ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

সমাজ, শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়
বিশ্ববিদ্যালয় কোন সমাজ বিচ্ছিন্ন স্বত্তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থতি পর্যালোচনা করতে গেলে তাই আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় নেয়াটাই প্রাসঙ্গিক।
সমাজের ভিত্তি হল তার বৈষয়িক অবস্থা; সমাজের উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কসমূহ। সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদের উপর দাঁড়িয়ে সমাজের উপরিকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয় অর্থাৎ সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তির অনুযায়ি রাজনীতি, মতাদর্শ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি গড়ে ওঠে। সমাজের বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মধ্যে শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্যমান অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির সেবা করা। শ্রেণী সমাজে যে শ্রেণী অর্থনীতির মালিক, তারাই রাষ্ট্র ও রাজনীতির মালিক হয়, তাদেরই সংস্কৃতি সমাজে আধিপত্য করে। সুতরাং, শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শিক্ষা শাসকশ্রেণীর বিদ্যমান অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির সেবা করে। আর সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসাবে উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা এ থেকে ব্যতিক্রম নয়। তবে বিদ্যমান সমাজের মধ্যে গড়ে ওঠে নতুন সমাজ সম্পর্ক যা বিদ্যমানকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ফলে নতুন সমাজ সম্পর্কের প্রতিসিধিত্বকারী শ্রেণীগুলো নতুন রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি ও শিক্ষার দাবীতে শ্রেণী সংগ্রাম তীব্রতর করে তোলে। আর যখন সমাজের বিপ্লবী রূপান্তর ঘটে; রাজনৈতিক সম্পর্ক ও উৎপাদন সম্পর্কে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে তখন নতুন ব্যবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন করে। অর্থাৎ নতুন রাজনীতি, নতুন অর্থনীতি ও নতুন সংস্কৃতির সেবার খাতিরে পুরনো শিক্ষা ব্যবস্থার বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটায়।

সমাজ ও শিক্ষার এ সম্পর্কের কারণে শিক্ষার কাঠামো, পাঠ্যক্রম, ছাত্রদের সামাজিক অবস্থান ইত্যাদির মধ্যে সমাজের মৌল সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ, পুঁজিবাদী সমাজ ও সমাজতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষার প্রয়োজন একরকম নয়। সামন্ত্রতন্ত্রে বিরাট ছাত্র বাহিনীর দরকার ছিল না, প্রযুক্তির প্রয়োজন ছিল না। ফলে বিজ্ঞান চর্চা ও উঁচু মানের শিক্ষার প্রয়োজন পড়েনি। বরং এ সমাজে ধর্মীয় ভাবালুতা চর্চা ছিল সামন্ততন্ত্র টিকিয়ে রাখার উপযোগী। সামন্ততান্ত্রিক বংশ মর্যাদা ও কঠোর অনুশাসনের প্রতিফলন গঠত শিক্ষা প্রশাসন ও ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে। একারণেই সেকালে অক্সফোর্ড ও ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ধর্মচর্চার কেন্দ্র হিসাবেই উদ্ভুত হয়েছিল।

আধুনিক শিল্প সভ্যতা ও পুঁজিবাদের বিকাশের সাথে সাথে সেক্যুলার মননচর্চা ও বিজ্ঞান ঐ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্থান করে নিতে থাকে। ইউরোপে বুর্জোয়া বিপ্লবের মধ্যদিয়ে সামন্তীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সাথে সামন্ততান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গায় স্থান করে নেয় বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়। বৃহদায়তন শিল্প ও পুঁজিবাদের বিকাশের জন্য প্রয়োজন ছিল ব্যক্তির বংশগত অধিকারের জায়গায় বুর্জোয়া ব্যক্তি স্বাধীনতা, ধর্মীয় ভাবালুতার স্থলে যুক্তি ও বিজ্ঞানের চর্চা, কঠোর অনুশাসনের স্থলে বুদ্ধির মুক্তি। একারণে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মচর্চার স্থলে যুক্তি ও বিজ্ঞান, কঠোর অনুবর্তিতার স্থলে মুক্তবুদ্ধির চর্চা, শিক্ষক ও ছাত্রদের গুরু-শিষ্য সম্পর্কের স্থলে সিনিয়র ও জুনিয়র স্কলার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। জ্ঞানের অবাধ বিকাশের স্বার্থে দাবী ওঠে একাডেমিক স্বাধীনতার, যা রূপ নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বশাসন আকারে। এভাবে পুরনো সামন্ততান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈপ্লবিক রূপান্তরের মধ্যদিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সেবায় নিয়োজিত হয়েছিল। এছাড়া বুর্জোয়া সমাজ বিপ্লব সম্পন্ন হত না। এ কারণেই সমাজ বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হল শিক্ষা ব্যবস্থার বৈপ্লবিক রূপান্তর।

