিডেন্স পারমিট) আর রিনিউ করা যাচ্ছে না।

এই যখন অবস্থা, তো সেই ছেলে আজ চা নিয়ে আমার কাছে এসে প্রশ্ন করছে “ভাই কি করা যায় বলেন তো”? পাল্টা প্রশ্ন করে বললাম কি করতে চাও তা তো আগে বল? সে বৃত্যন্ত সব বলল; তার ভাইয়ের আকামা রিনিউ করতে পড়ছে না, সে বলল স্পন্সর তাকে কি একটা নম্বর নাকি করে নিতে বলেছে। আমি তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম ১০/১১/২০১১ তারিখের কথাটা। যে দিন ওকে বলেছিলাম এই জিনিসটা তুমার ভাইয়ের দরকার পড়বে। সেদিন সে বলেছিল আকামাতো হয়ে গেছেই আর কি সমস্যা, সমস্যা থাকলে তো আকামাই হতো না ইত্যাদি ইত্যাদি। আজ তাকে তা স্মরণ করানোতে সে বলল এখন কি করা যায় সেটা বলুন।

আরও ভয়াবহ যে কথাটা সে বলল তা হল এখানে নাকি আরও শতশত (তার ভাষায়) এমন ইঞ্জিনিয়ার অবস্থান করছে। যদি ওর কথা সত্যি হয় তবে খুবই ভাবনার বিষয়। আমার ভিশ্বাস ওর ভাই যে এভাবে এসেছে তা আমি যাতে হজম করি সে জন্যই এটা বলে সে তৃপ্তি পেতে চেষ্টা করছে.

জীবনে এমন সংকটে পূর্বে কখনো পড়েছি বলে মনে হলো না আজ তাকে সামান্য একটা পরামর্শ দিতে গিয়ে যে সমস্যাটা অনুভব করছি। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কি জিনিস, এটা খায় না মাথায় দেয় নাকি অন্য কোন জিনিস এটা যে ছেলে জানে না কিন্তু এটাই তার এখানে অবস্থানের মূল ভিত্তি তাকে এই আমি কি পরামর্শ দিতে পারি? ভাবছি আদৌ তাকে কোন পরামর্শ দেওয়া সম্ভব কিনা বা কোন সচেতন মানুষের পক্ষে এমন পরিস্থিতিতে পরামর্শ দেওয়া উচিত হবে কিনা?

মনে হচ্ছে এই সব দেশে আমাদের ইমেজ নষ্টের পেছনে অনেকগুলো কারণের এটিও একটি কারণ (যদি ওর কথা সত্যি হয়)। সাধারণ ভাবেই প্রশ্ন জাগছে এসব লোক কি রেমিটেন্সের সাথে সাথে দেশে দুর্ণামও পাঠাচ্ছে না? যে দুর্নামের ফল ভোগ করতে হতে পারে লক্ষ লক্ষ প্রবাসীদেকে। স্থানীয় ও সহকর্মী অন্যদেশীদের কটুক্তি ও বক্র বাক্য বাণের মাধ্যমে। কষ্টটা বহুগুন বৃদ্ধি পাবে যখন ওই সব লোককে দেখিয়ে না বুঝে বা বুঝে সচেতন ভাবে আমাদেরকে শুধু হেয় করার জন্য বলবে তুমদের দেশের ইঞ্জিনিয়ার দেখ রাস্তা পরিস্কার করছে, ডাস্টবিন হতে খালি পেপসির ক্যান কুড়াচ্ছে। কর্তৃপক্ষের সামান্য অসচেতনতা ফলে সৃষ্ট সুদূরপ্রসারী দুর্নামের হাত থেকে রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি একটুও ভেবে দেখবেন না? সামান্য কিছু অসচেতন মানুষের কারণে আমরা কি নানা ভাবে শুধু লজ্জিতই হব?