ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, মতামত-বিশ্লেষণ

আমার একজন ফেসবুক বন্ধু, যাকে দেখি নাই কোনদিন, কিন্তু ফেসবুক স্টাটাসগুলো পড়েই এরকম আসক্তি জেগে ওঠে মানুষটির প্রতি। এই ফেসবুকের মাধ্যমেই জানতে পারলাম তিনি একজন জনপ্রিয় লেখকও বটে। বেশিরভাগ স্টাটাস জুড়েই থাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মধ্য দিয়েই ফুটে উঠে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চিত্র। খুব বেশি পছন্দ লেখার স্টাইল। লেখার মাধ্যমেই জানা হয় বন্ধুটিকে, দেখার প্রয়োজন বোধ হয়নি কখনো।

আজ দেখলাম, তিনি একটি স্টাটাস দিয়েছেন: এক লোক গেছে ড্রাইভিং লাইসেন্স আনতে। তারে দেখানো হলো জেব্রা ক্রসিংয়ের ছবি,গিয়ারবক্স, রোড সাইন এগুলো। সে বলল- কিছুই চিনি না। পরিদর্শক বললেন, ‘তোমার তো বেসিকই নাই, লাইসেন্স দেয়া হবে না।’ লোকটা একটা ছবি বের করে বলল, ‘ইনারা আমাকে পাঠিয়েছেন।’ পরিদর্শক বলল, ‘ইনারা কে?’ লোকটি বলল, ‘একজন মন্ত্রী আবুল হোসেন, আরেকজন নৌ মন্ত্রী শাজাহান খান।’ পরিদর্শক লিখে দিলেন, ‘লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে। সরকারের মন্ত্রী বলেছেন গরু ছাগল চিনলে লাইসেন্স দেয়া যাবে। আবেদনকারীর এই যোগ্যতা প্রমানিত হয়েছে।’

স্টাটাস দেখার ঠিক পূর্ব মুহূর্তেই এনটিভিতে শাজাহান খানের সংবাদ সম্মেলনের সংবাদটি শুনেছিলাম। তারপর এই স্টাটাসটি দেখে একটু খটকা লাগলো। মূল বিষয়টিকে কেমন যেন একটু উল্টে দেবার চেষ্টা লক্ষ্য করলাম স্টাটাসটিতে। যার লেখা এতো পছন্দ, তিনি এরকম তথ্য বিকৃতি ঘটাবেন, এটা আশা করিনি।

সেকারণে না দেখা বন্ধুটিকে অচেনা একজন বন্ধুর মতামতটি জানানোর প্রয়োজন বোধ করে একটি মন্তব্য লিখলাম: শাহাজাহান খান বললেন, জেব্রা ক্রসিং, গিয়ারবক্স, রোড সাইন এগুলো তো চিহ্ন, ছবির মতো! যারা গরু-ছাগলের ছবি চিনতে পারে, তারা এই চিহ্নগুলোও চিনতে পারবে। তাই শিক্ষাগত যোগ্যতা কমিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে নাম সাইন করতে পারে, তেমন ব্যক্তিদের পরীক্ষা নিয়ে লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নাহলে বাস চালানোর জন্য ড্রাইভার খুঁজে পাওয়া যাইবে না, বাধ্য হয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থা কমিয়ে দিতে হবে। যারা এই বিষয়ে নৈতিকতার কথা বলছেন, তাদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মন্ত্রী। মন্ত্রীর বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে ইতিমধ্যে নৈতিকতার প্রশ্নে মন্ত্রীর নিকট হেরে গেলাম আমরা। কিন্তু লজ্জা পাওয়ার বালাই নেই। সত্যি সত্যি লজ্জাতেও প্রিজারভেটিভ মেশানো হয়েছে দেখছি।

সকল বিখ্যাত-অখ্যাত, জ্ঞানী-অজ্ঞানী, অসাধারণ-সাধারণ, নেতা আর আমজনতা যেখানে আমরা চিন্তা ও চেতনায় সবাই এক, সেই সেই জায়গাটিতেই এসে পড়লাম মন্তব্যটি লেখার কারণে। লেখকের আরেক বন্ধু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইলেন, লজ্জার বালাই নেই, কথাটি আমি কাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছি?

