ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবীদের এই অবস্থান কর্মসূচি ইস্যূ বিচারে নিঃসন্দেহে যথার্থ ও সময়োপযোগী। কিন্তু শাসকদের আচরন বিচারে এই দাবি—ব্যর্থতার কারনে যোগাযোগ মন্ত্রীর পদত্যাগ—অগ্রহণযোগ্য এবং তারা তা কঠোর হস্তে তা দমন করবে সন্দেহ নেই।

আমার সন্দেহ অমুলক নয়, কেননা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সবগূলো বিরোধী আন্দোলন কঠোরহস্তে দমন উদ্দেশ্যে পুলিশ, ও নানা পেটোয়া বাহিনী নামিয়েছে রাস্তায়। জমায়েত, মিছিল বা মিটিং-য়ের উপর নির্বিচারে লাঠিপেটা করেছে – হোক সে বিএনপি, জামাত অথবা তেল, গ্যাস কমিটি। ভীত, সংকীর্ন সরকারের এই আচরনে মনে হয় ভয়াল এই রাজা বুঝি এক্ষুনি পড়ে যাবে চেয়ার থেকে। আর সেই পতন ঠেকাতে উঠেপড়ে লেগেছে।

সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে এই ভেবে যে এই সরকারের কোন কাজের সমালোচনা করলেই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ভাবেন এরা সব বিএনপি’র লোক। কই, আমিই তো করি না! এত বড় দায়িত্বে থাকার পরেও কেন উনার মাথা গরম সেটা এক্তা চিন্তার বিষয়। আর সব ভুল যে উনি একা করেন এমনতো কেউ বলেনি এখন পর্যন্ত—তার মন্ত্রী, এমপি আর দলের নেতা-কর্মীরা যেসব করেন, তার ভাগ যদিও খানিকটা তার উপর বর্তায়, তথাপি উনার রাগ দেখলে মনে হয় উনাকে কেউ গালি দিচ্ছে।

বিএনপি, জামাত কিংবা ইসলামি আন্দোলনের লোকজন দিতে পারে—তাদের ক্ষমতার স্বার্থ আছে, কিন্তু পাবলিকের নাই সেটা তো সত্য। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বারবার বিএনপি বা জামাতকে সব খারাপের জন্য দোষারোপ করেন সেহেতু উনারা যে পাল্টা জবাব দেবে সেটাই স্বাভাবিক।

শেখ হাসিনার আশপাশের মানুষগুলো মানে মন্ত্রী-এমপি-কূলতো তার কথাই হুবুহু বলে যান এখানে সেখানে।

কিন্তু তাহলে কেন তেল, গ্যাস কমিটি মার খায় রাস্তায়? কেন তাদের গালি দেন এক প্রতিমন্ত্রী, তাও আবার সংসদে দাঁড়িয়ে? এরা তো রাজনীতি করেনা, এরা তো কোনো আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনেও দাঁড়ায়নি, বা জিতেও যায়নি। নিজেরা চেষ্টা না করে, ঠিকমত বিবেচনা না করে অযোগ্য ও বিতর্কিত কোম্পানীদের সরকার খনিজ সম্পদ আহরনের সুযোগ করে দিচ্ছে বলেই এত প্রতিবাদ।

আবার প্রধানমন্ত্রী এক সভায় দাবি করেন তিনি দেশকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন। একই সভায় তিনি প্রশ্ন করেন কেন তেল, গ্যাস কমিটি বিগত বিএনপি আমলে আন্দোলন করেনি। সবচেয়ে হাসি পেল যখন উনি বললেন, তো উনারা এসে দ্বায়িত্ব কেন কলকারখানাতে গ্যাস দেননা, সমস্যার সমাধান দেননা। এতদিন কোথায় ছিলেন তারা—এইসব।

রাজনীতিতে যে কোন নীতিকথার বালাই নেই তা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবার প্রমান দেবেন কিছুদিনের মধ্যেই–ততকালীন এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার অনুমতি দিয়ে। গতবছর মার্চ মাসে জ্বালানী মন্ত্রনালয়ের এক বৈঠকে তিনি বলেন যে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার চিন্তা ভাবনা করতে, তবে তা হতে হবে পরিবেশের ক্ষতি না করে (!)। তারপর আমরা দেখেছি সংসদীয় দল জার্মানী গেল, এসে বলল উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কোন সমস্যা হয়না, খুব ভালো–এই সব। তারপর কয়েকজন সরকারি সাংসদ (শেখ সেলিম ও অন্যান্য) এর পক্ষে কথা বললেন, মেনন সাহেব বিরোধিতা করলেও ধোপে টিকেনি তা।