উপনিবেশিক দেশগুলোতে চিরায়ত পুঁজিবাদী বিকাশ ঘটেনি। ফলে সমাজ ও শিক্ষার সমস্যা এখানে ভিন্ন রূপ নিয়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে বিশ্ব পুঁজিবাদ যখন সা¤্রাজ্যবাদের স্তরে প্রবেশ করে তখন উপনিবেশিক দেশগুলোতে ফিন্যান্স পুঁজির প্রবাহের কারণে আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটতে শুরু করে। এ পুঁজিবাদ পুরনো উপনিবেশিক-সামন্ততান্ত্রিক সমাজগুলোতে বুর্জোয়া চিন্তাধারার আলোড়ন সৃষ্টির সামাজিক ভিত্তি হিসাবে কাজ করে। তারই প্রভাব পড়ে নতুন প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এর সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিফলন ঘটে ১৯১৮ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দাবীতে ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলনগুলোতে। পূর্ববাংলায় বিকাশমান সামন্ত-বুর্জোয়াদের দাবীর প্রেক্ষিতে ১৯২১ সালে অক্সোফোর্ডের আদলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তার ধারাবাহিকতায় উপনিবেশিক ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেও একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু এসব উপনিবেশিক-আধাউপনিবেশিক দেশগুলোর শাসকশ্রেণীর আমলা-দালাল-সামন্ত চরিত্রের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের আংশিক সংস্কার হলেও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের আন্দোলন ও পুনর্গঠন ক্রমশ থিতিয়ে পড়ে।

সমাজতান্ত্রিক চীনে সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় একটা প্রধান জায়গা জুড়ে ছিল শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বৈপ্লবিক রূপান্তরের সংগ্রাম। সমাজতান্ত্রিক সমাজে বুর্জোয়াদের উৎখাত করে শ্রমিকশ্রেণী অর্থনীতির উপর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করে এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও তার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সমাজতান্ত্রিক চীনে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ চলাকালে বুর্জোয়াদের পথগামীরা শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বুর্জোয়া ব্যবস্থাকে অটুট রাখার জন্য সংগ্রাম শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় তারা বুর্জোয়া স্কলারদের আধিপত্য রক্ষা করা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষিত শ্রেণীর ছাত্র ভর্তি, উৎপাদন বিচ্ছিন্ন শিক্ষার পদ্ধতি অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা চালায়। কিন্তু সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে শুরু সবকিছুতেই কারখানা শ্রমিকদের আধিপত্য সৃষ্টি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নির্বাচনের নিয়ম পাল্টানো হয়। কারাখানা ও কমিউনগুলো তাদের মধ্যে নিবেদিত তরুণ শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্য থেকে তরুনদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পাঠায়। ফলে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শ্রমিক-কৃষক শ্রেণী থেকে আগত শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতকরা ৪০ ভাগ থেকে ৯৫ ভাগে উন্নীত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত করা হয় কারখানা ও কৃষিভূমি। যেখানে অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীরা শ্রমিক-কৃষক ও উৎপাদনের সাথে যুক্ত হয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণা পরিচালনা করতেন।
সামন্ত্রতান্ত্রিক, পুঁজিবাদী, উপনিবেশিক-সামন্তবাদী এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষা ব্যবস্থার ও উচ্চশিক্ষার ভিন্ন প্রকৃতি সমাজ ও শিক্ষার গভীর অন্তঃসম্পর্ককে উন্মোচন করে। সুতরাং পূর্ববাংলার সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়কে বিচার না করলে বাংলাদেশের শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার প্রকৃতি ও সমস্যা বোঝা যাবে না।

