ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

অামাদের অাশেপাশে চলতে ফিরতে কতইনা রিকসা দেখতে পাই। রং বে রং- এর রিকসা। ইঞ্জিনচলিত, ব্যাটারিচালিত, ঘামে ভেজা পাচলিত। এই রিকসা নিয়ে অাজ একটি ছোট্ট গল্প বলব-

-ঐ রিকসা যাবি?

বিকালে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর ডাক! অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম! রিকসাওয়ালা ছিল বাবার বয়সী কী তার চেয়ে বড়! বিশ্বের মুক্তমনা জ্ঞান অাহরণ করতে এসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এটা উনার শিক্ষা। এই ঘামে ভেজা দিনমজুর-কৃষক-শ্রমিকদের কষ্টার্জিত অর্থে এই সবুজ অরণ্য ঘেরা ক্যাম্পাস চলে সেটা হয়ত অামরা ভুলে যায় অথবা জানিনা, জানতে চাইও না। অাচ্ছা যদি অাপনার বাবাকে কেউ এভাবে ডাকত! হতে পারে অাপনি ধনীর দুলাল কিন্তু অাপনার অধিকাংশ ক্লাসমেটের বাবাই দেখেন কৃষক অথবা দিনমজুর।

কোন একটি বিভাগে গেছিলাম। একটি ক্লাসরুম ও একটি নামমাত্র অফিস দিয়েই বিভাগটি চালু হয়েছে। নেই পর্যাপ্ত সুবিধা। এখানকারই এক নামকরা অধ্যাপককে প্রশ্ন রেখেছিলাম এই সম্পর্কে। উনি উত্তর দিলেন “শোন বাবা একটি ক্যাম্পাসে হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রয়োজন নেই, প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত দুটি ছাত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যথেষ্ট”। এটি গবেষণার জায়গা যদি একটি বিভাগের পর্যাপ্ত সুবিধাই না দেয়া যায় তবে কি লাভ গন্ডায় গন্ডায় বিভাগ খুলে? কারণটা অবশ্য অথই জলের মত গভীর।

এক ভাইকে প্রশ্ন করেছিলাম, মার্কেটিং -এ পড়ে অাপনি কী শিখলেন? সাধারন জ্ঞান, ইংরেজি, বাংলা, ম্যাথ ইত্যাদি। বিভাগীয় জ্ঞানটা প্রস্ফুটিত করবারই যেখানে স্কোপ থাকে না সেখানে এরূপ উত্তরই কাম্য।

কিছুদিন অাগে Wi-Fi উদ্ভোধন হল। অবশ্যই এটা ভাল জিনিস। তবে শিক্ষার্থীদদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে নয়। এক ভাইকে বললাম, এত Wi-Fi স্পিড দিয়ে কী করবেন? ফেইসবুক, ইউটিউব অার এক্সভিডিওস ডট কম- এ সময় দিয়ে। অথচ এটার অনেক ভাল দিকও রয়েছে। তবে অধিকাংশই অামরা এডাল্ট। চিন্তাধারাগুলোও এডাল্ট। নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে ঠিকই এক্সভিডিওস অথবা অন্য কোন পর্ন সাইটে ভিজিট করে নিজের মনোরঞ্জন করি (ছেলে-মেয়ে উভয়ই)। সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয় ফেইসবুকে।

অথচ রিকসাচালক বা দিনমজুর বাবাটি ক্যামন অাছে খোঁজ নিতে ভুলে যাই; ধিক্কার মারি। অথচ উনার ঘাম ঝরানো অর্থেই অাজ এখানে পড়ছি। এই বিলাসিতার ফলও উনার পরিশ্রমেই স্বার্থক। এক রিকসাওয়ালা উনি ক্যাম্পাসের বাইরে রিকসা চালান না। অামি জিজ্ঞাস করলাম কেন কাকা?

উনি বললেন, ’অাপনারা বড় হয়ে অফিসার, পুলিশ, জর্জ, ম্যাজিস্ট্রেট হবেন। মাইনসেরে বলতে পারব অামার এই রিকসায় চড়ে কত জর্জ, ম্যাজিস্ট্রেট হল।’  মনটা কত বড় হলে এই কথাটা বলা যায় অথচ প্রায়শই তাকেই গালাগালি, তুইতুকারি ইত্যাদি বলতে পিছপা হই না।

রিপন (কল্পনাম) নামের ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছিল একটু অাগে। উদাস মনে ডার্বির ধোঁয়া ফুকছিল। দেখে মনে হল হয়ত ছেলেটা ছ্যাকা-ট্যাকা খেয়ে খুব কষ্টে অাছে। বিড়ি টানতে টানতে তার মনের দুঃখগুলো শেয়ার করল। সে প্রতি সপ্তাহে তিনদিন সে যে কোন তিনবেলা না খেয়ে থাকে। মাঝে মধ্যেই এমন করে। প্রতিদিন সকালের খাবার দুপুরের সাথে খায়। যা একটু সেভ হয়! হলে থাকে, একটা টিউশুনি করায়। ওখান থেকে যা অাসে তাই দিয়ে চলে। অনেক কথা খরচ করতে হয়েছিল কথাগুলো বের করতে। ছেলেটির বাবাও রিকসা চালক। সেও মাঝে মধ্যে রিকসা চালাত। ওর সামনেই ওরই বন্ধু ওভাবে (এই রিকসা যাবি?) ডাক দিয়েছে। ওখানে বুক চেপে কষ্টটা সয়ে একপাশে এসে কাঁদছিল। কথাগুলো বলতে বলতে গলাটা জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে দিল। শান্তনা ছাড়া দেয়ার মত কিছুই ছিল না অামার ওর এই চাপা কষ্টের কাছে।

রাতে খায়নি। অামি অনেক বুঝিয়ে বললাম চল অাজ অামার সাথে খাবি। কোনমতে রাজি হল না। বলল, ’অাপনি কদিন খাওয়াবেন? একদিন, দুদিন, তিনদিন এর বেশি ত নয়। কিন্তু অামি একবেলা না খেয়ে দিব্যি চলে যাব। চলতে চলতে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যেমন অাপনি প্রতিকাপ চায়ের সাথে একটি করে বিড়ি খেতে অভ্যস্ত। কারো কাছ থেকে খাওয়া অভ্যাস না করাই শ্রেয়।

উত্তর শুনে হতবাক হয়ে নির্বোধের মত তাকিয়ে রইলাম! ও হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল; শুধু অামি তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে!