ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

কৃষিকার্ড প্রাপ্ত ১ কোটি ৮২ লাখ কৃষকের মধ্যে ১ কোটি ৪২ লাখই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষী। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরা মূলতঃ দরিদ্র শ্রেণীভুক্ত, যাদের সম্পদ ও শ্রমশক্তিতে মূলতঃ কৃষিতে বাংলাদেশ বাম্পার ফলন দিয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষিকে রক্ষা করতে হলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের দারিদ্রতা নিরসন করা প্রয়োজন। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকদের যেভাবে অনুপ্রাণিত করা হয়েছে, সেভাবে ফসলের লাভজনক মূল্য প্রদান করে তাদের দারিদ্রতা নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করার কোন সরকারি নীতি বা উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সরকারের কার্যকর নীতি-পরিকল্পনার অনুপস্থিতির কারণে শুরু হয়েছে অন্যায্য ধান বাণিজ্য। অন্যায্য ধান বাণিজ্যের কারণে বাম্পার ফলন দিয়ে কৃষক এবং চালের সাধারণ ভোক্তারা হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্থ, অন্যদিকে ফড়িয়া ধান-চাল ব্যবসায়ীদের জন্য তৈরী হয়েছে অধিক মুনাফার রাস্তা। বাংলাদেশের কৃষিকে বাঁচাতে ফড়িয়া, আড়তদার, ধান-চাল ব্যবসায়ীদের অন্যায্য ধান বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে এবং অবিলম্বে সরকারকে প্রায় দেড় কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীর জীবন ও জীবিকা নিশ্চয়তা প্রদান করার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। প্রমাণ করতে হবে কৃষিবান্ধব সরকার, কৃষকবান্ধবও বটে।

ধানের বাম্পার ফলন ও আপদকালীন মজুদ বাড়াতে আমদানী
গত কয়েকবছর ধরে দেশের কৃষকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের খাদ্য উৎপাদন ইতিমধ্যে দ্বিগুণ করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৪৭ লক্ষ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করে ফসল উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৮২ দশমিক ৮৭ লক্ষ টন, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৪৭ লক্ষ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান উৎপাদিত হয় ৩ কোটি ৮৮ লক্ষ টন। চলতি অর্থবছর ২০১০-১১ তে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে, আশা করা হচ্ছে এবার ৩ কোটি ৯০ লাখ টন ধান এবং ১ কোটি ৮০ লাখ হতে ১ কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদিত হবে।
দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে ধান ও চাল সংগ্রহ করার সুযোগ সৃষ্টি হলেও সরকার স্থানীয় বাজার হতে ধান ও চাল সংগ্রহের মূল্য ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে বিদেশ থেকে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত কার্যকর করছে। সরকার ইতিপূর্বে চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ২২ লাখ টন নির্ধারণ করেছিল। আমদানির এই লক্ষ্যমাত্রা পুরণ করতে বর্তমান মজুদ ১১ লাখ টন এ মাসের শেষে ১৫ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে এবং মজুদের লক্ষ্যমাত্রা পুরণে সরকার ভিয়েতনাম হতে ২ লাখ টন, থাইল্যান্ড হতে ২ লাখ টন, ভারত হতে ৩ লাখ টন চাল আমদানির প্রস্তুতি নিয়েছে।

পরিলক্ষিত হচ্ছে, আমদানী করা খাদ্যে ইতিমধ্যে দেশের খাদ্যগুদামগুলো পূর্ণ হবে, সুতরাং খাদ্য সংরক্ষণের স্থান সংকুলান করতে না পারার কারণে সরকার স্থানীয় বাজার হতে খাদ্য ক্রয় করার উদ্যোগ গ্রহন করতে পারবেন না। সরকারের এমন নীতি কার্যকর করা হলে দেশের কৃষকবৃন্দ ক্ষতিগ্রস্থ হবেন এবং বাধ্য হয়ে তারা লাভজনক অন্য ফসল উৎপাদনের দিকে ধাবিত হবেন, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেবে। এ অবস্থা হতে মুক্ত হতে হলে অবিলম্বে আমদানীকৃত খাদ্য স্থানীয় বাজারে ছেড়ে দিয়ে চালের মূল্যকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা এবং স্থানীয় বাজার হতে ধান ও চাল সংগ্রহ করে আপদকালীন মজুদ করে তোলার জন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

