ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

যে সাধারণ ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এই ফ্যাসিবাদি প্রশাসনের উদ্ভব
১৯৯০ সালের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্রমশঃ অধিক মাত্রায় অগণতান্ত্রিক ও দলীয়কৃত হয়ে পড়তে থাকে। অতীতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোর যে টুকু অর্জন ছিল তা খোয়া যায়। কিন্তু অতি স¤প্রতি ফ্যাসিকরণের যে রূপ দেখা যাচ্ছে -তা প্রধানত রূপ লাভ করে জরুরী অবস্থাকালে। সুতরাং জরুরী অবস্থার চরিত্র সম্পর্কে কিছু কথা এখানে বলা প্রয়োজন।
খুব সংক্ষেপে বললে, নতুন শতাব্দীর শুরু থেকে সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সংকট ব্যাপকভাবে ঘনীভূত হওয়ায় দেশে দেশে তার অনুপ্রবেশ বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে দেখি। এ সময়কালে সাম্রাজ্যবাদ এবং তার আঞ্চলিক ঘাঁটি ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বাংলাদেশে তাদের অনুপ্রবেশ বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। নিজ স্বার্থে তারা দেশ-জাতি-জনগণ বিরোধী অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামরিক-সাংস্কৃতিক পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়। কিন্তু, এই ব্যাপক অনুপ্রবেশ এদেশে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদকে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সংকটে নিক্ষেপ করে। বৈদেশিক ও দেশীয় শক্তিসমূহের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে তাদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামরিক ও অন্যান্য কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন প্রয়োজন হলেও তা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। এই সংকটের মধ্যেই জোট ও মহাজোটের নেতৃত্বে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের দুই অংশের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত রূপ লাভ করে। শাসন ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। সুতরাং, রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের মাধ্যমে শাসন ব্যবস্থাকে ভগ্ন দশা থেকে রক্ষা করা, একে আরো শক্তিশালী ও দমনমূলক করে তোলার মাধ্যমে দেশী-বিদেশী ক্ষমতাসীন শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামরিক ও অন্যান্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে সামগ্রিক সংকট থেকে মুক্তি লাভ করার জরুরী পদক্ষেপ হিসাবে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের প্রত্যক্ষ মদদে ১/১১-র ক্যুদেতা ঘটে। তাদের পরিকল্পনা (কিছু রদবদলসহ) অনুযায়ী নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারের উপর বর্তেছে ফখরুদ্দিন সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার দায়িত্ব। অর্থাৎ, শাসকশ্রেণী ও শক্তিগুলোর জন্য সংকট উত্তরণের জন্য জাতি ও জনগণ বিরোধী পরিকল্পনাসমূহ বাস্তবায়ন করতে হবে আবার এর বিপক্ষে সব ধরণের গণ প্রতিরোধ রুখতে হবে। সুতরাং, এ অবস্থায় রাষ্ট্রের ফ্যাসিকরণ অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তাই নির্বাচিত সরকার হলেও এই ফ্যাসিকরণ বাড়িয়ে তোলা ছাড়া আওয়ামীলীগের গত্যন্তর নেই।

আমাদের সমাজে শোষণ-নিপীড়ন এবং জাতি ও গণবিরোধী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক শক্তি হল ছাত্র ও শ্রমিকশ্রেণী এবং সংগঠিত প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ। এ শক্তিগুলোর দিক থেকেই ফখরুদ্দিনের কণ্ঠরোধী জরুরী সরকার সবচেয়ে তীব্র প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। এই প্রতিরোধের শক্তিগুলোকে দমনের ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফ্যাসিবাদী প্রশাসন উদ্ভব ঘটছে এমনই একটা ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্যে।

শুধু তা-ই নয়, নির্দিষ্টভাবে সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ তাদের স্বার্থে জাতি ও জনগণবিরোধী পথে যেভাবে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে চাচ্ছে-সেখানেও রয়েছে এই ফ্যাসিকরণের সুনির্দিষ্ট উপাদান। বলা যায়, বাংলাদেশের সমাজকে সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ এবং আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ তাদের স্বার্থে জাতি ও জনগণ বিরোধী যে আকারে পুনর্গঠিত করতে চাইছে, তার পরিকল্পনা বা কর্মসূচির অন্যতম হলো উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা বা কর্মসূচি। এই পরিকল্পনা যা বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে “উচ্চশিক্ষার বিশ বছর মেয়াদী কৌশলপত্র” হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রণয়ন করেছে। এতে রক্ষা করা হয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের স্বার্থ এবং জলাঞ্জলি দেয়া হয়েছে জাতি ও জনগণের স্বার্থ। এতে অনিবার্যভাবে রয়েছে ফ্যাসিবাদি ও গণতান্ত্রিক প্রশাসনের বীজ।

দ্রুত পরিবর্তনশীল উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা যার উৎস “উচ্চশিক্ষার ২০ বছর মেয়াদী কৌশলপত্র”: জাতি ও জনগণ বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী কর্মসূচি
মার্কিন রাষ্ট্রদূত সর্বপ্রথম যে তিনটি কাজকে গুরুত্বপূর্ণ বলে পরামর্শ দেয় তার অন্যতম হলো শিক্ষা অর্থাৎ উচ্চ শিক্ষার এই কৌশলপত্র। “উচ্চ শিক্ষার ২০ বছর মেয়াদী কৌশলপত্র” বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ইউজিসি প্রণয়ন করে বিএনপি আমলে। বিশ্বব্যাংক এই খাতে ১৪০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে। ১/১১-এ পরবর্তী সরকারের উদ্দেশ্যে এর গুরত্বপূর্ণ দিক গুলো হলো:

১. এর আওতায় উচ্চশিক্ষায় ছাত্র সংখ্যা সীমিত করা হবে

২. উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ধাপে ধাপে ৫০% হ্রাস করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আভ্যন্তরীণ খাত থেকে বাকী ৫০% ব্যয় বহন করতে হবে। এ আয় বাড়ানো হবে প্রধানত ছাত্রদের বেতন ফি বাড়িয়ে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি, ভবন লীজ দিয়ে, ক্যাফে, সাইবার ক্যাফে বই ইত্যাদির দোকান দিয়ে, নাইট শিফট চালু করে, কনসালট্যান্সি, গ্র্যাজুয়েট ট্যাক্স ও এলামনাইদের কাছ থেকে বাজেটের অর্থ আয় জোগান দেয়া হবে। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্রমাগত বেতন ফি বাড়ানো হচ্ছে। নাইট শিফট চালু, দোকান মার্কেট করাসহ নানাভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হচ্ছে। শিক্ষকরা এমনিতে নাইট শিফট, কনসালটেন্সি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এই পরিকল্পনা সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের জন্য ভাড়া খাটা স্কলারদের যোগান আরও নিশ্চিত করবে। এর বাস্তবায়ন স্বরূপ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ আছে ৪ টি। বেতন ও ভর্তি ফি হলো ২০২০০ টাকা এবং সেমিস্টার ফি বাবদ দিতে হবে ৫০০০ টাকা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে বলা হয়েছে: বার্ষিক পরিচালনা ব্যয় নিরিখে বেতন-ফি নির্ধারিত হবে। রাষ্ট্রীয় ভর্তুকী ক্রমশঃ তুলে নেয়া হবে এবং পঞ্চম বছর হতে ১০০% ব্যয় ভার বিশ্ববিদ্যালয়কে বহন করতে হবে। এভাবে উচ্চশিক্ষার চূড়ান্ত বাণিজ্যিকীকরণ সম্পন্ন করা হচ্ছে। যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর প্রতিষ্ঠিত উচ্চশিক্ষার প্রাইভেটাইজেশান ছাড়া কিছু নয়। অথচ বেসরকারি প্রাইভেট বানিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভর্তূকী দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রাইভেট শিক্ষা ব্যবসাকে আরো লাভজনক করার স্বার্থে। দরিদ্র মেধাবী ছাত্রদের জন্য থাকবে ঋণের ব্যবস্থা কাজ করে এই ঋণ ফেরত দিতে হবে।