স্টাটাস আর মন্তব্য পড়লেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবার কথা। তবুও যখন ঐ বন্ধুটি জানতে চাইছেন, তখন উনার মন্তব্যের উত্তরে লিখেছিলাম: যারা আগে পিছে চিন্তা না করে সবকিছুতেই হুক্কা হুয়া করে, তাদের উদ্দেশ্যে।

এরপর ঐ বন্ধুর সাথে ফেসবুকে মন্তব্যের কথোপকথনটি ছিল এই রকম:

– ওকে, সরাসরি প্রশ্ন করি। “মন্ত্রীর বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে ইতিমধ্যে নৈতিকতার প্রশ্নে মন্ত্রীর নিকট হেরে গেলাম আমরা।”- আমাদেরকে বলছেন?

– আপনি মনে হয় একটু ক্ষুব্ধ হচ্ছেন! কোন প্রশ্নের উত্তর চাইছেন আপনি জানি না। আমি কোন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে কথাটি লিখিনি। আমরা প্রতিদিন আমাদের আচরণে, কথা-বার্তায় যে ঋণাত্মক সংস্কৃতি সৃষ্টি করছি, তার ধকল তো আমাদের সইতেই হবে। অথচ …সেই সংস্কৃতিই সৃষ্টি করছি আমরা প্রতিদিন। যখন ধকল আসছে, তখন শুরু হচ্ছে একসুরে শুরু করছি হুক্কা-হুয়া, সব গেল, সব গেল অবস্থা। কিন্তু চোখ বন্ধ করে ভাবুন, এর জন্য দায়ী আপনি আমি আমরা সবাই। ব্যক্তি এখানে আপেক্ষিক বিষয়। এবার আপনাকে একটি প্রশ্ন করি, আপনি কিংবা আপনার বন্ধুদের মধ্যে কেউ কি কখনো ড্রাইভার হিসাবে চাকুরি করে জীবনযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? যদি নিয়ে থাকেন, তবে সেটা সুসংবাদ। আর যদি না নিয়ে থাকেন, তবে আপনিও হুক্কা-হুয়ার দলে।

– হ্যাঁ, আমি ক্ষুদ্ধ হয়েছি, আপনি ঠিক ধরেছেন। আপনি — প্রোফাইলে এসে মন্তব্য দিচ্ছেন — কে অপমান করে। করেননি? “মন্ত্রীর বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে ইতিমধ্যে নৈতিকতার প্রশ্নে মন্ত্রীর নিকট হেরে গেলাম আমরা। কিন্তু লজ্জা পাওয়ার বালাই নেই। সত্যি সত্যি লজ্জাতেও প্রিজারভেটিভ মেশানো হয়েছে দেখছি।” এটা কি ধরনের কথা? আমরা কি সবাই ভুল শুনেছি আর আপনি একাই সত্য শুনেছেন? উনি বলেন নাই গরু ছাগলকে চিনলে তাকে লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে? নিচে লিংক দিলাম, খবরটা আবার নিজ চোখে দেখে আসুন, তারপর কথা বলুন। [সূত্র] মন্ত্রী বলছেন তাদের লিখিত পরীক্ষা বাদ দিয়ে বাকি পরীক্ষা নিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া হয়। আমি আজ নিজে চট্রগ্রাম বি আর টি এ তে গিয়েছিলাম আমার মোটর সাইকেলের ব্লুবুকের জন্য। ওখানে যারা লাইসেন্স দেন তাদের কাছ থেকে শুনে এসেছি, মন্ত্রী এর আগের বার যখন এভাবে লিষ্ট ধরিয়ে দিয়েছিলেন তারা সবাই কোন পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স নিয়ে গেছে। শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা এসে এক সাথে লাইসেন্স নিয়ে গেছে- যারা লাইসেন্স পেয়েছে তাদের কষ্ট করে বি আর টি এ তে পর্যন্ত আসা লাগে নাই। এগুলা কি ভাই ফাজলামি? মন্ত্রী যদি লিখিত পরিক্ষার না নেওয়ার কথা বলেন, গ্রাউন্ড লেভেলে গিয়ে এর ব্যাখায় দাঁড়ায় কোন পরীক্ষারই প্রয়োজন নাই। মন্ত্রীর পক্ষ নেয়ার আগে আগামীকাল একটু কষ্ট করে বি আর টি এ তে গিয়ে কথা বলে আসুন তার পর এসব লিখুন। ধন্যবাদ।