ধান-চালের মূল্য নির্ধারণ ও সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে গড়িমসি
গত কয়েকবছর এপ্রিল মাসেই খাদ্য পরিধারণ ও মূল্যায়ণ ধান ও চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ও মূল্য নির্ধারণ করেন। গতবছর ধানের ক্রয়মূল্য ১৭ টাকা এবং চালের ক্রয়মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। চালের নির্ধারিত মূল্য বাজারের চেয়ে কম হওয়ায় সরকার পরবর্তীতে প্রতি কেজি চালের মূল্যে ৩ টাকা ভতুর্কি প্রদান করে ক্রয়মূল্য ২৮ টাকা নির্ধারণ করেছিল। এ মাসের শুরুতে খাদ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, খাদ্য পরিধারণ ও মূল্যায়ণ কমিটির বৈঠকে ২৮ টাকা দরে স্থানীয় বাজার হতে ৬ থেকে ৭ লাখ টন চাল সংগ্রহের প্রস্তাবনা দেয়া হবে। গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, খাদ্য বিভাগ প্রতিকেজি ধান উৎপাদনের ব্যয় ১৫ টাকা ও চাল উৎপাদন ব্যয় ২৩.৫০ টাকা হিসাবে প্রতিকেজি ধান ১৯ টাকা এবং প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকা মূল্যে ক্রয়ের প্রস্তাবনা পাঠিয়েছিল খাদ্য পরিধারণ ও মূল্যায়ণ কমিটিতে পাঠিয়েছিল।

কিন্তু ইতিমধ্যে বোরো ধান কাটার মৌসুম প্রায় শেষ হতে চলেছে, কৃষক পর্যায়ে বোরো ধান বিক্রিও শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু ধান ও চালের মূল্য নির্ধারণে এ পর্যন্ত সরকারের খাদ্য পরিধারণ ও মূল্যায়ণ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত করতে পারেনি। আমরা জানতে পেরেছি, দুই দুইবার খাদ্য পরিধারণ ও মূল্যায়ন কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত করার তারিখ নির্ধারিত হলেও উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত তা অনুষ্ঠিত হয়নি।
সরকারের এমন দোদুল্যমানতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, অন্যদিকে লাভবান হচ্ছেন ফড়িয়া ব্যবসায়ী, আড়তদার ও মিলমালিকেরা। ধানের মূল্য নির্ধারণ করতে গড়িমসি করায় স্থানীয় বাজার হতে ফড়িয়া আড়তদার ও মিলমালিকবৃন্দ নিম্নমূল্যে ধান সংগ্রহ করছেন। এর ফলে কৃষকরা ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকবৃন্দ উৎপাদিত ফসলের লাভজনক মূল্য না পাওয়ার কারণে ক্রমাগতভাবে দারিদ্র্যতার মধ্যে পতিত হবেন এবং সরকারকেই সেই দারিদ্রতা নিরসনের জন্য পুনরায় বাজেটে অধিক বরাদ্দ প্রদান করতে হবে।

ফড়িয়া, আড়তদার ও মুনাফাভোগী চাল ব্যবসায়ীদের কবল হতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের রক্ষা ও দারিদ্র্যতার দুষ্টচক্র হতে কৃষকের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা প্রদান করতে অবিলম্বে ধান ও চালের ক্রয় মূল্য ও সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের জন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণে বিভ্রান্তি
মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ধানের উৎপাদন মূল্য ঝিনাইদহের হিসাবে প্রতি কেজি ২১.৩৫ টাকা এবং গাইবান্ধার হিসাবে প্রতি কেজি ১৭.০৬ টাকা । কিন্তু সরকারি পর্যায়ের কৃষি বিশেষজ্ঞগণ প্রকৃত উৎপাদন খরচ হিসাব করতে ব্যর্থ হচ্ছেন এবং মাঠ পর্যায় হতে সরকারকে হ্রাসকৃত উৎপাদন ব্যয় সরবরাহ করছেন। রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ হতে ধানের উৎপাদন ব্যয় কেজি প্রতি ১২.০৫ টাকা হিসাব করা হয়েছে। গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ি, সরকার প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন মূল্য ১৫ টাকা হিসাব করেছেন। দুটি হিসাবের সাথে মাঠপর্যায়ের হিসাবের গড়মিল বিদ্যমান।