৩. এ পরিকল্পনার আওতায় অনধিক ৫০০০ ছাত্র সংখ্যার ক্ষুদ্রাকার ও অনাবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উপর জোর দেয়া হয়েছে। এবং আবাসিক হল নির্মাণ না করার সুপারিশ করা হয়েছে। তার কারণ যাতে ছাত্র রাজনীতি দানা বাঁধতে না পারে। এই কৌশলপত্র ছাত্ররাজনীতি বন্ধেরও সুপারিশ করে। যার কারণ তারা অন্যত্র উল্লেখ করে যে ছাত্র রাজনীতির কারণে বেতন ফি বৃদ্ধি করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। এ থেকে বোঝা যায় এ কৌশলপত্র মূলতঃ প্রগতিশীল ধারার রাজনীতিকেই সমস্যা হিসাবে মনে করে এবং তার বিনাশ কামনা করে। শুধু তা-ই নয়, শৃঙ্খলা রক্ষার নামে ক্যাম্পাস পুলিশ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে এই পরিকল্পনায়। যা উদ্দেশ্য ছাত্রদের উপর পুলিশী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

৪. বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজানো হবে। নির্বাচন রীতির পরিবর্তে সার্চ কমিটির মাধ্যমে ভিসি নিয়োগ দেয়া হবে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনের পরিবর্তে আমলাতান্ত্রিকভাবে সিনিয়রিটির ভিত্তিতে ডীন নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। পাঠক্রম, গবেষণার বিষয় ইত্যাদি ঠিক করার ক্ষেত্রে আমলা, ব্যবসায়ী, এনজিওদের অন্তর্ভূক্ত করা সুপারিশ করা হয়েছে। যার অর্থ হলো সাম্রাজ্যবাদ, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের চাহিদা মাফিক জ্ঞান চর্চা হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করবে এই আমলা-ব্যবসায়ীরা। এভাবে একটি অগণতান্ত্রিক আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে যেখানে সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের চাহিদা পূরণ সুনিশ্চিত করা যাবে।

৫. এই সুপরিশ প্রণয়নকারীদের মধ্যে অধিকাংশই হল বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আমলা ও এনজিও লর্ড। সুতরাং তারা কার স্বার্থ দেখেছেন তা সহজেই অনুমেয়।

৬. এই কৌশলপত্রের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটি হলো উচ্চশিক্ষার বিষয়বস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে কেবল মাত্র ব্যবসায়, তথ্যপ্রযুক্তি, কম্পিউটার ও প্রকৌশল শিক্ষার উপরই গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তারা সাম্রাজ্যবাদী বাজার অর্থনীতির ধারণা শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে ইতিহাস, দর্শন, মৌলিক বিজ্ঞান ও সাহিত্য ও শিল্পকলার ভবিষ্যৎ নেই বলে সুপারিশ করেছে।

কিন্তু আমরা জানি, একটি স্বাধীন জাতীয় বিকাশ ছাড়া কোন সমাজের বৈষয়িক ও আত্মিক অগ্রগতি সাধিত হতে পারে না। আর জাতীয় বিকাশের জন্য প্রয়োজন ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য-শিল্পকলা এবং মৌলিক বিজ্ঞান। সাম্রাজ্যবাদী ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী ব্যবসার সেবা করার জন্য এমবিএ, তথ্য প্রযুক্তিবিদ দরকার হতে পারে, জাতি বিকাশের জন্য নয়। এভাবে একটি পরনির্ভরশীল, জাতি ও জনগণের স্বার্থ বিরোধী উচ্চশিক্ষার কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে-সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে।

উচ্চশিক্ষার পুনর্গঠন: জাতীয়, গণতান্ত্রিক উচ্চশিক্ষা কর্মসূচি
ইউরোপে সামন্তবাদের উৎখাত এবং বুর্জোয়া বিকাশের কালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপর থেকে অভিজাত ও চার্চের কর্তৃত্ব বিলুপ্ত হয়, কূপমন্ডূকতার চর্চার বিপরীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বিকাশের ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। পুঁজিবাদী প্রতিযোগিতা, শিল্প ও পুঁজির বিকাশের প্রয়োজনের ঐতিহাসিক চহিদার কারণেই তৎকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পুনর্গঠন সাধিত হয়েছিল। অর্থাৎ, সমাজের অগ্রগতির তথা পুঁজিবাদের চাহিদা পুরণ হতে পারে কেবল রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ প্রভাবমুক্ত, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অধীনে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অবাধ বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক-গ্র্যাজুয়েট সকলকেই স্কলার হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তাদের যৌথ ও উন্মুক্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাই কেবল পুঁজিবাদ ও সমাজকে অগ্রসর করতে পারত, এটাকে কোন প্রকার কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর মধ্যে ফেলে নয়। সুতরাং, সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল বা বিপ্লবী রূপান্তরের প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হলো শিক্ষার কর্মসূচি এবং তার মধ্যে অবশ্যই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্গঠনের কর্মসূচিও। সুতরাং, গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচি অনিবার্যভাবে হয়ে পড়ে বিপ্লবী কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এটা ছাড়া বিপ্লবী কর্মসূচি পূর্ণতা পেতে পারে না।

