ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

পাকিস্তানপন্থী জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা মানে না, এই সংসদব্যবস্থার দ্বারা আইন হবে তা মানে না, এবং মানুষের তৈরি আইনে দেশ চলবে তাও মানে না। তারা চায় ইসলামী আইন। মানে হয়তো কোরানের আলোকে ও হাদিসের সহায়তায় রাষ্ট্র পরিচালনা করা।

এটা কোন রাজনৈতিক বক্তব্য না, এসব কথা এই দলের গঠনতন্ত্রে লেখা।

সবচেয়ে আশ্চর্যের ও আফসোসের বিষয় হলো যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছে, এদেশের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, খুন-ধর্ষন-লুটপাট করেছে মুসলমান-হিন্দু নির্বিশেষে, তাদের গঠনতন্ত্রে ২০১২ সালেও এসব লেখা! তারা এখনও বাংলাদেশের আইনের আওতায় রাজনীতি করে যাচ্ছে গঠনতন্ত্রে এসব সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়বস্তু থাকা স্বত্বেও। ২০১০ সাল থেকে ৪ বার তাদের এই দুটি বিষয়সহ ৮টি ধারা সংশোধন করতে বলা হয়েছিল, তারা করেনি। কত দুঃসাহস! হায়রে আমাদের নির্বাচন কমিশন, হায়রে আমাদের সরকার-প্রশাসন!!! এই বিষয়ে বিস্তারিত আরেকটি ব্লগ লিখতে যাচ্ছি দুই-একদিনের মধ্যে। (আপডেটেড, নভেম্বর ৭, ৫টা ৫৫মিনিট)

 

জামায়াতের মহান উদ্দেশ্য বাংলাদেশে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, কারন যেহেতু–
১) আলাহ ব্যতীত নিখিল সৃষ্টির কোন ইলাহ নাই এবং নিখিল বিশ্বের সর্বত্র আলাহর প্রবর্তিত প্রাকৃতিক আইনসমূহ একমাত্র তাঁহারই বিচক্ষণতা, শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্বের সাক্ষ্য দান করিতেছে;
২) আলাহ মানুষকে খিলাফতের দায়িত্ব সহকারে পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন এবং মানব রচিত মতবাদের অনুসরণ ও প্রবর্তন না করিয়া একমাত্র আলাহ প্রদত্ত জীবন বিধানের অনুসরণ ও প্রবর্তন করাকেই মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন;
৩) আলাহ তাঁহার প্রদত্ত জীবন বিধানকে বাস্তব রূপদানের নির্ভুল পদ্ধতি শিক্ষাদান ও উহাকে বিজয়ী আদর্শ রূপে প্রতিষ্ঠিত করিবার উদ্দেশ্যে যুগে যুগে নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছেন;
৪) বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুলাহ (সালালাহু আলাইহি ওয়া সালাম) আলাহর সর্বশেষ নবী ও রাসূল এবং আলাহর প্রেরিত আল-কুরআন ও বিশ্বনবীর সুন্নাহই হইতেছে বিশ্ব মানবতার জীবনযাত্রার একমাত্র সঠিক পথ সিরাতুল মুস্তাকীম;
৫) ইহকালই মানব জীবনের শেষ নয় বরং মৃত্যুর পরও রহিয়াছে মানুষের জন্য এক অনন্ত জীবন যেখানে মানুষকে তাহার পার্থিব জীবনের ভাল ও মন্দ কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হইবে এবং সঠিক বিচারের পর জান্নাত বা জাহান্নাম রূপে ইহার যথাযথ ফলাফল ভোগ করিতে হইবে;
৬) আলাহর সন্তুষ্টি অর্জন করিয়া জাহান্নামের আযাব হইতে নাজাত এবং জান্নাতের অনন্ত সুখ ও অনাবিল শান্তি লাভের মধ্যেই মানব জীবনের প্রকৃত সাফল্য নিহিত;
৭) আলাহর বিধান ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি দিক ও বিভাগে প্রতিষ্ঠিত করিয়াই মানুষ পার্থিব কল্যাণ ও আখিরাতের সাফল্য অর্জন করিতে পারে;
৮) স্বাধীন বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ এবং বাংলাদেশের জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়া বাংলাদেশ বিশ্বেও মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করিয়াছে; –সেহেতু এই মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে ইসলামী সমাজ গঠনের মহান উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর এই গঠনতন্ত্র প্রণীত ও প্রবর্তিত হইল।

এটি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল কেননা প্রধান বিরোধীদল বিএনপির এরা প্রধান শরিক। এদের হাতে ভোটও আছে অনেক। দেশের কয়েকটি জেলায়, মাদ্রাসায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে, মেডিকেল কলেজে ও বুয়েটে এদের ব্যাপক প্রাধান্য আছে। আর শিক্ষিত-অশিক্ষিত ধর্মভীরু মুসলমানরা তো আছেই।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের হাত ধরে এই দলটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিরোধীতা করা সত্বেও ১৯৭৯ সালের পর নানাভাবে রাজনীতি, প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বেসরকারি নানা পেশায় প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে এই ২০১২ তে এসে এরা মহীরুহ হয়ে গেছে, শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছে সমাজের গভীরে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভবে নিয়ন্ত্রন ও প্রভাবিত করছে দেশের একটি বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে। এরশাদের আমলে রাষ্টধর্ম হিসেবে ইসলামকে ঘোষনার মাধ্যমে এদের রাজনীতি করা ও সমাজে প্রভাব বিস্তার করার পথ সুগম হয়।