বাংলাদেশের সমাজ, শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়
ভারতে বৃটিশের উপনিবেশ কায়েমের পর উপনিবেশিক-সামন্ততান্ত্রিক ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন রূপ নেয়। ১৯০০ সালের গোঁড়া থেকে বিশ্বপুঁজিবাদী ব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদের স্তরে উপনীত হলে ভারতে ও পূর্ববাংলায় ফিন্যান্স পুঁজির প্রবাহ সৃষ্টি হয়। এতে করে ভারতে অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও পূর্ববাংলার মুসলিম সামন্ত ও বুর্জোয়াদের বিকাশ তরান্বিত হয়। তারা অধিকতর রাজনৈতিক অধিকার দাবী করে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে তা প্রতিফলিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার বিষয়বস্তু ও প্রশাসন ইত্যাদির মধ্যে উপনিবেশিক শাসকশ্রেণী ও পূর্ববাংলার বিকাশমান মুসলিম সামন্ত ও বুর্জোয়াদের স্বার্থের প্রতিফলন ঘটে। গণতান্ত্রিক বিপ্লব ছাড়াই বৃটিশ সাজ্যবাদ তাদের দালাল বৃহৎ সামন্ত ও আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়াদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে ভারত ছাড়ে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহৎ সামন্ত ও বুর্জোয়াদের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্গঠন করে। সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন ফিন্যান্স পুঁজির প্রবাহে পাকিস্তানের আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ বিকাশের জন্য প্রবৃদ্ধিমূখী একচেটিয়া রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ রূপে বিকশিত হয়। এ অর্থনীতির প্রতিফলন ঘটে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে। অথনীতির সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠা পায় সামরিক স্বৈরতন্ত্র। পূর্ববাংলার উপর জাতিগত নিপীড়ন বাড়তে বাড়তে রূপ নেয়া উপনিবেশিক রূপ। তারা শিক্ষা ববস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ঢেলে সাজাবার চেষ্টা করে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুবের সামরিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেটুকু স্বশাসন ছিল তাও হরণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৬১ জারি করা হয়। ষাটের দশকে সারা দুনিয়া কমিউনিস্ট আন্দোলনের জোয়ারে আন্দোলিত হয়। পুর্ববাংলার জাতিগত নিপীড়ন বিরোধী সংগ্রামে এর প্রভাব পড়ে। শাসকশ্রেণীর শিক্ষানীতি বিরোধী সংগ্রামের সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়েও গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলন জোরদার হয়। এরই প্রেক্ষাপটে সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী উঠে আসে।

১৯৭১ সালে গণতান্ত্রিক বিপ্লব অসমাপ্ত থাকে। সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের দালাল বড় বুর্জোয়া ও সামন্ত শ্রেণী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে তারা পাকিস্তানি উপনিবেশবাদের সম্পর্ক ছিন্ন করলেও সাম্রাজ্যবাদী-সামন্তবাদী ও আমলা পুঁজিবাদী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়।

প্রথম পর্যায়ে বড় বুর্জোয়া ও সামন্তশ্রেণী যখন নিজেদের ক্ষমতা সংহত করতে পারে নি এবং অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষুদে বুর্জোয়া গণতন্ত্রী ও প্রগতিশীলদের যথেষ্ট শক্তি সংরক্ষিত থাকায় তখন প্রগতিশীল শিক্ষক ও ছাত্রদের দীর্ঘদিনের দাবী মেনে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ-৭৩’ জারি করা হয়। এদেশের আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদ আকারে বিকশিত হতে শুরু করলে- প্রথমে বাকশাল পরে জিয়া-এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব সরকার শাসকশ্রেণীর স্বার্থে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারসহ ’৭৩ আদেশ সংস্কারের চেষ্টা চালায়। এভাবে ৭৩-এর আদেশে কিছু প্রগতিশীল সংস্কার সাধিত হলেও শাসকশ্রেণী আইনী বা আইনবহির্ভূতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ও স্বায়ত্বশাসন দুর্বল বা হরণ করে।