– ব্যক্তিটিকে আমি চিনি এই ফেইসবুকের মাধ্যমে, সরাসরি দেখিনি কোনদিন। কিন্তু ব্যক্তিটিকে আমি যতোটা সম্মান করি এবং বুঝতে পারি, আপনার এমন রুদ্ররূপ দেখে বুঝতে পারছি আপনি হয়তো ততোটা উনাকে সম্মান দিতে ও বুঝতে পারেন না। তাই সম্মান আর অসম্মানের বিষয় নিয়ে আপনার সাথে বাহাস করতে চাই না। আপনি যে লিংক দিয়েছেন, সেই টিভির সংবাদটা দেখুন। কাল সকাল পর্যন্ত হয়তো সংবাদটা দেখাবে। নিজেই শুনুন বক্তব্যগুলো।

বন্ধুটি খুবই ক্ষিপ্ত হয়েছেন। উনার বন্ধুকে অপমান করা হয়েছে, এটাও বলেছেন। কিন্তু উনারা যে জ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে গোটা জাতিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন এবং এটা যে আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব সংকট তৈরী করছে, সেটা একবারও ভাবলেন না। মুক্তবুদ্ধির চর্চা করতে এসে অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবার জ্ঞান এনারাই বিতরণ করেন, কিন্তু নিজে সেটার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে পারেন না, সমস্যাটি এখানেই।

রাজনীতি নিয়ে যখন কেউ কথা বলেন, তিনি হয়ে যান আওয়ামীলীগ কিংবা বিএনপি, অর্থাৎ বক্তব্য আওয়ামীলীগের বিপক্ষে গেলে চিহ্নিত করা হয় বিএনপি; আর বিএনপির বিপক্ষে গেলে ধরেই নিই তিনি আওয়ামীলীগ। দেশটা যেন আওয়ামীলীগ আর বিএনপি’র – এর বাইরে কিছু নেই। আমরা যারা আমজনতা, তারাই করি এই কাজটি; আবার অন্য কেউ এই একই কাজটি করলে বিরক্তি ভাব প্রকাশ করি, চিন্তার সংকীর্ণতা বলে আত্বতৃপ্তি লাভ করি।

বন্ধুটি উল্লেখই করে ফেলেছেন, আমি মন্ত্রীর পক্ষে কথা বলছি এবং পরামর্শ দিয়েছেন লেখার আগে যেন গ্রাইন্ড লেভেলে এর অবস্থা কি দাড়ায়, সেটা দেখার জন্য যেন বিআরটিএ তে কথা বলি। আমার কথাবার্তা এক নি:শ্বাসে পড়লে এমনটা যে মন হবে, সেটা আমিও বুঝতে পারছি। কিন্তু যদি একটু মাথা খাটিয়ে দেখি, তবে হয়তো বন্ধুটিও বুঝতে পারতেন, আমি মন্ত্রীর পক্ষ নিচ্ছি না বরং মন্ত্রীর একটি ছোট কথাকে সমর্থন করছি মাত্র, যা বর্তমান পরিস্থিতি বিচারে যুক্তির বিচারে সবাই সমর্থন করতে বাধ্য।