স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন হলেও এদেশে কখনো জামায়াত নির্মূল আন্দোলন গড়ে উঠেনি। যা প্রমান করে এদের শক্তি আর সাহস।

রাজনৈতিক ফায়দা নিতে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ পর্যন্ত এদের সাথে সরকারবিরোধী জোট করেছিল। তবে তা বেশীদিন টিকেনি।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম জনগনকে সাথে নিয়ে একসময় গোলাম আযমের বিচার করলেও ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেনি আওয়ামী লীগ, জনগনের সমর্থন থাকা সত্বেও। ফলে ২০০১ সালে বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় এসে নিজেদের অবস্থা আরো পাকাপোক্ত করেছে জামায়াত।

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদেরা বলেন রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। ব্যবসার মতো রাজনীতিতেও আসলে ফলাফলের বা লাভের জন্য ছোটাছুটি চলে, গালাগালি হয়, মারামারি হয়। যদিও এই দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য বিষয়ে অংশগ্রহনকারীদের নৈতিকতা ও সততা থাকাটা সবচেয়ে বেশী জরুরি, কেননা এগুলোর দ্বারা একটি দেশে, সমাজে, পরিবারে ও ব্যক্তির জীবনধারা নির্ধারিত হয়।

দূর্ভাগ্যবশত অত্যাচারী শাসন থেকে স্বাধীনতার ৪১ বছর পরেও আমরা এখন নিজেদের দেশের মানুষের দ্বারা, স্বদেশী পুলিশ দ্বারা, সরকারব্যবস্থা দ্বারা শোষিত ও নির্যাতিত হচ্ছি। আবার দুর্নীতি ও অন্যায়ের প্রবল প্রসারের কারনে সাধারন মানুষও যোগ দিচ্ছে সুবিধাবাদীদের দলে। যার ফলাফল জাতি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষদের সার্বিক নৈতিক অবক্ষয়।

আর এই দূর্বলতার সুযোগটাই নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। আর সম্প্রতি শুরু হওয়া যুদ্ধাপরাধের বিচার হবার আগে পর্যন্ত গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান আর সাঈদীর মত ঘৃন্য জানোয়ারগুলো এই দলের নেতৃত্বে থেকে এই দেশে একটা অস্থিরতা বজায় রেখেছে, বাধা দিয়ে চলেছে বাংলাদেশপন্থী কর্মকান্ড।

তাদের সহযোগী হিসেবে আছে ছাত্র শিবিরের উচ্চশিক্ষিত নেতাকর্মীরা। দলের কর্মী ছাড়াও লাখে লাখে সাধারন মুসলমান এদের পক্ষে আছে, যারা চায় বর্তমান শাসনব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে সাচ্চা মুসলমানদের ইসলামী একটা দেশ হিসেবে পৃথিবীতে মাথা তুলুক বাংলাদেশ। আবার কিছু ছোট ছোট ইসলামী দল ও জঙ্গী সংগঠন আছে তাদের মতাদর্শী। কিছু ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এখনো কমপক্ষে ২০টি সমমনা দল আছে জামায়াতের। এরা আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মত দুর্ধর্ষ কর্মকান্ড করেনা, বরং ধীরে চলো নীতি মেনে মুখোশ পড়ে শিকড় ছড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।

আর বোধহয় তাই ধর্মপ্রচার বাদ দিয়ে এরা রাজনীতি করে ক্ষমতায় যাবার জন্য, ক্ষমতা নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজে নিজেদের পছন্দের পরিবর্তন আনতে।

এদের শিকড় এভাবে বাড়তে থাকলে, কয়েকটা নেতার মৃত্যুদন্ড বা জেল হলেও, এরা টিকে যাবে স্বাধীনতাপন্থী দলের দূর্বলতা ও আপামর জনসাধারনের সীমাবদ্ধতা ও অনীহা বা খামখেয়ালীপনার কারনে।

প্রথমত, কঠোর আইন প্রনয়নের মাধ্যমে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে যেন কোন ধর্মাশ্রয়ী দল মাথা তুলতে না পারে।

দ্বিতীয়ত, সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম বাদ দিতে হবে।

তৃতীয়ত, জামায়াতের নেতাদের বক্তব্যসম্বলিত বই ও পুস্তিকা পর্যালোচনা করে সেগুলোর মাধ্যমে দেশে ইসলামের নামে যেসব ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে সেগুলো জাতির সামনে তুলে ধরে সর্বজনগ্রাহ্য চিন্তাবিদদের মাধ্যমে সেসব ব্যাখ্যার অসাড়তা প্রমানে সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে।

চতুর্থত, পত্রিকা, টিভি, মসজিদ, মাদ্রাসা, ওয়াজ মাহফিল ও পীরদের আস্তানায় কে কি বক্তব্য রাখছে তার পর্যালোচনা করতে হবে এবং দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

সর্বোপরি, শিক্ষিত ও ধর্মভীরু অরাজনৈতিক মানুষদের আরেকটু সচেতন হতে হবে যেন তারা কোরান পড়ে, নিজের বিচার বিবেচনায় ও সর্বোচ্চ মানবিক আচরন করে এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদের জীবন ও দর্শন অনুসরণের মাধ্যমে নিজেদের সত্যিকারের মুসলমান হিসেবে গড়তে পারেন।

যুদ্ধাপরাধী কারা? সবার বিচার চাই!
এইবার গো আযমের পক্ষে ভারতের জামায়াত প্রধান
গো.আযম দিয়ে শুরু করা দরকার ছিল
‘বুদ্ধিজীবী হত্যা’র স্পষ্ট ও সুষ্ঠু তদন্ত চাই

***
ফিচার ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে সংগৃহিত