সামরিক স্বৈরতন্ত্রের সামাজিক ভিত্তির দুর্বলতা, শাসকশ্রেণীর দুটি বড় উপদলের সামরিক স্বৈরতন্ত্রের সংস্কার দাবীতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দখলে নেয়া এবং গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তির তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থার প্রেক্ষিতে ১৯৯০ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সামরিক স্বৈরতন্ত্র জেঁকে বসতে পারে নি। এ সময় একধরণের আন্দোলনকালীন গণতন্ত্র বজায় ছিল।

’৭০এর দশকেই থেকে সা¤্রাজ্যবাদ রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদের প্রবৃদ্ধিমূখী বিকাশেরর ফলাফল দেখতে পায়। তীব্র শোষণ-নিপীড়ণের কারণে বিপ্লবী পরিস্থিতির উদ্ভব তাদের আতঙ্কিত করে। ’৮০ দশক থেকে তারা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বাজার অর্থনীতি চালুর চেষ্টা চালায়। ৯০ দশকে বিশ্বায়নের নামে মুক্তবাজার অর্থনীতি চালুর চেষ্টা করে সাম্রাজ্যবাদ। সাম্রাজ্যবাদী এ পুনর্গঠনের অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে উঠে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা; সামরিক/বেসামরিক স্বৈরতন্ত্র; রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদের সাথেই কেবল যা খাপ খায়।

১৯৯০ সালের পর সামরিক স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটে। সাম্রাজ্যবাদের অনুপ্রবেশ জোরদার হয়। এ সময় শিক্ষা ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী সংস্কার জোরদার হয়। সা¤্রাজ্যবাদী ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের স্বার্থে শিক্ষার বিষয়বস্তু পরিবর্তিত হয়। সামন্তবাদী ধ্যান-ধারণাও বজায় থাকে। প্রাথমিক শিক্ষার এনজিওকরণ, ইউজিসি-প্রণীত উচ্চ শিক্ষার ২০ বছর মেয়াদী কৌশলপ্রত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলন এবং সা¤্রাজ্যবাদী শিক্ষানীতি ২০১০, আরবী ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদির মধ্যেই উপরোক্ত আর্থা-সামাজিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। ইউজিসির কৌশলপত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারণী সংস্থায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান, এনজিও কর্তা, বড় ব্যবসায়ীদের যুক্ত করা ও বাজারমুখী শিক্ষার বিষয়ের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব গবেষণা ও নতুন নতুন বিষয়-বিভাগ খোলা হচ্ছে-এসবের মধ্যেই উচ্চশিক্ষায় এখানকার সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের স্বার্থের প্রতিফলন ঘটছে।
১৯৯০ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার ঘটে কিন্তু তা কেবল তার বাহ্যিক রূপের দিক থেকে। সামরিক স্বৈরতেন্ত্রর জায়গা নেয় সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র। গত ২২ বছরে তা ক্রমাগত শক্তিশালী হয়েছে। বুর্জোয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা থাকলেও সংস্কার অনিচ্ছুক শাসকশ্রেণী ‘এক নেত্রী, একদল, এক দেশ’ নীতিই বাস্তবায়ন করেছে।

এ শাসকশ্রেণীর সামাজিক ভিত্তি থাকায় ফ্যাসিবাদী দমন-পীড়ন পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় এবং হলে হলে কায়েম হয়েছে। ফলে ’৯০ উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র-শিক্ষকরা একচেটিয়া আধিপত্য-স্বেচ্ছাচারিতা কায়েম করেছে। প্রশাসনকে দলীয়করণ করেছে এবং সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়ে-ত্রাসের রাজত্ব করেছে।