উপনিবেশিক দেশগুলোতে যেমন: ল্যাটিন আমেরিকায় পুরনো স্প্যানিশ উপনিবেশ হতে আধাউপনিবেশিক-আধা-সামন্তবাদী সমাজে পরিণত হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সমাজের চাহিদাগুলো রূপ পেয়েছিল। অর্থাৎ অভিজাত ও উপনিবেশিক শক্তির প্রভাব ছিল সমগ্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায়। কিন্তু, পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হলে ল্যাটিন সমাজগুলোতে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ বিকশিত হতে থাকে। ফলে সমাজে এবং শিক্ষা ক্ষেত্রেও তা নতুন চাহিদাগুলোকে হাজির করছিল। ফলে সমাজে শিক্ষার প্রশ্নে এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পুনর্গঠনের নতুন চাহিদা ও চিন্তা হাজির হয়। এরই ফলে ১৯১৯-১৯১৯ সালের দিকে আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংস্কারের দাবী জোরদার হয়। তাদের সংস্কারের দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল:

ক. বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসন ও ছাত্র-শিক্ষক-গ্র্যাজুয়েটদের অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক প্রশাসন ব্যবস্থা।
খ. ক্লাসে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা দূর করা
গ. সমাজ ও গণমুখী কোর্স চালু করা যাতে বিশ্ববিদ্যালয় সমাজের চাহিদার সাথে সংযুক্ত হয়। এসবই ছিল পশ্চাদপদ আধাউপনিবেশক-আধা-সামন্তবাদী সমাজে বিকশিত হওয়া পুঁজিবাদের চাহিদার ফলস্বরূপ। কিন্তু, আধা-উপনিবেশিক-আধা-সামন্তবাদী সমাজে যে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ বিকশিত তার চরিত্র হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের দালাল চরিত্র এবং সামন্তবাদের ভিত্তির উপর দাঁড়নো। ফলে এই পুঁজিবাদ পূর্ণ্ঙ্গাভাবে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমে অক্ষম। তা শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদেও সেবকে পরিণত হয়। ফলে ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে চাহিদা প্রকাশ পেয়েছিল- তার পূর্ণ বিকাশ বাস্তবে সম্ভব হয়নি।

এদেশেও ১৯৫৪-এর যুক্ত ফ্রন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং তার গণতান্ত্রিক প্রশাসন ব্যবস্থার কর্মসূচি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অর্জন হিসাবে সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়। কিন্তু, এদেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লব সাধিত না হওয়ায় এবং সমাজে নতুনভাবে আধা-উপনিবেশিক-আধা-সামন্তবাদী ব্যবস্থার ভিত্তিতে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ বিকশিত হওয়ার কারণে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অর্জিত ফলগুলো খোয়া যেতে থাকে। আর তারই ধারাবাহিকতায় আজ জাতি ও জনগণ বিরোধী উচ্চশিক্ষার প্রতিক্রিয়াশীল পুনর্গঠনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ। তাদের এই পুনর্গঠনের সাথে গণতান্ত্রিক প্রশাসন ব্যবস্থা খাপ খায়না। বরং সংকটগ্রস্ত সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সাথে ফ্যাসিবাদই খাপ খায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমরা তারই প্রতিফলন দেখছি।

সুতরাং, প্রতিক্রিয়াশীল কর্মসূচির বিপরীতে বেতন-ফি বিরোধী, কিংবা আন্দোলনকারীদের দমনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেই হবে না। তাই আজ সঠিক হবে না গুরুতর রাজনৈতিক ও বিপ্লবী কর্মসূচির প্রশ্ন এড়িয়ে কেবল অর্থনৈতিক দাবী-দাওয়ার আন্দোলনে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখা। বরং উচ্চশিক্ষার প্রশ্নে সাম্রাজ্যবাদ-আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী জাতীয় ও গণতান্ত্রিক উচ্চশিক্ষার কর্মসূচি প্রণয়ন করে তার আওতায় শিক্ষার সংগ্রামকে বেগবান করতে হবে।