এই বিষয়ে এতকিছু বলার কারন হল হাসিনা সেপ্টেম্বর ১৩, ২০০৬ সালে ফুলবাড়ীতে বলেছিলেন এশিয়া এনার্জি থাকবেনা, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলাও হবেনা–ততকালীন বিএনপি সরকারের সাথে আগস্ট ৩০-এ করা চুক্তির এই দাবিগুলু তিনি ক্ষমতায় আসলে পুরন করবেন।

কয়েকদিন আগে ওবায়দুল কাদেরের একটা কথা শুনে মনটা আরও ভালো হয়ে গেল–রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

পত্রিকা-টিভিতে সম্প্রতিক নানা সমালোচনা দেখে হাসিনা সেদিন প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের বললেন, ‘লাইসেন্স দিয়েছিলাম অনেক মানুষের চাকরি হবে এই ভেবে, আর এখন টিভি খুলতেই দেখি সমালোচনা হচ্ছে’। উনি সবাইকে বললেন গঠনমূলক সমালোচনা (!) করতে।

আমার মনে হয় উনি ভালো রিপোর্টগুলো পড়েন না অথবা তাকে জানান হয় না।

বড়দের দেখেই ছোটরা শেখে, তাই হাসিনাকেই অনুসরন করেন তার দলের নেতা-কর্মীরা…

আর তাই যোগাযোগমন্ত্রী স্বীকার করেন না তার ভুলগুলো, আর গালমন্দ করেন বিরোধীদের, সাথে গালি দেন বিএনপি-কে, যারা নাকি কিছুই করে যায়নি। এদিকে আবুল হোসেন শনি ও রবিবার বলেছেন রাস্তা চলার উপোযোগী হয়েছে, কোন সমস্যা নেই, সব মিডিয়ার অপপ্রচার। উনি সারাদেশ থেকে আসা ফ্যাক্স থেকে জেনেছেন।

আজকেও এক বন্ধু চট্টগ্রাম পৌছে জানালেন মিরসরাই-এর রাস্তার দুরবস্থার কথা।

সমালোচনার চাপে পড়ে কদিন আগে মন্ত্রীসভায় তিনি দোষারোপ করেন মুহিতকে — টাকা না দেয়ার জন্য — যিনি কিনা সাথে সাথেই তা অগ্র্যাহ্য করেন এবং তদারকির অভাবকে দায়ি করেন।

সরকারি বা জোটের এমপি, নাগরিক সমাজ আর পেশাজীবীরা যখন সংসদে তার পদত্যাগ দাবি করলেন, তিনি পরে তা নাকোচ তো করলেনই, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আগলে ধরলেন তাকে। যদিও তার অফিসে ভালই গালমন্দ করেছেন, সাথে যোগাযোগ সচিবকেও। সেটা অবশ্য পাবলিক দেখেনি, আমরা শুনেছি মাত্র।

এভাবেই চলছে দেশ। আরেকটা নোংরামি দেখতে যাচ্চি আমরা, ঈদের দিন। ইতিমধেই তর্জন-গর্জন শুরু করে দিয়েছেন সরকারি কেউ কেউ।

কিন্তু পরিবর্তনের কথা বলে যারা ক্ষমতায় এসেছেন, তারা যদি সেই পুরোনো দিনের – এরশাদ বা খালেদার – দূঃশাসনের, চুরির, মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস ত্যাগ না করেন, তবে আমরা কোথায় যাব, কি করব?

ঘরে বসে থেকে মার খাওয়া থেকে নিজেদের বাঁচাবো, নাকি কথা বলবো আর মার খাব এই ক্ষমতাবানদের কাছে – যেহেতু উনারা উনাদের ইচ্ছামতোই দেশটাকে চালাবেন, আমাদের মত করে নয়।

আর সবচেয়ে বেশি টেনশন হচ্ছে এই ভেবে যে এই সুশীল সমাজের আন্দোলনের পেছনে কারা আছে? ছাত্র, শিক্ষক আর পেশাজীবীদের সাথে কোন ফড়িয়া রাজনীতিবিদ ঢুকে যাছেনা তো আবার–বিএনপি বা জামাত? কোন বিশেষ পত্রিকা বা টিভি? কোন ব্যবসায়ী?–এই সুযোগে যারা পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করবে?