আমি একটি প্রশ্ন করেছিলাম মন্তব্যে, যার উত্তর পাইনি। প্রশ্নটি ছিল এরকম: আপনি কিংবা আপনার বন্ধুদের মধ্যে কেউ কি কখনো ড্রাইভার হিসাবে চাকুরি করে জীবনযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? যদি নিয়ে থাকেন, তবে সেটা সুসংবাদ। আর যদি না নিয়ে থাকেন, তবে আপনিও হুক্কা-হুয়ার দলে।

সারাদেশের পরিবহন সেক্টরে যারা ড্রাইভার হিসাবে কাজ করেন কিংবা এখনও কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, তাদের প্রায় সবাই নিরক্ষর কিংবা অক্ষর-জ্ঞান সম্পন্ন। তারা কোন কিছু সাজিয়ে লিখতে পারবেন, এমনটা আশা করা যায় না। দু:খজনক হলেও সত্য আমরা তাদের শিক্ষিত করতে পারিনি, অন্যদিকে কোন শিক্ষিত মানুষ বাস-ট্রাক-লরীর ড্রাইভার হবার স্বপ্ন এখনো দেখছেন না বা দেখার প্রয়োজন পড়ছে না। কিন্তু একজন সাধারন মানুষ ড্রাইভার হবার স্বপ্ন দেখছেন, ড্রাইভার হতে চাইছেন – আমাদের মতো শখে নয়, জীবিকার তাড়নায়। বিআরটিএ-এর দুর্নীতির কথা সবাই বলেছেন, যেখানে লাইসেন্স পাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও লিখেছেন। এমন এক পরিবেশে একজন সাধারন মানুষ সাধারন উপায়ে ড্রাইভারের লাইসেন্স পাবেন, এমনটা হলে খুব ভালো হতো, কিন্তু একবাক্যে সবাই স্বীকার করবেন, এমনটা ঘটার কোন সম্ভাবনা নেই। যদি আমার শিক্ষিত বন্ধুরা বাস-ট্রাক-লরী চালাবার চাকুরিটা নিতেন, তাহলে এতো কথা বলার কোন প্রয়োজনই ছিল না। আবার সহজ উপায়ে সাধারন নিরক্ষর মানুষটি যে ড্রাইভার হবেন, সেটাও আমরা এখনই বন্ধ করতে চাচ্ছি। আবার সেটা যদি সরকার এখনই বন্ধ করে দেয়, কালকে নিজের এবং বউ-বাচ্চাদের দিনরাত ২৪ ঘন্টা মার্কেটে যাওয়া, আড্ডায় যাওয়া, অফিসে যাওয়া, বিনোদনে যাওয়ার জন্য ড্রাইভার খুজে পাওয়া যাবে না। তখনও শুরু হবে আমাদের হুক্কা-হুয়া।

মূল প্রসঙ্গটি হলো, একজন ড্রাইভারের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাস্তাঘাটের সাইন চেনা এবং গাড়িটি ভালভাবে চালানোর দক্ষতা। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিকতা। প্রথম দুটি বিষয়ে স্বাক্ষর-নিরক্ষর সবাই দক্ষতা অর্জন করতে পারবে, আমার বন্ধুগণ তো পারবেনই কিন্তু দু:খজনক হলেও এখনও সত্য, মানবিকতার প্রশ্নে আমরা শিক্ষিত মানুষেরা সাধারন নিরক্ষর মানুষের চেয়ে অনেক বেশি অযোগ্যতাসম্পন্ন, যে যোগ্যতাটিকে অর্জন করার চেয়ে হারাইতেই বেশি উৎসাহ বোধ করছে। তর্কের খাতিরে নয়, বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। উপলব্ধিতে আসবে।

