ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

বাস্তবতা ও পরিবেশের চাপে পড়ে প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব সত্ত্বাকে হত্যা করছে এবং বাস্তবতা ও পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি কৃত্রিম সত্ত্বার বিকাশ ঘটাচ্ছে। নিজস্ব সত্ত্বাকে হত্যার এই বিষয়টি নিয়ে মানুষ চিন্তা-ভাবনা করারই সময় পায় না। সারাটি জীবন কেটে যায়, বেশিরভাগ মানুষ বুঝতেই পারে না ‘কি কৃত্রিম জীবনযাপন’ করলেন তিনি, যা তার চাওয়া ছিল না।

একটি শিশু যখন জন্ম গ্রহণ করে, তখন সে জানে না, কেন সে জন্ম নিয়েছে, কিই বা তার কর্তব্য। জন্ম মাত্রই সে কান্না শুরু করে বিশাল এই ব্রক্ষ্মাণ্ডের পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পেরে। তারপর ক্ষুধা মেটানো। শুরু হয় জীবনের অভিজ্ঞতা। পিতা-মাতা ও পরিবার পরিজন নিজেদের অতৃপ্ত আশা-আকাঙ্খা বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখে শিশুটিকে ঘিরে। শিশুটিকে মানুষ করতে হবে। মানুষ করার জন্য শুরু হয় নিজেদের ভুলের তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলি হতে শিশুটিকে সরিয়ে রেখে নিজেদের তৈরী করা ফ্রেমওয়ার্কে শিশুটিকে হাঁটতে শেখানো। স্কুলে যেতে হবে, পড়তে হবে, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-কম্পিউটার-এমবিএ করতে হবে। শিশুটি কি চায়, সেটা বড় কথা নয়, আমরা কিভাবে শিশুটিকে কিভাবে দেখতে চাই, সেভাবে তাকে গড়ে তোলার জন্য চলে আপ্রাণ প্রচেষ্টা। কারণ জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, কোনটা ভুল আর কোনটা শুদ্ধ? প্রশ্ন হলো- কোনটা ভুল আর কোনটা শুদ্ধ – এটা আমরা নির্ধারণ করছি কিসের নিরিখে? নিশ্চয়ই ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার নিরিখে। প্রশ্ন কি আসতে পারে না, ব্যক্তিটির ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতাটিই যে বিচারের মানদণ্ড, সেটিও ভুল হতে পারে? বাটখারাই যদি ভুল হয়, তবে ওজনে যে ভুল হবে, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে? ‘এতসব বিচার-বিশেষণ দিয়ে জীবন চলে না। সবচেয়ে বড় কথা, শিশুটি ব্যক্তিটির নিজস্ব সম্পদ। সুতরাং নিজস্ব সম্পদের ব্যবহার কিভাবে হবে, তা ব্যক্তিটিই নির্ধারণ করবেন, অন্য কেউ নয়।’

চিন্তার এই টানাপোড়েনে শুরু হয় প্রতিটি শিশুর বিকাশ ও জীবন। সেই সাথে যুক্ত হয়, পাড়া-প্রতিবেশি, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-স্বজন, কর্মস্থল, হিংসা-হানাহানি, যুদ্ধ, সাহিত্য, ইতিহাস, প্রেম, ভালবাসা, বিদ্বেষ, প্রকৃতি ইত্যাদি। বেড়ে ওঠে শিশু, কিশোর, যুবক এবং ইত্যাদি, ইত্যাদি। বেড়ে ওঠার সাথে সঞ্চিত হয় বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, যে অভিজ্ঞতায় তৈরী হয় নিজস্ব সত্ত্বা, যার সাথে সংঘর্ষ বাধে পরিবার-পরিজনের চাওয়া-পাওয়া ও টিকে থাকার প্রশ্ন এবং নিজস্ব সত্ত্বাটির রূপান্তর ঘটে, তৈরী হয় দ্বিতীয় একটি সত্ত্বা, যে সত্ত্বাকে বহন করে চলি আমরা, যেটি আমার নয়, কিন্তু বহন করতে হয়।

কৃত্রিম এই দ্বিতীয় সত্ত্বাকে বহন করে চলায় অভ্যস্ত আমরা সবাই। জীবনের লক্ষ্য তাই নির্ধারিত হয় ভ্রান্তিতে। যে ভ্রান্তিতে সুখ থাকলেও শান্তি থাকে না, আবার শান্তি খুঁজে নিলেও স্বস্তি মিলে না। নিজেকে প্রতারিত করি আমরা এভাবেই প্রতিদিন প্রতিনিয়ত।