ধানের মূল্য নির্ধারণে সরকারি বিশেষজ্ঞগণ মূলতঃ বৈজ্ঞানিক চাষাবাদের ধারণা প্রয়োগ করেন, যা বাংলাদেশের কৃষকের উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে প্রায়শই সংহতি পূর্ণ নয়। বীজ, সার, জন দিবস, জমি কর্ষণ, সেচের সরকারি তথ্য ও মূল্যের সাথে সাধারণের কৃষকের উৎপাদন ব্যবস্থার তথ্য ও মূল্যের মধ্যে সুষ্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। বিশেষ করে সেচ, জমি কর্ষণ ও জন দিবস হিসাবের সরকারি তথ্য ও মূল্যের সাথে ফারাক অনেক। আবার সরকারি তথ্যে ধান উৎপাদনে জৈব সার ব্যবহারের তথ্য একেবারেই অনুপস্থিত, অথচ কৃষকবৃন্দ জানাচ্ছেন, বোরো ধান উৎপাদনে রাসায়নিক সারের পাশাপাশি প্রায় চার-সাড়ে চার হাজার টাকার জৈব সার ব্যবহার করা হয়।

এসব বিভ্রান্তি দূরীকরণের জন্য স্থানীয় পর্যায়ের কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণে ধানের উৎপাদন ব্যয় হিসাব করা প্রয়োজন এবং লাভজনক মূল্যে ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০% লাভে ধানের বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ঝিনাইদহের হিসাবে প্রতি কেজি ২৫.৬২ টাকা এবং গাইবান্ধার হিসাবে ২০.৪৭ টাকা। অর্থাৎ খাদ্য পরিধারণ ও মূল্যায়ন বিভাগ হতে প্রতি কেজি ধানের ক্রয়মূল্য ২০.৪৭ টাকা হতে ২৫.৬২ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা উচিত।

চালের মূল্য বৃদ্ধির আশংকায় ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্তহীনতা
সরকার সরাসরি কৃষকের নিকট হতে ধান ক্রয় করলে চালের মূল্য বৃদ্ধি পাবে – এমন একটি ধারণা প্রচারণায় প্রাণ পাচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দৃষ্টি হতে এটি খুব বেশি যুক্তিযুক্ত নয়। রাষ্ট্রের জনগনের কল্যাণের জন্য সরকার খাতভিত্তিক ভতুর্কি প্রদান করেন। কৃষিখাতের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যও সরকার বিদ্যুৎ, সারসহ অন্যান্য কৃষি উৎপাদন সহায়ক যন্ত্রপাতি ও উপকরণের উপর ভতুর্কি প্রদান করেছেন। একই ভাবে, সরকার ধান ক্রয়ের উপর ভতুর্কি প্রদান করে চালের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। সরকার যদি কৃষকের নিকট হতে প্রতি কেজি ধান ২৫ টাকা দরে ক্রয় করেন এবং প্রতি কেজি ধানে ৫ টাকা ভতুর্কি প্রদান করেন, তবে চাল উৎপাদনের জন্য ধানের প্রকৃত ক্রয়মূল্য হবে ২০ টাকা; প্রতি কেজি ধান ২২ টাকা দরে ক্রয় করলে চাল উৎপাদনের জন্য ধানের প্রকৃত ক্রয়মূল্য হবে ১৭ টাকা।

বাংলাদেশের কৃষির প্রাণ কৃষকের জীবন ও জীবিকাকে সুনিশ্চয়তা প্রদানের জন্য সরকারকে এই ভতুর্কি প্রদান করে সরকার শুধু কৃষিবান্ধব নয়, কৃষকবান্ধবও বটে, এটা প্রমাণ করতে হবে।