সেকারণে যখন শাজাহান খান বলেন, রাস্তার সাইনগুলো তো ছবি। নিরক্ষর মানুষ যদি গরু-ছাগল চিনতে পারে, তবে রাস্তার সাইনও চিনতে পারবে। তাই তাদের লিখিত পরীক্ষা ছাড়া গ্রাইন্ড টেস্টের মাধ্যমে ড্রাইভার নিয়োগ দেয়ার দাবি করেন। এই বক্তব্যটির প্রতি আমার সমর্থন ছিল। ভাগ্য বা দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা শাজাহান খান বলেছেন, সেটা আমার যে কোন শক্র বললেও আমি তাতে সমর্থন জানাতাম। তবে এই পরিস্থিতি যাতে না থাকে, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্যও তৎপর থাকা জরুরি, সেটার বিরুদ্ধে কিন্তু আমি বলিনি। বলিনি যে, যা চলছে, এটাই চলুক। বরং বলেছি, এটা বর্তমানের জন্য জরুরি বিষয়, আগামীতে এটা জরুরি বিষয় হিসাবে থাকুক, এটা অবশ্যই সমর্থন করিনি।

আজ সকালে কম্পিউটার খুলেই দেখলাম, যার স্টাটাস এ মন্তব্য করা নিয়ে এই দীর্ঘ সময়ের অপচয়, তিনি মন্তব্য করেছেন। যেহেতু রাতে জেগে ছিলাম না, তাই পর পর উনার দুটি মন্তব্য দেখতে পেলাম। মন্তব্যগুলো এরকম:

– তেনা পেঁচাইতে ভালো লাগতেছে না এই মাইঝরাতে। সরাসরি বলেন, আপনি কি জানেন যে ইতিমধ্যে ১০ হাজার লোক সরাসরি লাইসেন্স নিয়ে গেছে কোনো ধরণের গরু ছাগল চেনার পরীক্ষা ছাড়াই? যদি জানেন এবং সমর্থন করে থাকেন, তাহলে আপনার সঙ্গে কথা বলাটা পুরাটাই অপচয়। আর যদি না জানেন, তাহলে এইটা এখন জেনে নেন। এবার আপনার মাননীয় মন্ত্রীরে গিয়া জিগাইবেন, যে ১০ হাজার লোক লাইসেন্স নিছে কোনো পরীক্ষা না দিয়াই, ইভেন বিআরটিএতে না গিয়াই, এদের গাড়ির সামনে পড়ে যদি আমি মরে যাই, তাহলে আমার আম্মা আর আমার মেয়ের দায়িত্ব কোন শুওরের বাচ্চা নিবে? আপনি যারে হুক্কাহুয়া মনে করেন, আমরা এরে প্রতিবাদ মনে করি। এই প্রতিবাদের জন্যই আজকে আপনার নৈতিক উন্নত চরিত্রের মন্ত্রী মিনমিন করে বলতেছে, সে লিখিত পরীক্ষা না নিয়ে লাইসেন্স দেয়ার কথা বলছে, পুরা পরীক্ষা বাদ দিতে বলে নাই। তার কোন বাপে পরীক্ষা নিছিল সেই ১০ হাজারের? সে এইটা জানে নাই যে বস্তা ভরে লিস্টি দেখে লাইসেন্স দেয়া হইছে? এই ১০ হাজারের বেলায় এই মন্ত্রী এবং তার নৈতিক উন্নত চরিত্রের ভক্ত হিসেবে আপনার বক্তব্য জানতে আমি আগ্রহী।

পরবর্তী ২৪ হাজারের আলাপ আমি এর পরে করতে পারব।

– আমাদের দেশে ইদানীং দেখি নতুন একশ্রেনীর উদ্ভব হয়েছে, এরা নিজেরা তো প্রতিবাদ করেই না, অন্য কেউ প্রতিবাদ করলেও এরা সেইটার মাঝে এসেও জ্ঞানের নহর ফলায়। এই সব সর্বংসহা মানুষদের সব কিছু মেনে নেয়ার চরিত্রে ইদানীং আমি আসলেই বিরক্ত, কিন্তু এদের সংখ্যা যে বাড়তেছে সেটা দেখে বেশি আতংকিত। বিচিত্র কী এই দেশে গরু ছাগল চিনলে লাইসেন্স দেয়া হবে। কম বড় যোগ্যতা না এইটা। সবগুলারে চিনা-ই তো মুশকিল।