শিশু বেড়ে উঠবে পিতা-মাতার আশ্রয়ে ও নির্দেশে, পরিবেশ ও পরিস্থিতির বাস্তবতায় সেই শিশু হয়ে উঠবে নিজস্ব সত্ত্বা বিবর্জিত কর্মমুখী যুবক, তারপর সংসার, পৃথিবীতে আসবে আরেকটি শিশু, তারপর একদিন একটা জীবনের সমাপ্তি। এটাই তো হলো আমাদের সাধারণ জীবনের ইতিবৃত্ত, যার পরিক্রমায় আমরা সবাই ঘুরছি আর ঘুরছি এবং হঠাৎ একদিন উল্কাপিণ্ডের মতো পতিত হচ্ছি নিজস্ব বলয় হতে, সমাপ্তি ঘটছে একটি জীবনের।

জীবনের এই সারবস্তুর ভিতরেই চলছে মানুষ হওয়া না হওয়ার প্রশ্ন, খ্যাতি-ক্ষমতা-সম্মানীয়-অমর হওয়ার প্রচেষ্টা, প্রেম-ভালবাসায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভরে তোলার আত্মতৃপ্তি কিংবা হিংসা-দ্বেষ-হানাহানি-যুদ্ধে নিজস্ব প্রতাপ তৈরীর আত্মঅহমিকা।

জীবনের সন্ধিক্ষণে যদি এখন কাউকে প্রশ্ন করা হয়, কি উদ্দেশ্য ছিল এই জীবনের? উত্তর আসবে – কিছুই হলো না। আবার যদি প্রশ্ন করা হয়, কি হলো না? উত্তর হয়ত আসবে – যা চেয়েছি, তার হয়নি, যা পেয়েছি, তা চাইনি। প্রশ্ন যদি আবারো আসে – কি চেয়েছ? উত্তর আসবে , ‘সুখ-শান্তি-স্বস্তি, সুন্দর স্বরণীয় একটা জীবন’। নিজস্ব সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে সুখ-শান্তি হয়তোবা মেলে কিন্তু স্বস্তি মেলে কি কখনো? অর্থশালী-বিত্তশালী-ক্ষমতাবান হয়ে খ্যাতিমান হওয়া যায়, সম্মানীয় ও স্মরণীয় হওয়া যায় না নিশ্চয়ই।

নিজস্ব সত্ত্বাকে প্রশ্ন করো – কি ছিল জীবনের উদ্দেশ্য? উত্তর আসবে – মানুষ হিসাবে গর্বিত হওয়ার সম্মান। দ্বিতীয় সত্ত্বাকে প্রশ্ন করো – কি ছিল জীবনের উদ্দেশ্য? উত্তর আসবে – ধন, সম্পত্তি, সন্তান-পরিজনের নিরাপত্তা, সফল হওয়ার খ্যাতি, যশঃ, অহংকার।

জীবনটাই কেটে যায় আসলে দ্বিতীয় সত্ত্বার নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু সন্ধিক্ষণে চলে আসে নিজস্ব সত্ত্বার নিয়ন্ত্রণ, যেখান হতে হয়েছিল জীবনের শুরু, শেষটা কিন্তু সেখানেই। এই হিসাবে গড়মিল হওয়াতেই যত সমস্যার উৎপত্তি। সমস্যাটি প্রাকৃতিক নয়, সমস্যাটি সামাজিকীকরণের, যার দায়ভার বহন করতে হবে প্রতিটি জীবিত মানুষকে। সমাধান যারা টানতে পারেন, তারাই স্মরণীয়, বরণীয় যুগে যুগে, ইতিহাসের পাতায়। যে জীবন শুধু পেতে চায়, সেটা মানুষের জীবন নয়, সেটা হলো দ্বিতীয় সত্ত্বার অহমিকা। যে জীবন শুধু দিতে চায়, সেটাই হলো নিজস্ব সত্ত্বার বহির্প্রকাশ। মানুষ হিসাবে জন্ম নেয়ার সার্থকতা এখানেই। যেখানে সুখ থাকে, শান্তি থাকে, স্বস্তি থাকে প্রতিটি পদক্ষেপে।