আসলে গরু-ছাগলদের চেনাই মুশকিল। গরু-ছাগল যদি এসে কাউকে বলে তুই গরু, তুই ছাগল, তবে কি আর বলার আছে। নিরবে মেনে নিতেই হবে। গরুরা যদি মানুষকে ছাগল বললেই তো আর মানুষ ছাগল হয়ে যাবে না।

পুনশ্চ: কোনরকম টেস্ট ছাড়াই লাইসেন্স দেয়ার দাবি, ঘুষ নিয়ে লাইসেন্স দেবার কথা, লাইসেন্স বাণিজ্য ইত্যাদি- এগুলো এই আলোচনার বিষয় নয়। তারপরও জানিয়ে রাখি, এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হোক এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিচার হোক; সেটা শাজাহান খান কিংবা অন্য যেকেউ হোক মন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রী হোক। এর বিরুদ্ধে যাওয়ার কোন অবকাশ নেই। কিন্তু আলোচনার বিষয় হলো, তথ্য-উপাত্ত বিকৃত করে উপস্থাপন করা, এর বাইরে কোন আলোচনা এখানে গুরুত্ব পায়নি। যদিও অন্যান্য বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি নিজের অসাড় বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়েছেন, যা আশা করিনি।
টক শো গুলোতে সাধারনত এরকম ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন করা হয় একটা, উত্তর আসে আরেকটার। কারণটা অস্বচ্ছ কিছু নয়, প্রশ্নের সরাসরি কোন উত্তর না থাকা কিংবা প্রশ্নের যৌক্তিকতাকে অন্য প্রসংগ দিয়ে ঢেকে দেবার প্রচেষ্টা। অন্যরা যখন এটা করেন, তখন তা দৃষ্টিকটু লাগে। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রেও তা দৃষ্টিকটু হওয়া উচিত। এটাও আবার নৈতিকতার বিষয়। বলা সহজ, করা কঠিন। বার বার এটাই প্রমাণিত হয়।

নিজের কথার সুরের সাথে সুর না মেলালেই এটাকে জ্ঞান দেওয়া ভাববেন এবং বিরক্ত ও আতংকিত হবেন, এটা কেমন কথা। লেখক ভুলে গেছেন, ফেসবুক ওপেন স্পেস। তাই শুধু আপনিই বলবেন এবং সেটা অন্যদের শুধু হ্যাঁ হ্যাঁ আশা করবেন, এমন চিন্তাটাই তো মুক্তচিন্তার অন্তরায়। চিন্তা শক্তি থাকলে আতংকিত হবেন কেন? এটা চিন্তার দুর্বলতার লক্ষণ। আমার প্রিয় মানুষটি এতোটা দুর্বল চিন্তার অধিকারী, সেটা কিন্তু আমি মনে করি না। আমার বক্তব্যকে সমর্থন করুন, এটাও আমি চাইছি না। বরং যৌক্তিক সমালোচনা করুন। আমি মোটেই আতংকিত হবো না। আর শেষে বলি, নিজেই শুধু প্রতিবাদী ভাবছেন কেন? প্রতিবাদের জন্য থানা-পুলিশ, অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কখনো? প্রতিবাদী হবার কারণে আপনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রাতের অন্ধকারে রাস্তার মধ্যে ফেলে রেখেছিল কিংবা রাস্তায় গায়ের ওপর ট্রাক তুলে দেবার চেষ্টা করেছিল? আপনার বাড়ির প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি রাস্তার দুর্ঘটনায় নিহত হননি? শুধু জানিয়ে রাখছি, উপরের প্রতিটি ঘটনার তিক্ত অভিজ্ঞতা বুকে নিয়েও আজও সুন্দর একটা সমাজের জন্য প্রতিবাদী মানুষের সাথে সর্বদাই আমার বিচরণ। অবশ্যই সেটা ভার্চুয়াল জগতের দায়সারা প্রতিবাদ নয় কিংবা শুধূ অন্যকে প্রতিবাদী হবার জন্য অনুপ্রাণিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।